জীবন্ত কিংবদন্তি

ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সৃষ্টিতে উজ্জ্বল নারী ভাস্কর

জীবন্ত কিংবদন্তি

অরুণ বিশ্বাস ২:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০১৯

print
জীবন্ত কিংবদন্তি

বাংলাদেশি নারী ভাস্করদের জীবন্ত কিংবদন্তির নাম শামীম শিকদার। ১৯৫৩ সালে বগুড়ার মহাস্থানের চিংগাশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছিলেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগের একজন অধ্যাপক। ভাস্কর হিসেবে তিনি সিমেন্ট, ব্রোঞ্জ, কাঠ, প্লাস্টার অব প্যারিস, কাদা, কাগজ, স্টিল ও গ্লাস ফাইবার ব্যবহার করে কাজ করেন। প্রখ্যাত কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা সিরাজ সিকদার তার আপন বড় ভাই।

শামীম শিকদার প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ৩ বছরের ভাস্কর্যের ওপর একটি কোর্স সম্পন্ন করেন। এই কোর্সটির শিক্ষক ছিলেন মিস্টার সিভিস্কি যিনি একজন বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ ভাস্কর। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে পাস করার পর লন্ডনের স্যার জন স্কুল অব কাস চলে যান তিনি। সেখান থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে ফ্রিল্যান্স ভাস্কর হিসেবে কাজ করতে থাকেন শামীম শিকদার।

১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে সহকারী অধ্যাপকের দায়িত্ব লাভ করেন। অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পান ১৯৯৩ সালে। এরপর ১৯৯৯ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ভাস্কর শামীম শিকদার চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। ৮ বছর আগে তিনি ইংল্যান্ড চলে যান।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতির জনকের স্মরণে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন ১৯৭৪ সালে। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে অবস্থিত ‘সোপার্জিত স্বাধীনতা’ শিরোনামের ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। তার সহকারী ছিলেন শিল্পী হিমাংশু রায়। ভাস্কর্যটির মূল বেদিতে আছে একাত্তরের বিভিন্ন ঘটনার চিত্র। ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ এটি স্থাপন করা হয়।

১৯৯৪ সালে যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অবস্থিত স্বামী বিবেকানন্দের ভাস্কর্য নির্মাণ করেন তিনি। ২০০০ সালে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য উদ্যানে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ইস্কাটনে অবস্থিত জাতীয় ভাস্কর্য গ্যালারিতে নির্মাণ করেন তিনি যেখানে আছে বিশ্বের অন্যান্য ব্যক্তিদের ভাস্কর্য, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু ও ভয়ঙ্কর রাজাকারদের ভাস্কর্য।

জাতীয় ভাস্কর্য গ্যালারির প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি খুলে দেওয়া হয়েছিল দর্শনার্থীদের জন্য। শুরুতে সকাল-সন্ধ্যা সবার জন্য খোলা থাকলে পরে নানা কারণে এটা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘স্ট্রাগলিং ফোর্স’ নামে একটি ভাস্কর্য ১৯৮২ সালে তার হাতেই নির্মিত হয়েছে। ‘একটি মধুর স্বপ্ন’ শিরোনামের ভাস্কর্যটি চারুকলা ইনস্টিটিউটে রাখা আছে যা ১৯৮৩ সালে নির্মিত। আশা ও উদ্দীপনার একটি পাখি নামের ভাস্কর্যটি ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত মাদার তেরেসা চ্যারিটি হাসপাতালে স্থাপিত হয়েছে ১৯৯৪ সালে।

তার হাত দিয়েই বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ইনার ট্রুথ অব স্কাল্পচার : অ্যা বুক অন স্কাল্পচার’, স্কাল্পচার কামিং ফ্রম হেভেন (২০০০), কনটেম্পোরারি আর্ট সিরিজ অব বাংলাদেশ।

তিনি ভাস্কর্যের পাশাপাশি ছবি আঁকা, জুডো, কারাতে, শ্যুটিং, বাগান করা ও গাড়ি চালাতে পারেন। শামীম শিকদার কবিতা, সংগীত ও নাটকের ব্যাপারেও বিশেষ আগ্রহ বোধ করেন। তিনি ইংল্যান্ড, ইতালি এবং চীন সফর করেছেন বিভিন্ন সময়।

তিনি ১৯৬৯ সাল, ১৯৭০ সাল, ১৯৭৩ সাল এবং ১৯৭৪ সালে লাভ করেন ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস পুরস্কার।

১৯৭৩ সালে অর্জন করেন সিলভার জুবলি অ্যাডওয়ার্ড অব ফাইন আর্ট। ভাস্কর্যের ওপর প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার জিতে নেন ১৯৭৪ সালে। ২০০০ সালে লাভ করেন একুশে পদক। সবকিছু মিলিয়ে নারী ভাস্কর হিসেবে তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি।