বগুড়ার স্বপ্নবাজ পাঁচ নারী

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বগুড়ার স্বপ্নবাজ পাঁচ নারী

রোকেয়া ডেস্ক ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

print
বগুড়ার স্বপ্নবাজ পাঁচ নারী

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন নিজে কিছু করার। স্বপ্ন বাস্তবায়নে হেঁটেছেন সেই পথে। লক্ষ্য একটাই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। দূর করতে হবে সমাজে নারীদের প্রতি বঞ্চনা আর অবহেলা। কিন্তু চলার পথে নানা প্রতিবন্ধকতায় হোঁচটও খেয়েছেন অনেকবার। তবু দমে যাননি তারা। আপন লক্ষ্যে চলেছেন এগিয়ে। এক সময় পৌঁছে গেছেন লক্ষ্যের চূড়ায়। প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা বগুড়ার পাঁচ নারীর সফলতার গল্প তুলে ধরেছেন তোফাজ্জল হোসেন। সম্পাদনা করেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

জীবন যুদ্ধে জয়ী নাহিদ সুলতানা
বিয়েই নারীর জীবনের সর্বশেষ প্রাপ্তি না ভেবে নাহিদ সুলতানা তৃপ্তি অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও তার লেখাপড়া চালিয়ে যান। স্বামী তখনও বেকার। বেকার স্বামীর ঘরে স্ত্রীর লেখাপড়ার খরচ আর সংসার সামলানো ভাবনারই বিষয় হয়ে ওঠে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নাহিদ সুলতানা তৃপ্তির। তখন তার হাতে একটিই সম্বল এসএসসি পাসের সার্টিফিকেট। সেটা নিয়েই সংসারের অভাব মেটাতে স্থানীয় একটি এনজিওতে মাঠকর্মীর চাকরি নেন। সেই চাকরি করতে গিয়ে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। সংসার টিকে রাখার জন্য লেখাপড়া বাদ দিয়ে চাকরিটাই ধরে রাখেন তিনি। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ আগে থেকেই। সে কারণে দুই বছর চাকরি করেন তিনি। এরপর চাকরি ছেড়ে আবার লেখাপড়া শুরু করেন নাহিদ সুলতানা তৃপ্তি।

১৯৯৯ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন। স্বামী তখনও বেকার। স্বামীর সংসার চালানোসহ তাকে যে ঘুরে দাঁড়াতে হবে, তার মতো সমাজের মানুষের পাশেও দাঁড়াতে হবে, এমন দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী মনোবল তার অটটুট ছিল। সে বিশ্বাস নিয়েই বাড়ির অপ্রশস্ত উঠানে ১৫০টি লেয়ার মুরগি নিয়ে খামার শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পর শুরু করেন ব্রয়লার পালন। সে সময়ে এলাকার একজন প্রশিক্ষিত যুবকের কাছ থেকে জানতে পারেন যুব উন্নয়ন অধিদফতর বগুড়ায় গবাদিপশু মৎস্য চাষ ও হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন প্রদান সমস্যাজনিত কারণে তার খামারটিও লাভজনক হচ্ছিল না।

এসব কারণে ২০০১ সালে তিনি যুব উন্নয়ন অধিদফতর বগুড়ার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গবাদিপশু মৎস্য চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ক তিন মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। সেই প্রশিক্ষণ শেষে ঋণ নিয়ে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খামার বড় করতে শুরু করেন গ্রামের গৃহবধূ নাহিদ সুলতানা তৃপ্তি। এভাবে দিনে দিনে খামারটি ১৪টি মুরগির সেডে প্রসারিত হয় এবং সাড়ে ২১ হাজার মুরগি পালন করা হয়। তৃপ্তি টেডার্স নামে ওই পোল্ট্রি খামার পরবর্তীতে আরও প্রসারিত হয়েছে তার। তিনি ওই এলাকায় গরুর খামার এবং মৎস্য খামারও দিয়েছেন। শুধু পোল্ট্রি, গরু ও মৎস্য খামারই দেননি তিনি। আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারের ছাতনী এলাকায় গড়ে তুলেছেন থ্রি-স্টার ম্যাট ইন্ডাস্ট্রি। থ্রি-স্টার ম্যাট ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম নয়ন জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা রয়েছে থ্রি-স্টার ম্যাট ইন্ডাস্ট্রির মাদুরের। প্রায় ৪৮টি মেশিনে এ প্লাস্টিক ম্যাট তৈরি করা হয়। পোল্ট্রি, মৎস্য এবং ম্যাট ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ১৫০ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

নাহিদ সুলতানা তৃপ্তির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই তার স্বামী তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেছেন।

একেবারে শূন্য অবস্থা থেকে দৃঢ় মনোবল আর যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশিক্ষণ সম্বল করে বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে বগুড়ার নাহিদ সুলতানা তৃপ্তি আজ হয়ে উঠেছেন একজন সফল আত্মকর্মী। আত্মকর্মে তার সফলতার জন্য ২০০৯ সালে ঢাকায় শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মী হিসেবে নারী কোটাই জাতীয় যুব পুরস্কার পান তিনি।

অদম্য জান্নাতুল ফেরদৌসী
ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার প্রতি আগ্রহী ছিলেন তিনি। বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার জোড়গাছা ইউনিয়নের বয়ড়া গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে অর্থনৈতিক দৈন্যতার মধ্যেও প্রবল আগ্রহ আর ইচ্ছাশক্তির কারণে পড়াশুনা করেছেন। এইচএসসিতে ভর্তির পরপরই বিয়ে হয় জান্নাতুল ফেরদৌসী রুম্পার। বন্ধ হয়ে যায় পড়াশুনা। কিন্তু পড়াশুনা চালিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। স্বামীর সহযোগিতায় দুই বছর পর আবার শুরু করেন পড়ালেখা। অদম্য এ নারী ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে সৈয়দ আহম্মেদ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি ও সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই ব্যতিক্রমী ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই তিনি চোখের সামনে দেখা সমাজের নারীদের বঞ্চনা, অবহেলা দূর করতে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। পাশের গরিব-অসহায় বন্ধু যে তার চেয়েও দৈন্যদশায় রয়েছে এমন বন্ধুদের অর্থকষ্টে কেঁদে উঠতো তার প্রাণ। তাই বাল্যকালেই বন্ধুদের নিয়ে কিছু বাঁচিয়ে গঠন করেন একটি তহবিল। আর সেখান থেকে বন্ধুরা মিলে গরিব বন্ধুকে সহায়তা করতেন তারা, কিনে দিতেন বই-খাতা-কলম। ছোটবেলায় গান করতেন রুম্পা।

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে গানসহ বিভিন্ন সহপাঠ্য কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অর্জন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার। ছোটবেলা থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য ইচ্ছা পোষণ করতেন তিনি। পড়াশুনা শেষে চাকরির সুযোগ মেলে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত বয়ড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। বর্তমানে তিনি বিদ্যালয়টির এসএসসি (ভোকেশনাল) শিক্ষাক্রমের ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।

দুই সন্তানের জননী, মানুষ গড়ার কারিগর রুম্পা স্বামী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের যথাযথ দেখভালের পাশাপাশি স্বপ্নবাজ মন ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, যৌতুকবিরোধী প্রচারণাসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে সব সময় সক্রিয় অবস্থানে রয়েছেন তিনি। মাদকবিরোধী প্রচারণা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নারী জাগরণী ইস্যুতেও একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে চোখে পড়ে জান্নাতুল ফেরদৌসী রুম্পার সরব ভূমিকা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে পিএইচআরের মানবাধিকার কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা জান্নাতুল ফেরদৌসী রুম্পা ২০১৫ সালে তাঁর স্বীয় যোগ্যতায় এ কর্মসূচিতে উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হন।

ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে তার সামাজিক কর্মকা-ের পরিধি। যেখানেই নারীদের সমস্যা সেখানেই ছুটে চলেছেন তিনি। অবহেলিত নারীদের উৎসাহিত করছেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত জান্নাতুল ফেরদৌসী রুম্পা ২০১৮ সালে অংশগ্রহণ করেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে। বিপুল ভোটে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন তিনি। আশাবাদী জান্নাতুল ফেরদৌসী রুম্পা সমাজে নারীদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করে যেতে চান। একইসঙ্গে বাড়াতে চান তার কাজের পরিধি। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে আরও বড় জায়গায় নিজের অবস্থান তৈরি করে জনমানুষের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান তিনি।

আত্মপ্রত্যয়ী জাকিয়া সুলতানা
শৈল্পিক কাজে আগ্রহ ও সখ ছিল তার ছোট বেলা থেকেই। অঙ্কন, নৃত্য, কালচারাল প্রোগামে ছিল নিয়মিত অংশগ্রহণ। পঞ্চম শ্রেণীতে লেখাপড়ার সময়ই রোপ্য পদক পেয়েছেন বগুড়া শহরের শিববাটি এলাকার জাকিয়া সুলতানা। লেখাপড়া করেছেন শহরের ভান্ডারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করেন তিনি। তবে স্কুল পেরিয়ে কলেজে প্রবেশের আগেই বাল্যবিয়ের শিকার হন। তবুও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার আত্মপ্রত্যয় নিয়ে সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে এইএসসিতে ভর্তি হন তিনি।

একজন গৃহবধূ হয়েও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে এইএসসিতেও ভালো ফলাফল করেন। পড়াশুনা ও সংসার জীবনে হঠাৎই যোগ হয় স্বামীর অসুস্থতা। একপর্যায়ে প্রয়োজনের তাগিদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, এমন শক্ত মনোবল বাসা বাঁধতে শুরু করে তার মনে। যেহেতু শৈল্পিক কাজের আগ্রহ আগে থেকেই ছিল, সেটাকেই কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সমাজের নারীদের জন্যও কিছু করার ইচ্ছা এবং স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন জাকিয়া সুলতানা।

এখন তিনি শুধুই একজন নারী নন গত দুই যুগে তিনি হয়ে উঠেছেন অর্থনৈতিকভাবে সফল একজন নারী ও একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। পেয়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কার। মুখ উজ্জ্বল করছেন নারী সমাজের।

শুরুর সময় ছিল ১৯৯৬ সাল। সে সময়ে হাতের কাজ করা শাড়ি, শাল, থ্রি-পিস বা শিশুদের জামা-কাপড় তেমন চোখে পড়তো না। শহরের নারীদের আলাদা কোনো শো-রুমও ছিল না। সে সময়ে একটি অ্যাম্ব্রডারি মেশিন নিয়ে অল্প করে শাড়ি, শাল কাপড় কিনে বাড়িতেই সেগুলোতে হাতের কাজ শুরু করেন। ওইসব তৈরি পোশাক বন্ধু-বান্ধবীরা দেখে ভালো বলতেন। সবাই যখন পছন্দ করতেন সেই কারণেই উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। সে সময়ে ২০০ টাকায় সাধারণ শাড়ি কিনে হাতের কাজ করার পর প্রতিটির খরচ পড়তো ৩৫০-৪৫০ টাকা। তখনও ব্যবসা বুঝতেন না তিনি। তবুও ২-৩ জন নারীকে নিয়ে কাজ শুরু করেন।

এরমাঝেই ১৯৯৮ সালে বগুড়া যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে পোশাক তৈরির উপর তিন মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণে ‘ক’ গ্রেডে উত্তীর্ণ হন জাকিয়া সুলতানা। তখনও বাইরে নারীদের আলাদা কোনো শো-রুম ছিল না। ওই প্রশিক্ষণের পর যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে ২০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে এবং নিজের আরও কিছু টাকা দিয়ে শহরে একটি কারখানা ও জলেশ্বরীতলায় কালিবাড়ি মোড়ে অনন্যা হ্যান্ডিক্রাফ্ট নামে একটি শো-রুম দেন তিনি। এখনও সেখানেই রয়েছে শো-রুমটি। প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেই কাপড়ের ডিজাইন করতেন এবং শো-রুমে সেগুলো বিক্রি করা হতো।

এভাবে শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই সাফল্য আসতে থাকে তার জীবনে। ২০০০ সালে তাকে বগুড়ায় জেলা ভিত্তিক আত্মকর্মী পুরস্কার দেওয়া হয়।

২০০১ সালে ঢাকায় আয়োজিত যুব মেলায় নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বগুড়া থেকে তিনি অংশ গ্রহণকরেন। ওই মেলায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অনন্যা হ্যান্ডিক্রাফ্টের স্টল পঞ্চম পুরস্কার লাভ করে। ওই যুব মেলা ও স্টলের পুরস্কার প্রাপ্তির পর থেকে অনন্যা হ্যান্ডিক্রাফ্টের পরিচিতি জেলা শহরের বাইরেও বাড়তে থাকে।

এরপর ঢাকা থেকে পণ্যের পাইকারিভাবে চাহিদা আসতে থাকে। প্রতি বছর মেলায় অংশগ্রহণ অব্যাহত থাকে। পণ্যের চাহিদাও বাড়তে থাকে। তার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন প্রায় দেড় শতাধিক নারী। তারা মজুরীভিত্তিক শাড়ি, থ্রি-পিস, ম্যাক্সি, বেড কাভার, কুশন কভার, বাচ্চাদের পোশাকে তৈরি করতে থাকেন চাহিদা মোতাবেক।

শুধু নিজের কারখানার পণ্যই তিনি বিক্রি করছেন না। যেসব নারী পণ্য তৈরি করেন অথচ তাদের সেগুলো বিক্রির নিজস্ব শো-রুম নেই, এমন নারীদের তৈরি পণ্যও তিনি মার্কেটে বিক্রির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে সহযোগিতা করে আসছেন।

জাকিয়া সুলতানা বলেন, শুরুর দিকে ঢাকা বা অন্য এলাকায় যে মেলাগুলোতে অংশগ্রহণ হয়েছে, সে সময়ে জেলা শহর থেকে গিয়ে নারীদের নানা প্রতিবন্ধকতা পার করতে হয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তার এ ব্যবসার প্রসার ঘটাতে শুরু থেকেই বিভিন্ন জায়গায় যুব মেলায় অনন্যা হ্যান্ডিক্রাফ্টের স্টল নিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। ২০০৩ সালে ভারতে বাংলার মুখ মেলায়ও তার অনন্যা হ্যান্ডিক্রাফ্টের স্টল অংশ নেয়। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে যেখানেই আমন্ত্রণ পেয়েছেন সেখানেই অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সাল ও এর পরবর্তী সময়ে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মার্কেটিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ, বিসিক থেকে ক্ষুদ্র শিল্পে পণ্যের মান ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ, এসএমই প্রডাক্ট কসটিং অ্যান্ড প্রাইজিং বিষয়ক এবং ভারতে স্ট্যাটেস্টিং ডিজাইনের উপর প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। পেয়েছেন পুরস্কারও।

সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- জাতীয় মহিলা সংস্থার উদ্যোগে ২০০৪ সালে রাজশাহীতে ট্রেড ফেয়ারে প্রথম পুরস্কার, ২০০৭ সালে নিজস্ব ডিজাইনকৃত শাড়ি নিয়ে আনন্দ আলো ঈদ ফ্যাশন পত্রিকায় অংশগ্রহণ করে সেলিব্রেটি নারী পুরস্কার বিভাগে স্থান পান তিনি। ২০০৮ সালে ঢাকায় যুব মেলায় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করে অনন্যা হ্যান্ডিক্রাফ্ট। ২০০৯ সালে এফবিসিসিআই আয়োজিত স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড এসএমই অ্যাওয়ার্ডে জাকিয়া সুলতানা শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার পান।

২০১১ সালে সফল আত্মকর্মী হিসেবে জাতীয় যুব পুরস্কার পান তিনি। ২০১৯ সালে বগুড়ায় মহিলা অধিদফতর আয়োজিত আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন উপলক্ষে অর্থনৈতিকভাবে সফলতা অর্জনকারী নারী হিসেবে জয়িতা পুরস্কার পান বগুড়ার জাকিয়া সুলতানা।

গৃহবধূ থেকে প্রশিক্ষক আঞ্জুয়ারা
অল্প লেখাপড়া নিয়েই বিয়ে হয় মোছা. আঞ্জুয়ারা বেগমের। স্বামী তখনও বেকার। সংসারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আনা খুব জরুরি তার।
তাই কিছু একটা করতে হবে তাকে। সব সময় এমন ভাবনাই ছিল বগুড়ার কাহালু উপজেলার মালঞ্চা ইউনিয়নের পানির সারা গ্রামের গৃহবধূ আঞ্জুয়ারা বেগমের। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাসব্যাপী স্বাক্ষরতা উত্তর দর্জি বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। এরপর ২০০৯ সালের মার্চ মাসে ১৫ দিনব্যাপী আনসার ভিডিপির মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন। এসব প্রশিক্ষণে অনেক কিছুই শিখতে পারেন তিনি। আরও প্রশিক্ষণ নিতে হবে সেই চেষ্টারও কমতি ছিল না তার।

এরপর কাহালু উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. গোলাম মোর্শেদের সঙ্গে পরিচয় হয় আঞ্জুয়ারা বেগমের। ওই কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে যুব নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তার সার্বিক সহযোগিতায় ২০১৭ সালের মার্চ মাসে যুব উন্নয়ন অধিদফতর বগুড়া থেকে সাত দিনব্যাপী বাটিক ও ব্লক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। এ প্রশিক্ষণ শেষ হলে ওই সালেই একই অধিদফতর থেকে তিন মাসব্যাপী পোশাক তৈরির উপরও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি। ভালোভাবে এসব প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করায় তাকে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে তাকে প্রশিক্ষক হিসেবে গ্রামে গ্রামে পাঠানো হয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য।

যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উদ্যোগে কাহালু উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে তিনি যুব নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। এ পর্যন্ত ৭০০ জন যুব নারীকে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শুধু যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশিক্ষক হিসেবেই তিনি কাজ করেননি। নিজেকে সফল আত্মকর্মী, অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতা আনা এবং সমাজের দুস্থ নারীদের জন্যও কিছু করার লক্ষ্যে তার গ্রামের বাড়িতে আলিফ-নূর নামে পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে তুলেছেন তিনি। সেখানে এলাকার নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সেখানেও এ পর্যন্ত তিন শতাধিক নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেন জানান আঞ্জুয়ারা বেগম।

তিনি জানান, তার নিজের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মাসব্যাপী দর্জি বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ, সপ্তাহব্যাপী ব্লক ও বাটিক প্রশিক্ষণ এবং মাসব্যাপী পোশাক তৈরির উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। সেখানেও প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকার নারীরা সাবলম্বী হয়েছেন এবং হচ্ছেন। এ সংখ্যা শতাধিক।

তিনি জানান, ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ এবং বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর আয়োজিত জয়িতা অন্মেষণে বাংলাদেশ শীর্ষক বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে কাহালু উপজেলা পর্যায়ে সর্বশ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. গোলাম মোর্শেদ জানান, কাহালু উপজেলার আঞ্জুয়ারা বেগম এখনও যুব উন্নয়ন অধিদফতরের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। এ পর্যন্ত এ উপজেলায় ৭০০ নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। নিজের বাড়িতেও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলে এলাকার নারীদেরও প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন তিনি।

উদ্যোক্তা সাবিনা ইয়াসমিন
মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে সাবিনা ইয়াসমিন এখন সফল উদ্যোক্তা। ইচ্ছে শক্তি, মেধা আর পরিশ্রমের কারণে একজন সফল আত্মকর্মী যুব মহিলা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ঘাঘুরদুয়ার গ্রামের ব্যাংক কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের সহধর্মীনী সাবিনা ইয়াসমিন। ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করার পর ১৯৯৭ সালে বি.এ পাস করেন। সে সময়ে চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু চাকরি নামক সোনার হরিণের দেখা মেলেনি তার। বাবা-মার ইচ্ছা অনুয়ায়ী তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

স্বামীর উপার্জনের উপর নির্ভর না করে নিজে উপার্জন করা এবং সমাজের নারী সমাজের জন্য কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছে জাগে তার। ২০০১ সালে একটি উন্নত জাতের গাভী ও দুটি ছাগল কিনে খামার শুরু করেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ না থাকায় তার খামার পরিচালনা করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। সে সময় তিনি যুব উন্নয়ন অধিদফতরের বগুড়া আঞ্চলিক যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গবাদী পশু, হাঁস-মুরগি পালনসহ প্রাথমিক চিকিৎসা ও মৎস্য চাষ বিষয়ক তিন মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর যুব উন্নয়ন অধিদফতর বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা কার্যালয় থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন সাবিনা ইয়াসমিন।

যুব ঋণের টাকা দিয়ে তিনি আরও দুটি গাভী কিনে খামার সম্প্রসারিত করেন। পাশাপাশি ছাগল পালনের উপরও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তার খামারে গবাদিপশু দাঁড়ায় দশটি গাভী, সাতটি বাছুর, ৩০টি ছাগল। এছাড়াও তিনি মৎস্য চাষের প্রকল্প গ্রহণ করেন। এসব প্রকল্পে বেশ কয়েকজনের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়। এসব মিলে তার বাৎসরিক আয় হয় প্রায় চার লক্ষাধিক টাকা। শুরু থেকেই ধরে রেখেছেন গাভীর খামার, মৎস্য খামার। বাড়িতে বসিয়েছেন বায়োগ্যাস প্লান্টেশন। তার প্রচেষ্টায় ছেলে, আত্মীয়-স্বজনসহ নিজ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ১২০ জন নারীকে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই এখন আত্মকর্মী। তারা ব্লক-বাটিক, কাটিং, টেইলারিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যুব ঋণ নিয়ে নিজেরাই ওইসব কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। তার সহযোগিতায় গ্রামের হাসান আলী, কুতুব উদ্দিন, হিফজু রহমানসহ বেশকিছু নারী-পুরুষ যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ নার্সারি, কেউ কৃষিপণ্য চাষ, কেউ মৎস্য, খামার গড়ে তুলেছেন।

আত্মকর্মী সাবিনা ইয়াসমিন জানান, এলাকার বেকার যুবদের প্রশিক্ষণ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করি এবং যুব উন্নয়ন অধিফতপ্তরের সহযোগিতায় তাদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালে ভারতে ডাল ও তেল উৎপাদনের উপর আট দিনের প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। ওই প্রশিক্ষণের মধ্যে নয়াদিল্লি, হরিয়ানা ও রাজস্থান এলাকায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর মাঠ প্রদর্শনও করা হয়।

২০০৪ সালে ঢাকায় যুব উন্নয়ন অধিদফতরে জাতীয় যুব কেন্দ্র আয়োজিত সাত দিনব্যাপী সমাজ ও গোষ্ঠী উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ২০০২ সালে জাতীয় পশুসম্পদ উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচ দিনব্যাপী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ২০০৬ সালে বেকার যুবদের আত্মকর্মসংস্থানে ঔষুধী উদ্ভিদের চাষাবাদ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ, বগুড়া আঞ্চলিক যুব কেন্দ্রের উদ্যোগে জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ইমপোয়ারমেন্ট অব ওমেন, রিপ্রডাক্টিভ হেল্থ অ্যান্ড এইচআইভি/এইডস বিষয়ক সাত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

ওইসব প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজে ও সমাজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদফতর এবং পশুসম্পদ অধিদফতর আয়োজিত জেলা ও বাইরের বিভিন্ন প্রদর্শনীগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি গাভীর খামার, মৎস্য চাষ দেখাশুনার পাশাপাশি মহাস্থানে কৃষি অধিদফতর পরিচালিত সিআইজি নামে একটি সংগঠনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ওই সংগঠনের মাধ্যমে স্বল্প সুদে স্থানীয় নারীদের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।