ইতিহাস কথা কও

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

ইতিহাস কথা কও

মাহমুদ সেলিম ৬:২৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৫, ২০১৯

print
ইতিহাস কথা কও

১৯৭৫। পনেরোই আগস্ট। টিকাটুলির ৬ ভগবতী ব্যানার্জি রোডের বড় বোনের বাসায় আমি আর সেলিম রেজা ঘুমিয়ে। আমরা দুজনই উদীচী করি। ভোরবেলা হইচই শুনে ঘুম ভেঙে গেল। জেগে দেখি, বাড়িসুদ্ধ লোকজন উঠে গেছে। বাবুল কাকা রেডিওতে ঘোষণা শুনছেন। ‘বাংলাদেশ বেতার ঢাকা’ হঠাৎ করে পাকিস্তানি আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা’ হয়ে গেছে। মেজর ডালিম নামে একজন ঘোষণা করছে ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে.....’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা সবাই শুনে স্তম্ভিত। বিশ্বাস হলো না। বিলম্ব না করে আমি আর সেলিম রেজা বেরিয়ে পড়লাম। গত মাসে জন্মদিনে প্রতিজ্ঞা করে ধূমপান ছেড়েছি সে কথা মনে নেই। চার প্যাকেট স্টার সিগারেট আর ম্যাচবক্স কিনে দুজন হাঁটতে শুরু করলাম। উদ্দেশ্য ৩২নং ধানমন্ডি।

পথে পথে শঙ্কিত মানুষের ত্রস্ত পথচলা। উৎসুক মানুষের ভিড়। সবাই বিভ্রান্ত। কী হলো? মাঝে মাঝে ট্যাংক যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। ট্যাংকের ওপর কিছু মানুষ খন্দকার মোশতাকের ছবিতে মালা দিয়ে চিৎকার করে জিন্দাবাদ দিচ্ছে। হতবিহ্বল মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। ট্যাংকের ওপর আরোহীরা ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে স্লোগান দিচ্ছে-‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’ অতি উৎসাহী কেউ কেউ বলেছে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। পাকিস্তানের পতাকাও দেখলাম। রাগে আমাদের শরীর রি রি করছে। আমরা দুজন তখন একজন আরেকজনকে থামাই, যাতে উত্তেজিত না হয়ে পড়ি। এর মাঝে শুনলাম একটা ট্রাকে কিছু লোক গাইছে- ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ/বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।/পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায়/পঞ্চ নদীর তীরে অরুণিমায়/ধূসর সিন্ধুর মরু সাহারায়/ঝাণ্ডা জাগে যে আজাদ’। এ গানটি পাকিস্তান আমলে স্কুলে গাওয়া হতো। শুধু ‘পাকিস্তান’ শব্দটি বদলে ‘বাংলাদেশ’ বসানো হয়েছে। পঞ্চ নদীর দেশ যে পাঞ্জাব এবং সিন্ধু যে পাকিস্তানি প্রদেশ-একথা গায়করা হয় খেয়াল করেনি, অথবা ইচ্ছে করেই গাইছে। প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে দেখি একই অবস্থা। মানুষ পথে পথে ভিড় করছে, কিন্তু বিভ্রান্ত। সবাই আশা করছে, এটি বাস্তব নয়। এটি একটি দুঃস্বপ্ন।

উদীচী অফিসে গেলাম। এত সকালে কেউ থাকার কথা নয়। সেকেন্ড গেট এলাকায় ‘গুলনার’ রেস্টুরেন্টে গেলাম। কয়েকজন মৌলভি গোছের মানুষ বসে আছেন। মুখে চাপা উল্লাস। একজন বলছে, ‘আল্লার পাগল আল্লায় সামলায়।’ পরিবেশটা সুবিধের নয় দেখে বেরিয়ে এলাম। সন্ধ্যায় উদীচী অফিসের সামনে সবাই এসেছে। সাধারণ সম্পাদক সেন্টু রায়, অপু, ফায়সাল, গোলাপ, মজিবর এবং আরও অনেকে। গোপনে সবাই উদীচী অফিসের ভেতরে ঢুকলাম। আলো না জ্বালিয়েই। সেন্টু রায় আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সেলিম এইটা কী হইল?’। সবার মুখ কান্নায় থম থম করছে। সেন্টু দা-ই বললেন, ‘সেলিম আসেন গান ধরি।’ এবং প্রথম গান ধরলেন রবীন্দ্র সংগীত-‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো’/বিশেষ করে, ‘তুমি মরণ ভুলে কোন অনন্ত প্রাণ সাগরে আনন্দে ভাসো।’-অংশটি গাইবার সময় সবার বুকের চাপা কান্না হু হু করে বেরিয়ে এলো। কদিন পর এমনি এক আসর থেকে সেন্টু রায় আমাকে, গোলাপকে আর ফায়সালকে নিয়ে চললেন আব্দুল বারিক চৌধুরীর বাসায়। আমরা বলতাম বারী ভাই। সে বাসায় গানের আসর। শ্রোতা সবাই সিনিয়র মানুষ। এঁদের সামনে গান গাইতে হবে।

আমরা গাইলাম, ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে।’ শ্রোতাদের একজন বললেন, ‘ধন-ধান্য-পুষ্প ভরা’ গাও। আমরা গান ধরলাম। অবাক হয়ে দেখলাম তাঁরা সবাই একজন আরেক জনের গলা ধরে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। আর অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছেন। বুঝলাম বঙ্গবন্ধুর জন্য কান্নাটা সবারই বুকেই জমাট বেঁধে ছিল। গানের টানে বেরিয়ে আসছে।

প্রায় প্রতিদিনই চলতে থাকল এই কান্নার আসর। এ আসরে আসতেন খন্দকার আসাদুজ্জামান (সচিব), এস এম সামাদ (মুখ্য সচিব), শামসুর রহমান (রাষ্ট্রদূত), কবি শামসুর রাহমান, ড. মিজানুর রহমান শেলী, এ কে এম আবুল হাসান (সচিব), মান্নান ভাই (যুগ্ম সচিব), শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, শওকত আলী (তখন ঢাকার জেলা প্রশাসক) এবং কখনো কখনো এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খানও আসতেন।