সমুখে শান্তি পারাবার

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ১০ মাঘ ১৪২৭

সমুখে শান্তি পারাবার

সালেহা চৌধুরী ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৬, ২০২০

print
সমুখে শান্তি পারাবার

লোরকা অকালে মারা যান। অকালে মারা যাওয়ার আগে প্রায়ই লিখতেন মৃত্যুর কবিতা। কারণ? তার মন বলেছিল ও আসবেই। এবং খুব তাড়াতাড়ি। একদিন লুকিয়ে থাকা লোরকাকে ফ্রাংকোর সৈন্যরা ধরে নিয়ে গুলি করে মেরেছিল। এখন কোথাও কোনোখানে তার কবর খুঁজে পাওয়া যায় না। যার মৃত্যু নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায়।

গ্রানাডা ১৮৫০

আমার ঘর থেকে পর্বত অবলোকন করি।
বাতাসে পাতার শব্দ।
লতানো আঙুর সূর্যের আলো
ওরা সব আমার হৃদয়ের পানে
অঙুলি নির্দেশ করে
আগস্টের থিরথির বাতাসে
পর্বত কাঁপে।
আমি জানি
ঝর্ণার জলে আর কখনো স্বপ্ন দেখা হবে না।

নিসর্গ

যেন ভুলবশত আজকের সন্ধ্যা
শীতের পোশাকে অন্যরকম
জানালার কাচে কুয়াশা
দেখছি আমি।
শিশুরা চেয়ে আছে হলুদ গাছে
আর দেখতে দেখতে গাছ হয়ে যায় পাখি।
সন্ধ্যা শীতের চাদর মেলে দিয়েছে
নদী অবধি।
থরথর কাঁপছে আপেলের ছায়া
বাড়ির ছাদে।
আহা ব্যালকনি থেকে এ দৃশ্য বড় মনোরম।
অতএব আমার মৃত্যুর পর খোলা রেখ
ব্যালকনির দরজা।

পুশকিন মারা যান আটত্রিশ বছর বয়সে। ১৮৩৭ সালে। তার আগে বোধকরি নাটালি গনকায়েভ নামের সেই নারীকে নিয়ে রচনা করেছিলেন অনেক কবিতা। এই সুন্দরী বুদ্ধিহীন বিলাসসর্বস্ব নারী তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। যার প্রেমিক ডি এথেন্সের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যান পুশকিন।

আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম

সত্যিই আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম
এখনো আমার আত্মা ধরে আছে
প্রেমের সেই এক কণা জ্যোতি।

ঈশ্বর না করুক আমার এই অন্তর বেদনায়
আমি তোমাকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না।
আমার এ অনুভব তোমাকে বিষাদিত করুক
এ আমি কেমন করে চাই বল?
কথাহীন আশাহীন এক অব্যক্ত প্রেম
কখনো তা ঈশ্বর-আগুনে জ্বলে উঠছে
কখনো তা একেবারে বোবা মানুষের অনুভব।
আমি ভালোবেসেছিলাম গভীর, কোমল, নীরব আবেগে।
যেন এমনি ভালোবাসাতেই আল্পুত থাকো তুমি
অনাগত সময়ে।

হে বন্ধু সময় এসে গেছে
(মৃত্যুর আগে লেখেন। জীবনের শেষ কবিতা)

হে বন্ধু সময় এসে গেছে
আমার হৃদয় আজ শান্তির প্রত্যাশী
উড়ে চলছে আমার দিনরাত
ঘণ্টা মিনিট পালিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
একটুখানি প্রাণ স্ফুলিঙ্গ তোমার জীবন থেকে দাও
তুমি আমি জীবন পরিকল্পনা করেছিলাম না?
এখন জানি অতি সত্বর মারা যাব
সুখ নেই কোথাও।
আছে কি শান্তি ও স্বাধীনতা
এক আশ্চর্য স্বর্গের কামনা ছিল আমার
দাসত্বে এখন বড় ক্লান্ত আমি
সেই কবে পরিকল্পনা করেছিলাম
এক অনাস্বাদিত যাত্রার
আমার পছন্দের কাজকর্মে পরিপূর্ণ
অনেক দূরের একটা বাড়ি।
আর? যদি থাকে কিছু নির্দোষ আনন্দ।

তিনজন রমণী আমাকে বিস্মিত ও মন্ত্রমুগ্ধ করে। এরা তিনজন শার্লোট, এমিলি এবং এ্যান ব্রন্টি। ইয়র্কশায়ারে এক যাজকের ঘরে বড় হয়েছেন। মা নেই, বন্ধুবান্ধব একেবারেই নেই। কেবল আছে কল্পনা। সেই কল্পনা থেকে রচনা করেন উপন্যাস ও কবিতা।
এখানে তিনজনার তিনটি ছোট কবিতার অনুবাদ। ওদেরও হয়েছিল অকাল মৃত্যু। কারণ? সেকালে ব্রিটেনে যা অনেকেরই হতো সেই কঠিন যক্ষ্মা। চার ভাইবোনের কবিতা।

সন্ধ্যার সান্ত্বনা
শার্লোট ব্রন্টি

মানুষের হৃদয় এক গোপন ভাঁড়ার
লুকানো থাকে অনেক সম্পদ
গোপনীয়তা ও নীরবতায় সিল করা
স্বপ্ন, আশা, আনন্দ, ভাবনা।
জোর করে খুলতে গেলে
বিনষ্ট ও বিশৃঙ্খল সব কিছু।
(কনসোলেসন)

শেষ লেখা
এ্যান ব্রন্টি

দরজায় মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে
অতএব যা করব বলে প্রতিজ্ঞা আমার
করে ফেলা চাই।
কঠিন ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে ওখানে
অতএব যা করার এখনি
শেষ করতে চাই।
(লাস্ট লাইনস)

আর ওদের ভাই বার্নওয়েল মৃত্যুর আগে লিখেছিলেন

মনে রেখ
প্যার্টিক বার্নওয়েল

যখন মারা যাব ছাই হবে আমার সবকিছু।
বোনেরা মনে রাখবে
তোমাদের হৃদয়ের পবিত্র মন্দিরে
আমি কেবল স্মৃতি হয়ে রয়ে যাব
আর আমার স্বর্গ সেখানেই, আর কোথাও নয়।
(মেমোরি)

একা বসে আছি আমি
এমিলি ব্রন্টি

সেই ছেলেবেলায় সূর্যের আলো থেকে
স্বপ্ন বুনেছি আমি, সমৃদ্ধ হয়েছি
দূরের কথা ভেবেছি আমার কল্পনার রং মিশিয়ে
তখন থেকেই জীবনের তাঁত
বুনতে শিখে গেছে।
(এ্যালোন আই স্যাট)

এ চার ভাইবোনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। এক বুক ভালোবাসা নিয়ে ফিরে এসেছি। বাড়ির নাম ‘পার্সোনেজ অব হওয়ার্থ।’ কবর দেখেছি। আর দেখেছি ওদের স্মৃতিভরা আসবাব, কাপড়, বই, ছবি। সেই টেবিল যেখানে ওরা লিখতেন। এখন এটা জাদুঘর।