সমাজ বাস্তবতার নিরিখে

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭

সমাজ বাস্তবতার নিরিখে

সাইফ সিরাজ ১২:০৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০২০

print
সমাজ বাস্তবতার নিরিখে

‘এখানে শিরদাঁড়া মেরামত করা হয়’ গল্পগ্রন্থটি পড়ে আমি বিমোহিত। নয়টি গল্প রয়েছে। যাতে খুঁজে পাই সমাজ বাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ। প্রথম গল্প ‘একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’। গল্পের মূল চরিত্র রন্টু, সেতু আর রন্টুর স্কুলশিক্ষক মা। তাদের দুজনের মধ্যে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু ভার্সিটির রাজনীতিতে দুজন দু’দলের হয়ে কাজ করতে গেলে বৈরিতা সৃষ্টি হয়। সম্পর্কের ধারা তিক্ততায় ভরে ওঠে। শেষ পর্যায়ে রন্টু খুন হয় সেতুর হাতে। গল্পের শেষ ডায়ালগটি চমৎকার চিৎপটাং-এ শেষ হয়।

গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প ‘নিঃশব্দ ইশতেহার’। গল্পটি মজার। এখানে লেখক একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ, সরকারি কর্মচারীর ব্যস্ততা ও রাজনৈতিক নেতার আচরণ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

‘মানুষ একটি চতুষ্পদ জন্তু’ গল্পটি পড়ে সত্যিই অবাক হই। গল্পের একটি চরিত্রকে লেখক চতুষ্পদ জন্তুর সঙ্গে মিলিয়ে বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। শামস আজাদ স্ত্রীকে হারিয়ে, সন্তানের বিরূপ আচরণে, চারপাশের মানুষের অন্যায় কাজ দেখে নিজেকে চতুষ্পদ প্রাণীর মতো ঘরে অন্তরীণ করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করে। ওই চরিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়, জন্তুরা হামাগুড়ি দিয়ে চলে, তারা খুব ভালো যে অন্যায় করে না। দু’পা-ওয়ালারা স্বার্থের জন্য সব অপরাধ করতে পারে।

চতুর্থ গল্প ‘মাংসের দোকান’। এখানে সংগ্রামী একজন মহিলার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যে মাংসের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার নিজের ছোট মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করার স্বপ্ন দেখে। এই গল্পের আরেকটি চরিত্র জারা। জারার অবাধ মেলামেশা খন্দকারের সঙ্গে, যা বর্তমান সমাজ বাস্তবতার উদাহরণ।

‘রিপোর্টিংয়ের একদিন’ গল্পটি সাংবাদিকদের কিছু স্বার্থপরতার দিক উপস্থাপন করেছেন লেখক। রিপোর্টার মাহফুজ মিথুন কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ করে, সেটি সম্প্রচার পর্যন্ত যেতে অনেক সময় মানবিক গুণকে বিসর্জন দেয়Ñ তা গল্প পড়ার শেষে পাঠক হিসেবে ধরতে পারি।

গ্রন্থের নাম গল্প ‘এখানে শিরদাঁড়া মেরামত করা হয়’। এই গল্পে একজন ডাক্তার, একজন স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী আসাদ এবং অফিসের বসের নানা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নান্দনিকভাবে উঠে এসেছে। পারিবারিক চাপ আর অফিসের বসের চাপে স্বল্প আয়ের আসাদের মুখের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়।

অফিসের কাজ করতে করতে মেরুদ-ের হাড়ে সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। ঘরে স্ত্রী পরপুরুষে আসক্ত এবং সন্তানের বায়না মেটাতে হিমশিম খাওয়া আসাদ প্রতিনিয়ত ব্যর্থতার মুখ দেখে। তবে চিকিৎসার কারণে যখন মেরুদ- ভালো হচ্ছিল তখন প্রতিটি কথা বুলেটের মতো প্রকাশ পায়। নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে।

সপ্তম গল্প ‘বাণ’। গ্রামের অর্ধ শিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষ বাণ দিয়ে অন্য মানুষের ক্ষতির চেষ্টা করে। শহরের শিক্ষিত চাকরিজীবী রীমা ও সাজ্জাদের দাম্পত্য জীবনে বাণের বিষয়টি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন লেখক।

যেখানে নিঃসন্তান সাজ্জাদ-রীমার সন্তান জন্মদানের নানা চেষ্টা এবং ব্যর্থতা। আর্থিক প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে অশান্তি বিরাজ করে।

‘সাপলুডু’ গল্পে মৃত স্বামীর সম্পদ পাওয়ার লোভে ভাইয়েরা তার বিধবা স্ত্রীকে ঘরে বন্দি করে পাগল উপাধি দেয়। অবশেষে পাগলা গারদে পৌঁছায়। যা হৃদয়বিদারক।
সর্বশেষ গল্প ‘আত্মপ্রকৃতি’। একজন রাজনীতিবিদের আত্মপ্রকৃতির আঁকার জন্য বিদেশ থেকে নামকরা চিত্রকর নিয়ে আসে।

যে সাতদিন মুখচ্ছবি আঁকবে। কিন্তু কোনো ছবিই সাতদিনের আগে দেখাবে না চিত্রকর। চিত্র আঁকার মধ্য দিয়ে লেখক রাজনীতিবিদের চরিত্রের নানা দিক তুলে ধরেছেন। কীভাবে রাজনীতিবিদরা মানুষের সঙ্গে অভিনয় করে।

কথাসাহিত্যিক প্রিন্স আশরাফ লেখায় নান্দনিকতার ছোঁয়া দিয়েছেন। ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে মহীরুহে পরিণত হবেন তিনিÑ এই প্রত্যাশা।

এখানে শিরদাঁড়া মেরামত করা হয়
প্রিন্স আশরাফ
প্রকাশক : অক্ষরবৃত্ত
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২০
প্রচ্ছদ : আল নোমান
দাম : ১৮০ টাকা