পঞ্চ কবির মধুরায়ণ

ঢাকা, সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০২২ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

পঞ্চ কবির মধুরায়ণ

রায়হান উল্লাহ
🕐 ২:৫৬ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০২২

পঞ্চ কবির মধুরায়ণ

লেখমালা প্রকাশ করেছে ৫ কবির একটি প্রকাশনা ‘প্যাকেজ’। প্রতিটি পুস্তিকায় স্থান পেয়েছে প্রত্যেকের ১৪টি কবিতা। এই পাঁচ কবি হলেন নব্বই দশকের বায়তুল্লাহ কাদেরী, মামুন মুস্তাফা, প্রথম দশকের মামুন রশীদ, তুষার প্রসূন ও দ্বিতীয় দশকের বঙ্গ রাখাল। যদিও কবিতা কিংবা কবির দশক থাকে না। সেই দশক বিভাজনকে পেছনে রেখে এই পাঁচ কবি তাদের কবিতা দিয়ে এগিয়ে এসেছেন পাঠকের কাছে। ‘রূপমলাটে পদ-চতুর্দশী’ শিরোনামের কবিতা পুস্তিকায় কবি বায়তুল্লাহ কাদেরীর ১৪টি খণ্ড কবিতা স্থান পেয়েছে। এর মাঝে, সনেটের বউ এক ও দুই; পেন্সিল এক, দুই ও তিন; বৃষ্টির সনেট এক, দুই, তিন, চার ও পাঁচ; ফটোক্রেডিট; ইগোর গাড়িতে তুমি এবং কাপালিক এক ও দুই নামীয় কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে পাঠক অনন্য বায়তুল্লাহ্ কাদেরীকে চিনবেন। একজন কবিকে চিনবেন। কবির প্রেমের কবিতার পশরা আছে রূপ মলাটে পদ-চতুর্দশীতে; রূপের মলাটে।

‘শায়ক চিহ্ন’ নামের ক্ষুদ্র পুস্তিকায় মামুন মুস্তাফা ‘কুরুক্ষেত্র’ পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন; সেই জন্য বারবার প্রীত হই। কবিতাটি পড়া যাক ‘বিন্দুগুলো সরে যাচ্ছে/ চোখ তারার মতো কাঁপছে/ মানুষের বোধির জগত আজ ম্রিয়মাণ/ লক্ষ্যবিন্দু থেকে ক্রমশ ক্রমানবতি/ যেমন শ্যাওলা ঢাকা সমস্ত ভূগোল/ মানচিত্রে কম্পাসে গাঁথা পৃথিবী/ পাদটীকাময় কবিতার ঘরগেরস্তি/ শিয়রের পাশে কুরুক্ষেত্র, দ্বিতীয় গন্ধম।’

মামুন মুস্তাফা কথার কুরুক্ষেত্র সাজিয়েছেন। ১৬ পৃষ্ঠার শায়ক চিহ্ন-এ এছাড়াও রয়েছে রক্তচিহ্ন, আহ নির্বাচন, সুবর্ণচর, পেঁয়াজ ২০১৯, মুখ ও মুখোশ, সুন্দরের নখ, মায়াজাল, মানুষভ্রম, শঙ্খ আসেনি, বাঁশি বাজে, অচেনা পথের মিছিল, আধুনিক ও গুরু চান নজরানা নামের কবিতা। এসব কবিতা পাঠককে সন্ধান দেবে অন্য মামুন মুস্তাফার। কবির আরও একটি কবিতা পাঠ করা যাক ‘শঙ্খ আসেনি’ শিরোনামের কবিতায় তিনি বলছেন ‘শঙ্খ আসেনি/ এখানে তালতাল নিরন্ন সমাচার/ রুদ্র পাশবিকতা খেলছে নিয়তি/ ভাঙনের গাঢ় রসদ সাজিয়ে/ পথে পথে নহবত/ হাওয়ার ওড়াউড়ি।/ শঙ্খ আসবে না জানি/ অক্সিজেনের মাধুরী দিয়ে/ শয্যা পাতা. আগামীকাল সেই অন্ত্যেষ্টি।’

হয়তো কবিরা সময়ের হাত ধরে কবিতার এবং সবকিছুর অন্ত্যেষ্টি করেন। মৃত্যুও তাদের থামাতে পারে না। সময়ে থেকে যান তারা। অগ্রজ এ কবির এবং লেখমালার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।

‘যা কিছু লিখেছি সব সব প্রেমের কবিতা’ নামের পুস্তিকাটিতে কবি মামুন রশীদ ১৪টি ক্ষুদ্র অথচ বড় ভাবের প্রেমের কবিতা লিখেছেন। শিরোনামহীন এসব কবিতায় তিনি প্রেমের তরে কবির যন্ত্রণা, সুখানুভূতি এমনকি কল্পনা মিশিয়েছেন। পুস্তিকাটির অষ্টম কবিতাটি এমন ‘ঢেউহীন স্তব্ধ জলের অতলে, বকুল, তোমাকে মেলাতে পারি না।’ কবির এ প্রেমের ব্যাখ্যা তিনিই জানেন। এই তো সার্থকতা। এটি চরম রোমান্টিক কবিতা; ভিন্ন বাঁকে চরম জীবনবোধের কবিতাও।

পুস্তিকাটির শেষ কবিতাটি এমন ‘ঝিরিঝিরি বাতাস আমার ভালোলাগে। ঝমঝম বৃষ্টি আমার ভালোলাগে। রোদেলা আকাশ আমার ভালোলাগে। পূর্ণিমারাত আমার ভালোলাগে। সবুজ পাতাদের আমার ভালোলাগে। শান্ত নদী আমার ভালোলাগে। শিউলি ফুলে ছেয়ে থাকা উঠোন আমার ভালোলাগে। বকুল তোমাকে ভালোলাগে। এইসব ভালোলাগাকে ভালোবাসতে বাসতে দেখি নোংরা ফুটপাতে, ডাস্টবিনের পাশে সূর্যমুখীর মতো এক শিশু ভাতের থালা হাতে বসে আছে সকল ভালোলাগা উপেক্ষা করে।’

‘প্রেমাভ খ’ নামের পুস্তিকাটিতে রয়েছে কবি তুষার প্রসূনের শিরোনামহীন ১৪টি ছোট কবিতা। ‘প্রেমাভ খ’র প্রথম কবিতার প্রথম দুটি পঙ্ক্তি এমন ‘প্রতিটি কালো থেকে বেরিয়ে পড়েছে বিশেষ বিড়াল, দেহহীন/ প্রতিটি আলো থেকে বেরিয়ে পড়েছে নূরের পাহাড়, অন্তরীণ।’ পাঠক বুঝে নিতে পারেন বাকি কবিতাগুলোয় কবি কী মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অল্প কথায় গূঢ় ভাব পাবেন সবগুলোয়। কবিতা অনেকের কাছেই এমন। কথা কম ব্যাখ্যা বেশি।

‘অন্ধ যাজক’ নামের পুস্তিকাটিতে কবি বঙ্গ রাখালের আলোকাটা ভোর, বোবা মেয়েটি আমার বোন আছিল, বিদ্রোহী গুরুদাস, বুদ্ধ-প্রদীপ, ক্রাচে হাঁটে বাংলাদেশ, জীবনানন্দ, সিনেমাটিক শর্ট, দগদগে জীবনের গল্প..., মন বলছে কমু কমু, লালন, গন্তব্য বহুদূরে..., জারজ, ল্যাকেজ : নারী ও বিশ্বাসকে যেভাবে মেরেছিল নামের ১৪টি কবিতা আছে। সবকটি কবিতাতে কবির প্রেম, দ্রোহ, বিশ্বাস ও সংগ্রাম প্রকাশ পেয়েছে। দ্রোহ-সংগ্রাম ভিন্নভাবে দেখেছি আমি। দুটি কবিতার শেষ অংশ প্রকাশ করব। পাঠক বুঝবেন বঙ্গ রাখালের শব্দমালা বঙ্গের অগ্রণী হওয়ার দাবিদার। ক্রাচে হাঁটে বাংলাদেশ-এর শেষ অংশটুকু এমন ‘বাম পা হারিয়ে ক্রাচে ভর করে হাঁটে বাংলাদেশ’। কবির দেখা বাংলাদেশ পড়তে অন্ধ যাজক সংগ্রহ করতে হবে আপনাকে। বাংলাদেশ প্রত্যেক কবির হৃদয় ছুঁয়ে যায়; দেশের ভাবনায় কবির হৃদয় বিমর্ষ হয়। জীবনানন্দ কবিতাটির শেষ লাইন ‘অনিবার্য কারণবশত জীবনের সব আনন্দ আজ ম্লান...’।

এ যেন জীবনানন্দের সমাপ্তি দেহ ও শিল্পে। অন্ধ যাজকে বঙ্গ রাখাল সার্থক। এমন একটি অনবদ্য সংকলন প্রকাশ করায় মামুন মুস্তাফা ধন্যবাদ পাবেন। আরও ধন্যবাদ পাবেন শিশির মল্লিক। প্রতিটি পুস্তিকার ভাব বজায় রেখে চমৎকার ও যুতসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন। যা সুন্দর তাই বলেন কবিরা। আমি তাদের পরশে যেতে পারি তাই ধৃষ্টতা। তারা কবিতার হাত ধরে অনেকদূর এগোবেন। শিল্পের গেরস্থালিতে তাদের একজন হয়েই বলতে পারি কবিরা কী না পারেন? ঈর্ষা হওয়াই স্বাভাবিক।

 
Electronic Paper