রাশেদের বাইনোকুলার

ঢাকা, বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১ কার্তিক ১৪২৬

রাশেদের বাইনোকুলার

শাহেদ জাফর ১২:২৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

print
রাশেদের বাইনোকুলার

রাশেদ বাবার দিকে তাকাচ্ছে পিটপিট করে। আর বাবা রাশেদের দিকে তাকিয়ে হাসছে মিটমিট করে। বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে আজ। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। মাঠভরা ছাত্র-ছাত্রী আর অভিভাবকদের সামনে হেডস্যার রাশেদের নাম বলেছে মাইকে। রাশেদ বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।

মাইকে যখন হেডস্যার তার নামটা পড়ছিলেন, তার বিশ্বাস হয়নি। পরীক্ষা ভালো দিয়েছিল কিন্তু সবার মধ্যে প্রথম হবে এমনটা ভাবেনি। ভাববে কীভাবে? ক্লাসে পড়ালেখায় আরও ভালো ছেলেমেয়েরা আছে। কেউ কেউ তাদের বাবার প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে আসা যাওয়া করে। ভালো ভালো টিফিন সঙ্গে আনে। আর রাশেদ স্কুলে যায় বাবার সাইকেলে চড়ে। টিফিন কোনোদিন সঙ্গে থাকে, কোনোদিন থাকে না। স্কুল ড্রেস সবেমাত্র একটাই। সে কি-না রাসেল, ফয়সাল, মামুন, নাহিদদের টপকে পরীক্ষায় হয়েছে ফার্স্ট!

সাইকেলে চড়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাবা পরিচিত যাকেই সামনে পেলেন তার কাছেই রাশেদের রেজাল্টের গল্পটা করলেন সাইকেল থামিয়ে। রাশেদ বাবাকে এই প্রথম এতটা খুশি হতে দেখল। বাবা সাইকেল চালাতে চালাতেই বললেন, কিছু লাগবে তোমার?
-না বাবা কিছু লাগবে না।
-তোমার তো ঘড়ি নেই।
-ঘড়ি লাগবে না বাবা। ভাইয়ার তো ঘড়ি আছেই। দুজন মিলে ভাগাভাগি করেই তো পড়ি।
-তারপরও তোমাকে একটা কালো ফিতার সুন্দর ঘড়িই কিনে দেব।
-ঘড়ি লাগবে না আমার বাবা। শুধু শুধু টাকা নষ্ট হবে।
বাবা আর কিছু বললেন না। আপন মনে সাইকেল চালাতে থাকলেন।

রাশেদ মনে মনে ভাবল, তার যদি একটা বাইনোকুলার থাকত! বাইনোকুলারে চোখ রেখে দূরের গাছে বসা পাখি দেখতে পারত যত খুশি তত। ফড়িং দেখতে ভালো লাগত। মেঘ দেখতে ভালো লাগত। রাতের বেলা চাঁদ দেখতে খুব মজা হতো। ক্লাসে তপু আর ফয়সালের বাইনোকুলার আছে। স্কুলে নিয়ে আসে মাঝে মাঝে। কাউকে হাত দিয়ে ধরতে দেয় না দুষ্টুগুলো। শুধু ওদের বন্ধুদের ধরতে দেয়। রাশেদ একদিন চেয়েছিল। ওরা দেয়নি। তারপর মন খারাপ করে বাইনোকুলারের কথা বলেছিল বাবাকে। সে অনেকদিন আগের কথা। বাবার হয়তো মনে নেই। মনে না থাকলে নতুন করে আর মনে করে দেওয়ার দরকার মনে করল না রাশেদ। চুপচাপ সাইকেলের সামনে বসে রাস্তার চারপাশটা দেখতে দেখতে বাইনোকুলারের কথাটা ভুলে গেল সে। রাতের বেলা রাশেদদের বাসায় ছোটখাটো একটা খাবারের আয়োজন হয়ে গেল। ভালো রান্নাবান্না হলো। রাশেদের মামা চাচারা আসলেন বাসায়। কাজিনদের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প হলো। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই ঘুমিয়ে গেল। সকালবেলা রাশেদ ঘুম থেকে উঠে অবাক হয়ে দেখল ঘরটা ফুল, বেলুন আর রঙ-বেরঙের কাগজ দিয়ে সাজানো।
সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হলো, তার বালিশের পাশে নতুন একটি বাইনোকুলার রাখা!

বাইনোকুলারটা হাত দিয়ে কয়েকবার ছুঁয়ে দেখল রাশেদ। এক অন্যরকম অনুভূতি হলো তার! বিছানার একটু দূরেই হাসি হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাবা মা আর ভাইয়া। ভাইয়া বলল, এত সময় নিয়ে কেউ ঘুমায় বোকা! তাড়াতাড়ি উঠে পড়। বাইনোকুলার নিয়ে বাইরে যেতে হবে। ফড়িং দেখবি। মেঘ দেখবি। উড়ে চলা পাখি দেখবি। চল, চল তাড়াতাড়ি। রাশেদ কিছুই বলতে পারল না কাউকে। শুধু কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, ধন্যবাদ তোমাদের।