চামড়ায় জয় সিন্ডিকেটেরই

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

চামড়ায় জয় সিন্ডিকেটেরই

জাফর আহমদ ১০:৩৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৯

print
চামড়ায় জয় সিন্ডিকেটেরই

তৃণমূল পর্যায়ে চামড়া হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় করতে সম্মত হয়েছে। বাজার ঊর্ধ্বমুখী করতে কাঁচা চামড়া রপ্তানির যে ঘোষণা দিয়েছিল মন্ত্রণালয় সে ব্যাপারে কোনোই সিদ্ধান্তে হয়নি। এরই মধ্যে চামড়া বিক্রেতা পর্যায় থেকে পানির দরে বা ক্ষেত্র বিশেষে বিনা দামে আড়তদারদের গুদামে চলে এসেছে।

সিন্ডিকেট করে তৃণমূল পর্যায়ে চামড়ার মালিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাম দেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হলেও ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের মুনাফা করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলো।

বিষয়টিকে এক ধরনের নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, চামড়ার বাজার যে এমন নয়ছয় অবস্থা হতে পারে আগে থেকেই তা জানা ছিল। কিন্তু সরকারের উদ্যোগের মধ্যে দূরদর্শিতা ও সুচিন্তিত কৌশলের অভাব ছিল। শেষ পর্যন্ত যে উদ্যোগ নেওয়া হলো সেখানেও আগামী বছরের জন্য সিন্ডিকেট করার জন্য পথ খোলা রাখা হলো।

ঈদের আগে সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার দাম বেঁধে দেওয়া হলেও চামড়ার বাজারে এর কোনো প্রভাব ছিল না। ১২ আগস্ট ঈদের দিন থেকে পরের দিন মাঠপর্যায়ে চামড়ার দাম ১০ টাকা থেকে প্রকার ও স্থানভেদে ১০০ টাকা নেমে আসে। যা ছিল নজিরবিহীন। এর ফলে অনেকে রাগে ও ক্ষোভে অনেকে চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে ফেলে বা দাম ছাড়াই দিয়ে দেয়। কেউ কেউ চামড়া রাস্তায় ফেলে যায়। ট্যানারি মালিক সমিতির তথ্য মতে, মাটিতে পুঁতে ফেলা বা নষ্ট করে ফেলা চামড়ার হার ১০ শতাংশ। সে হিসাবে নষ্ট করে ফেলা চামড়ার পরিমাণ ১০ লাখের ওপরে। শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ুনের মতে, মাটিতে পুঁতে ফেলা চামড়ার পরিমাণ ১০ হাজার পিসের মতো।

চামড়া বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও এ সম্পর্কিত অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের শক্তিশালী যোগসাজশের কারণে চামড়ার দাম সর্বনিম্নে নেমে আসে। এতে পানির দামে চামড়া কিনতে সমর্থ হয় আড়তদাররা। এখন চামড়ার দাম বাড়লেও আর কোনোভাবেই চামড়ার মালিকরা পাবে না, চলে যাবে ট্যানারি মালিক আর আড়তদারদের পকেটে।

গতকাল রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ট্যানারি মালিকরা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কিনবে। এর আগে আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি না করার যে ঘোষণা দিয়েছিল, তারাও সে বক্তব্য প্রত্যাহার করে চামড়া বিক্রি করতে সম্মত হয়েছে।

অর্থাৎ আজ সরকারের বেঁধে দেওয়া গরুর কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুট (ঢাকায়) ৪৫-৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা এবং খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট (সারা দেশে) ১৮-২০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া দামে কেনা-বেচার শুরু হবে। কিন্তু এর মধ্যে বঞ্চিত হলো চামড়ার মালিকরা। আর পূর্ব নির্ধারিত ছকে সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করলো ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা। এদিকে চামড়ার দর চাঙ্গা করতে ও সিন্ডিকেটকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য চামড়া রপ্তানির ঘোষণা দিয়েছিল।

গতকালের বৈঠকে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত অনেকটাই ট্যানারি মালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। যা ট্যানারি মালিকরা কোনোভাবেই চায় না চামড়া রপ্তানি হোক। বা চামড়া তাদের হাতছাড়া হয়ে যাক।

সরকারের এ ধরনের ভূমিকাকে চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে নতি-স্বীকার বলেন মনে করেন পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, চামড়া রপ্তানি করার কথা ঘোষণা দিয়ে আবার পিছু হটার মধ্য দিয়ে সরকার প্রমাণ করলো, এ বছরে চামড়া ব্যবস্থাপনায় ‘সরকার পূর্ণাঙ্গ সার্কাস’ করার মধ্য দিয়ে আগামী বছরেও চামড়ার নিয়ন্ত্রণ কিছু মানুষের কাছে ছেড়ে দিয়ে রাখল। তারা আগামী বছরেও একই ধরনের খেলা খেলবে।

আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, চামড়ার দাম নিশ্চিত করতে হলে চামড়া দেশে ব্যবহারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। যতটুকু দেশে প্রয়োজন ততটুকু ব্যবহার করবে। যতটুকু প্রয়োজন নেই ততটুকু রপ্তানি করবে। তাহলে চামড়ার নিয়ন্ত্রণ এককভাবে কিছু লোকের ওপর থাকবে না। এবার রপ্তানির ঘোষণা দিয়ে সরে আসা মানে কিছু লোকের কাছে নতিস্বীকার করা।