সালেহা চৌধুরীর নিজস্ব ধারার কবিতা

ঢাকা, সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১ | ৩ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

সালেহা চৌধুরীর নিজস্ব ধারার কবিতা

শফিক হাসান
🕐 ২:৩৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১

সালেহা চৌধুরীর নিজস্ব ধারার কবিতা

কবিতা কখন ‘পেয়ে’ বসে মানুষকে, কেড়ে নেয় ‘স্বাভাবিক’ জীবন কেউই জানে না। কী যে এক বিপন্ন বিস্ময়ের এই ঘোরগ্রস্ত জগত। প্রত্যেক কবির পরিপার্শ্ব, জীবনযাপনের ধরন অভিজ্ঞতাভেদে ভিন্ন। সালেহা চৌধুরী নিজের কবিসত্তাকে উপলব্ধি করেন এভাবে- ‘দুর্মতি! এককণা আত্মোবিষ্কারের ইচ্ছাটা/ কখন যে ভূতের মতো কাঁধে চেপে বসে।’

‘কথা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে’ কবিতায় রবিবাবুর সঙ্গে একমুখী আলাপচারিতার শেষপ্রান্তে পৌঁছে নিজেকে উন্মোচন করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে সালেহা চৌধুরী বলেন- ‘আকাশে আকাশে ঘাসে ঘাসে বাদলায় বর্ষণে রবিবাবু/ আত্মা যে কখনো দারুণ বিপন্ন করে/ কেবল তোমারই কারণে।’

বলা হচ্ছে, সালেহা চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ‘দলছুট শব্দেরা’র কথা। তিনি গল্পকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও শিক্ষক হিসেবে সমধিক পরিচিত। পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন কবিতাচর্চাও। বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে তার আরও পাঁচটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা কবিতার বই তিনটি- দেয়ালে ক্যাকটাস ফুল, হৃদয়ে পেণ্ডুলাম বাজে, হাইকু। ইংরেজি কবিতার বই দুটি হচ্ছে- হট গ্রোজ ইন মাই হার্ট এবং এ ব্রড ক্যানভাস। অন্য আরও শিল্প শাখায় অবাধ বিচরণের কারণেই বোধকরি তার কবি পরিচয় সেভাবে ‘পরিস্ফুটিত’ হয়নি। তবুও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লিখে চলেছেন। কোন ধারায় কবিতা লেখেন তিনি? সেই জবাবও দিয়েছেন ভূমিকাংশে- ‘আমার কবিতার ছন্দ আমার নিজস্ব। এককথায় প্রাতিস্বিক। মুক্তক বা গদ্যছন্দের পরে সালেহা চৌধুরীর নিজস্ব ছন্দ।’ সাহসী উচ্চারণই বটে!
বিষয় অনুযায়ী আলোচ্য বইটির কবিতাগুলো চার পর্বে বিভক্ত। শ্রদ্ধাস্পদেষু প্রিয়ভাজনেষু, প্রকৃতি প্রেম, মানব মানবী, দেশ ও ভাষা। বিভাগওয়ারি কবিতাগুলোর বিষয়-বৈচিত্র্য সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা মেলে। এক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রয়েছে দুটি কবিতা। প্রথম কবিতায় সালেহা চৌধুরী আরও বলেন- ‘আত্মা! আত্মা! কী সে জিনিস রবিবাবু?/ আমি বলি বাদামের খোসার অন্তরালের নিরেট বাদাম।/ যা থেকে মানুষের কেবল।’ এই কবিতায় ঘুরে-ফিরে এসেছে রবীন্দ্রসাহিত্যের বিভিন্ন চরিত্র। রবিকে নিবেদিত দ্বিতীয় কবিতা ‘নাগরিক আকাশ’। ঋষিকবিকে চিত্রণ করেন এভাবেÑ তুমি আছ বলেই আমরা জানি/ পৃথিবীর যেখানেই থাকি তোমার কারণে/ একটি আকাশ নীল হয়ে থাকে।
কাজী নজরুল ইসলাম ‘কবির ধর্ম’; সত্যজিৎ রায় ‘লকডাউন’, শামসুর রাহমান ‘অবিনাশী হৃদয়ের একান্ত গোলাপ’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বটের ছায়ায়’ শীর্ষক কবিতায় উঠে আসেন। কবিতায় শিল্পীদের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের সৃজন-পরিসরেও ফেলেছেন চকিত চাহনি। ‘মা’ কবিতায় ধরা পড়ে সনাতন জননীর প্রতিচ্ছবি- বাজার ওষুধে পরিপূর্ণ/ মায়েরটা ছিল সবচাইতে ধন্বন্তরী/ মায়ের অ্যান্টিবায়োটিকে ছিল/ ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা।

বঙ্গবন্ধুকে সম্মানের নামে নানাভাবে যারা অসম্মানিত করে চলেছেন সেসব নিয়ে খেদ প্রকাশ করেছেন কবি। ‘তোমার কথা ভেবে হে জাতির পিতা’ কবিতায় উল্লেখ করেছেন বিষয়টি। শেষে জানিয়েছেন প্রণতি- তোমার হৃদয়টাতে এত আলো আর এত ভালোবাসা/ সতের কোটি মানুষ জ্বালাতে পারে- একটি করে প্রদীপ/ এবং আজকের দিনেও ভালোবেসে বাঁচতে পারে।

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আরেকটি কবিতা ‘অর্ফিয়াসের বাঁশরী’। কবির বয়স যখন সাড়ে তিন বছর, স্টেজের ওপর চেয়ারে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছিলেন ‘কাঠবেড়ালী’। সাড়ে তিন থেকে কবি যখন যৌবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, তখনকার উপলব্ধি- কোনো দিন যদি বলতে/ চলে এসো দেব খোঁপায় তারার ফুল।/ কী যে হতো কে জানে।
কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় অংশ ‘প্রকৃতি প্রেম’। ‘কোথায় যাব আমরা’ কবিতায় কাছাকাছি শব্দের ব্যবহার নজর কাড়বে। পলায়নপ্রবণ জীবনের কথা বলতে গিয়ে কবি পিছুযাত্রাকে চিহ্নিত করেন নানাভাবে-
টেলিভিশনের ‘সিরিয়ালে’ ‘সিরিয়াল কিলারের’
মতো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠা।
নবীন-প্রবীণের ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দ্বন্দ্ব বরাবরই ছিল। তরুণরা ভাবে- বুড়োরা বড্ড ‘সেকেলে’। অন্যদিকে প্রবীণরা মনে করেন তরুণ প্রজন্ম উচ্ছন্নে গেছে। দুই পক্ষের মধ্যবর্তী ভূমিতে দাঁড়িয়ে সালেহা চৌধুরী লেখেন ‘যৌবন ও বাঘের কবিতা’। গাছের গুঁড়িতে বসে বৃদ্ধের দল যৌবনের স্মৃতিচারণের সঙ্গে অকাতরে বলে যান ‘নারী শরীরের খাঁজ আর ভাঁজের কথা’। নানান রসাল বর্ণনার মধ্যে তারা ‘আজকের দিনের অধঃপতিত তরুণ সমাজের কথা’ও বলেন। এই কবিতা মনে করিয়ে দেয় বয়সের ধর্ম ও প্রাকৃতিক বিধানের বিষয়-আশয়। দিন ফুরালে যখন রাত নামে, পাল্টে যায় গল্পের বিষয়াবলি, উল্টে যায় মূল্যবোধের সংজ্ঞা।
‘আর একটি সকাল’ রচিত হয় বিন্দুর মাঝে সিন্ধু আবিষ্কারের অভীপ্সায়-
বালতিতে এক হাঁটু জল
সেই দিকে চেয়ে
সকালের আলোতে ভাবছি সাগরের তল।
এক বালতি জল থেকে কীভাবে চোখে ভাসে সমুদ্র-তল! জীবন, মহাজীবন আদতে এমনই। অনুপম একটি চিত্রকল্পের জন্ম দেয় ‘কবিতার মুহূর্ত’-
চুল মেলে বসে আছে মেঘলা দুপুর
জল বুকে করে
যে থাকে আমাদের অন্তহীন মাথার ওপরে।
সমুদ্রের জল ও বৃষ্টির জল- এক জীবন দুই-ই ছোঁয়। বাস্তবে, কল্পনায়। অনুভূতি ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন মেরুতে। ‘হারানোর কবিতা’য় বাজে সব খোয়ানোর হাহাকার। গ্রামীণ ধারণ সংস্কৃতি- লবণ, চিনি, এলাচ, একপট চাল কিংবা বিয়েতে পরে যাওয়ার সুন্দর শাড়িটি কেন উধাও হয়ে যায় শহুরে জীবন নামের (অপ) সংস্কতিতে? খুচরো পয়সাগুলো ঝনঝন মধুর মূর্ছনা সৃষ্টি করে না হাইরাইজ ভবনে! শহুরে জীবন কেমন-
কেউ কাউকে চেনে না নামও জানে না।
যেমন হারিয়েছে গাছ আর মাঠ
খোলা আকাশ আর নদী।
হারিয়েছে মানবতার নিবিড় শিশির।
‘মানব মানবী’ অংশে বিধৃত হয়েছে মানুষের প্রেম-অপ্রেম, সংসার, রকমারি টানাপড়েনসহ নানাবিধ সংকটগাথা। ‘সাঁকো’ কবিতায় বাঁশের সাঁকো পেরোয় দুই মানব-মানবী। এই সাঁকো সামনে নিয়ে আসে ভয়ঙ্কর এক নদীকে। এই নদী বিশাল হতে থাকলে ছেলেমেয়ে উভয়েই চলে যায় উকিলের কাছে। কারণ একটাই-
বাকি জীবন একসাথে
জীবনের নদী পেরোনো অসম্ভব বলে।
‘আরশোলার পাখার নিচে’ কবিতা চিঠিভর্তি বাক্সের গল্প। চারটি ম্যাড়ম্যাড়ে শব্দ প্রশ্ন করেÑ ‘সুচরিতাসু কেমন আছ বল’। ‘আমি তুমি সে ও অতসী’ কবিতায় কবি বলেন- ‘অতসীকে কেউ বলেনি জীবনে নুনের স্বাদ ভালোবাসা!’ জীবনের কত স্বাদ-বিস্বাদের সমষ্টিই ভালোবাসা হয়ে ওঠে। এখানে নুন যেমন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তেমনি মিষ্টি বা তেতো চিনিও! নুনের জলে, নুনভরা সাগরে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে অতসী। পাঠক পেয়েছে ভালোবাসার নতুন ব্যাখ্যা।
‘দলছুট শব্দেরা’ কাব্যগ্রন্থের শেষ অধ্যায় ‘দেশ ও ভাষা’। এ পর্বে রচিত হয়েছে ভালোবাসার অন্য আখ্যান। নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বক্তব্য-সার। রাজনীতি নানাভাবেই ভোগবাদিতায় পর্যবসিত হয়েছে। ‘কতিপয় মার্কসবাদী’ কবিতায় উঠে এসেছে সেই লাম্পট্য ও বিপরীত আদর্শ চিত্র-
বউদের শরীরের হিরে ঝলমল
মার্কসবাদী স্বামীদের আদরের ফল।
বুক ছ্যাঁৎ করে ওঠা এক দৃশ্যকল্প রচিত হয় ‘আমার রূপকথা’ কবিতায়। শুরুটা রূপকথার মতোই চটকদার। নতুন পোশাকে ভিআইপিদের চেয়ার-টেবিলে বসলেন একদল চাষা। এই ‘চৌষট্টি জন শ্রেষ্ঠ চাষা/ সকলের হাতেই পুরস্কার, সনদ’। এটা যদি স্বপ্ন কিংবা কবির প্রত্যাশা হয়, পরের অংশটুকু নির্ঘাত দুঃস্বপ্ন তথা রূঢ় বাস্তবতা-
এই রূপকথার পরের টুকুই গোলমেলে
বাড়তি ধান রাখবার গোলা নেই দেশে
সারের দাম আকাশ ছোঁয়া
বীজধানে নানা প্রকার পোকা।
সালেহা চৌধুরী কবিতাটির উপসংহার এভাবে টানেন- ‘যেখানে আমার রূপকথার স্বপ্ন চিরকাল হার মানে’। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর, স্বপ্ন-কল্পনার বিপরীতে নিরেট বাস্তবতা, কণ্টকাকীর্ণ পথে ছড়িয়ে থাকা কুসুমিত ইস্পাত- যথার্থ একজন শিল্পীই দেখতে পান; দ্বিধাহীন চিত্তে, অবলীলায় দেখাতেও পারেন। সালেহা চৌধুরী কথাসাহিত্যিক হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন পাঠকের; কবিতায়ও যে কম যান না- উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ‘দলছুট শব্দেরা’। মুদ্রণ প্রমাদ মাঝে-মধ্যে পাঠে অস্বস্তি দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আরেকটু সতর্ক থাকতে পারতেন। তবে চমৎকার একটি কাব্যগ্রন্থ পাঠ-অভিযাত্রায় এটুকু বিচ্যুতি মেনে নেওয়াই যায়!

 
Electronic Paper