ঢাকা, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ১ বৈশাখ ১৪৩১

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

ভারত জুড়ো যাত্রা

কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

মো. নিজাম উদ্দিন
🕐 ৭:২৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২৩

কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

এক.
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ৭ সেপ্টেম্ব ২০২২,একটি ব্যতিক্রম ধর্মী রাজনৈতিক কর্মসূচী ঘোষণা করেছিল।কংগ্রেস যার নাম দিয়েছে ভারত জোড়ো যাত্রা!এটি মূলত একটি লং মার্চ।জাতীয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছে এই রাজনৈতিক কর্মসূচীটি।কংগ্রেস মনে করে বিজেপি ভারতকে হিন্দু -মুসলিম, ধর্ম,বর্ণ ও ভাষার ভিত্তিতে নানা ভাগে ভাগ করে ফেলেছে।

কংগ্রেস বিজেপির ভাগ করে ফেলা ভারতকে একসাথে জুড়া লাগাতে চায়।কংগ্রেস হিন্দু মুসলমানের বিভাজন বন্ধ করার কথা বলছে। কংগ্রেস ভারতে একটি সেকুলার পলিটিকাল পার্টি হিসাবে পরিচিত।সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চাটা কংগ্রেসে বিজেপির তুলনায় কম।কংগ্রেস কর্মসূচীটির মাধ্যমে বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের কথা,মিলে যাওয়ার কথা বলছে।লং মার্চটির নাম দিয়েছে ভারত জোড়ো যাত্রা।ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের সময়টা এখন খুব ভালো নেই, এটাই বাস্তব।

দলে ভাঙ্গা গড়ার নানা খেলা। মাঠেও ঝিমিয়ে পড়েছে দলটি
এরপরেও ভালো সংবাদ কিছু দিন পূর্বে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ব নির্বাচনে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে গান্ধী পরিবারের বাইরে প্রবীণ কংগ্রেসম্যান মল্লিকার্জুন কার্গে কংগ্রেসের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সভাপতি নির্বাচন করে শশী থারুর পরাজিত হয়েছেন।এগুলো কংগ্রেসের নতুন এক রাজনৈতিক ডাইমেনশন।যেখানে গান্ধী পরিবার নেতৃত্বের বাইরে থেকেও কংগ্রেসের সবখানেই আছে।কংগ্রেসের যখন সভাপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে রাহুল গান্ধী তখন কংগ্রেসের তৃণমূলে যুক্ত হওয়ার যুগান্তকারী কর্মসূচী ভারত জুড়ো যাত্রা নিয়ে ব্যস্ত।কথা হলে হলো এই যে বিশাল কর্মসচী ভারত জুড়ো যাত্রা -এখান থেকে কংগ্রেস কী পেল?চলুক -খোঁজ নিয়ে আসি।

দুই.
২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচন।নরেন্দ্র মোদীর বিপরীতে এখন পর্যন্ত শক্তিশালী কোনো প্রার্থী নেই। আঞ্চলিক দল গুলোর সহযোগিতা এবং জোট ছাড়া বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করা খুব কঠিন হবে।যদিও বিজেপি বিভাজন বিভক্তিকেই রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। ২০২৪ সালে বিরোধী জোটের নেতৃত্ব গান্ধী পরিবার কিংবা কংগ্রেসের হাতেই যাচ্ছে তাও বলা যাচ্ছে না।পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিজেকে মোদির প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেন। শেষ পর্যন্ত খেলাটা মোদি বনাম দিদিতে জমে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।তবে জাতীয় পর্যায়ে সারা দেশে এখনো কংগ্রেসের যে সাংগঠনিক কাঠামো আছে এটা আর কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেই। যদিও পার্লামেন্টারী পলিটিক্সে কংগ্রেসের এখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছে।কংগ্রেস ভারত জোড়ো যাত্রা কর্মসূচীর মাধ্যমে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করে ফেলবে কিংবা বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিবে কোনোটাই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু কংগ্রেসের এই মানুষের কাছে যাওয়ার কর্মসূচীটি সংগঠনে নতুন প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে দিয়েছে।রাজনৈতিক দলের কাজই হচ্ছে মানুষের মৌলিক দাবি নিয়ে রাজপথে, মাঠে ঘাটে থাকা। এটা না পারলে অনেক প্রাচীন রাজনৈতিক দলও হারিয়ে যেতে পারে। যেমন-মুসলিম লীগ।

তিন.
ভারত জোড়ো যাত্রা কর্মসূচীটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কংগ্রেস প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিমি এর বেশি পথ পায়ে হেটে পাড়ি দিয়েছে।বলা হচ্ছে এই সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লং মার্চ বা পদযাত্রা কর্মসূচী এটি।তামিলনাড়ুর কণ্যাকুমারী থেকে ভারত জোড়ো যাত্রা কর্মসূচীটির যাত্রা শুরু হয়ে শেষ হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে গিয়ে। প্রায় পাঁচ মাসে কংগ্রেস ভারত জোড়ো যাত্রা কর্মসূচীর মাধ্যমে বারোটি প্রদেশ এবং দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল পায়ে হেটে পাড়ি দিয়েছে।রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাবেক সভাপতি,সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দেয়া কানহাইয়া কুমারসহ কংগ্রেসের একশো কেন্দ্রীয় নেতা এই কর্মসূচীতে যুক্ত হয়েছেন। রাস্তায় নেতারা কোনো হোটেলে থাকেননি।

দৈনিক গড়ে ২২-২৩ কি.মি. পদযাত্রাটি হেঁটেছেন
রাস্তাতেই খাওয়া দাওয়া হয়েছে।ষাটটি বিশেষ কন্টেইনারে নেতারা থেকেছেন,ঘুমিয়েছেন। একদল সকাল সাতটা থেকে সারে দশটা এবং অন্য দল বিকাল সারে তিনটা থেকে সারে ছয়টা পর্যন্ত হেটেছে।কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে এই পদযাত্রায় যখন যেখান দিয়ে পদযাত্রাটি গিয়েছে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কংগ্রেসের লোকাল নেতৃবৃন্দও এই ভারত জোড়ো যাত্রা কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ করেছে।কংগ্রেসের সবচেয়ে খারাপ সময়ে এ এক দারুণ সারা জাগানো কর্মসূচী।ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে ভারতের গণতন্ত্র প্রিয় মানুষ রাহুল গান্ধীর সাথে হাতে হাত রেখে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।এই ধরনের কর্মসূচী ক্ষমতার রাজনীতির কোনো হিসাব নিকেশ হয়ত রাতারাতি পাল্টাবে না তবে কংগ্রেসকে ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসূচীটি তৃণমূলের সাথে খুব ভালো ভাবেই যুক্ত করেছে।বলা চলে কিছুটা নতুন প্রাণ পেল দলটি।

চার.
বলা হচ্ছে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করতেই গণতন্ত্র ও সুশাসনের পক্ষে কংগ্রেসের এই কর্মসূচী।২০২৪ সালে ভারতের লোকসভার নির্বাচন।বিদ্যুৎ,জ্বালানি এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়ছে।ভারতব্যাপী মানুষকে কংগ্রেসের নতুন রাজনীতি সম্পর্কে বার্তা দিতেই এই কর্মসূচী।আগামী লোকসভা নির্বাচনকে টার্গেট করেই কংগ্রেসের ভারত ব্যাপী এই কর্মসূচী নিয়ে মাঠে থাকা।কংগ্রেসের ব্যতিক্রমধর্মী এই রাজনৈতিক কর্মসূচীটি কতটুকু সফল হবে বলার সময় আসেনি।তবে ভিন্ন ধাঁচের এই কর্মসূচী কংগ্রেসের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।যেদিন কর্মসূচীটি শুরু হয় তার পর থেকে রাহুল গান্ধী তার দাড়ি কাটেননি!রাহুল গান্ধীর চেহারায় ভারতের পথে প্রান্তরে ছুটে চলার প্রভাব স্পষ্ট। নেতাদের কর্মীরা কাছে চায়,পাশে চায়,সুখ দুঃখ এক সাথে ভাগাভাগি করতে চায়-ভারত জুড়ো যাত্রায় রাহুল সেই কাজটি করতে পেরেছেন।কংগ্রেস ছাড়াও প্রায় দুইশো সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেসের ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসূচীকে সমর্থন জানিয়েছে এবং ভিন্ন দলের অনেকেই রাহুলের সাথে যুক্ত থেকেছে।ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি ইনক্লুসিভ কর্মসূচী। পাঁচ মাসব্যাপী একটি কর্মসচী সফল করা খুব সহজ কথা নয়।কর্মসূচী চলাকালীন সময়ে ভারতের বিভিন্ন পথে প্রান্তরে রাহুল গান্ধী তরুণদের কথা শুনেছেন,বলেছেন।বক্তৃতা করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও।তরুণদের মনের ভাষা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন।সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কেউ ই কংগ্রেসের শীর্ষ স্থানীয় দুটি পদের একটিতেও নেই। এটাও একটা দারুণ কৌশল। কংগ্রেস মানেই গান্ধী পরিবার।নেতৃত্ব থেকে দূরে থেকে মানুষের কাছে থাকার গান্ধার পরিবারের এই রাজনৈতিক কৌশল দলটিকে বাড়তি সুবিধা দিবে বলেই মনে হচ্ছে।রাহুল গান্ধী ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসূচীটিকে দলীয় রাজনীতির বাইরে একটি সার্বজনীন রুপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।সফলও হয়েছেন বলা চলে।না হয় প্রায় দুইশোর অধিক সংগঠন কেন কংগ্রেসের ভারত জুড়ো যাত্রায় সমর্থন জানাবে।

পাঁচ.
রাজনৈতিক দলের কর্মসূচীতে বৈচিত্র্য প্রয়োজন।বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের বাইরেও অনেক ক্রিয়েটিভ চিন্তা করা যায় যা মানুষকে সচেতন হতে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।দলের দাবীকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে কংগ্রেসের ভারত জোড়ো যাত্রা কর্মসূচীটি একটি ব্যতিক্রমি রাজনৈতিক উদ্যোগ।এই ধরনের কর্মসূচী একটা দলকে দেশ ও জনগণকে বুঝতে সহায়তা করে।কংগ্রেসের এই কর্মসূচীটি সত্যিই ইমপ্রেসিভ।ভারতে বিজেপিকে কাউন্টার করার মতো একক রাজনৈতিক শক্তি এখন নেই।আঞ্চলিক দলগুলোর জোট ছাড়া মোদিকে সরানো অসম্ভব। কংগ্রেসের দুর্বলতা, মমতার তৃতীয় বারের মতো পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হওয়ার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার একটা সম্ভাবনাও আলোচিত হয়।রাহুল গান্ধী ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসূচীর মাধ্যমে ২০২৪ সালে লোকসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য জাতীয় জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার ভিত্তিটা আরও শক্ত করে ফেললেন।বিজেপির বিভক্ত ভারতকে একসাথে যুক্ত করার কংগ্রেসের ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসচী পুরো ভারতকে একটি নতুন বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছে।সেটি হচ্ছে বিভক্তি ও বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে ঐক্য,সংহতির রাজনীতি, ভালোবাসার রাজনীতি।ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসূচীর মাধ্যমে কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থান বিজেপির বিরুদ্ধে বেশ শক্ত পাটাতনেই দাঁড়ালো। একটা রাজনৈতিক দলের নতুন চিন্তা,জন সম্পৃক্ত কর্মসূচী,বাস্তব সম্মত পলিসিএবং মানুষের কাছে থাকার রাজনীতি-এগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি!মানুষের অধিকারের জন্য লড়াকু রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কংগ্রেসের ভারত জুড়ো যাত্রা কর্মসূচীটি একটি প্রাসঙ্গিক মডেল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 
Electronic Paper