দুর্নীতি ঢাকতে বেরোবিতে উপেক্ষিত তথ্য অধিকার

ঢাকা, শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১ | ২ মাঘ ১৪২৭

দুর্নীতি ঢাকতে বেরোবিতে উপেক্ষিত তথ্য অধিকার

সাইফুল ইসলাম ১২:৩৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০২০

print
দুর্নীতি ঢাকতে বেরোবিতে উপেক্ষিত তথ্য অধিকার

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) দুর্নীতির খবর ঢাকতে দেওয়া হচ্ছে না তথ্য। তথ্য অধিকার আইনকেও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতায়। উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহর গোপন নির্দেশেই নাকি চলছে এসব। অধিকাংশ দফতরেই চলতি দায়িত্ব দিয়ে বসানো হয়েছে তার অনুসারীদের। কথার ব্যত্যয় ঘটলেই করা হয় সাময়িক বহিষ্কার। উচ্চ আদালতের রায়ে সেই বহিষ্কারাদেশ বাতিল হলেও থোরাই কেয়ার করছেন এ উপাচার্য, বলেও রয়েছে অভিযোগ। এত সব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তার সঙ্গে করা যাচ্ছে না যোগাযোগ। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি-অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ হলে দাফতরিক তথ্য সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়ার মিথ্যা অভিযোগে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে হয়রানিও করা হয়েছে। তবে ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না তারা।

২০১৭ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। নিয়োগ প্রাপ্তির প্রথম থেকেই নানা বাহানায় গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্ন এড়িয়ে চলছেন তিনি। তার যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই দুর্নীতির খবর প্রকাশ হলে পুরোপুরি বন্ধ করে দেন কথা বলা। মুঠোফোনে সংবাদকর্মী শুনলেই কেটে দেন কল। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য দফতরেও বন্ধ হয়ে যায় তথ্য প্রদান। তথ্য চাইলে ওপর মহলের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে জানান তারা।

রংপুরের বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল নিয়োগ, ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি, অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা ও প্রশাসনিক-আর্থিক কর্মকান্ডে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আসে। অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট দফতর কিংবা শাখা প্রধানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তারা সরাসরি উপাচার্য বা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে অধিকাংশ দিনই তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। এই দুই কর্তাব্যক্তির মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তারা তা রিসিভ করেন না। ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেন না।

জানা যায়, নিয়োগ প্রাপ্তির পর ৯০ শতাংশ দিনই ক্যাম্পাসে আসেননি বেরোবি উপাচার্য। অভিযোগ রয়েছে রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তাফা কামালও অফিসে আসেন না। তারা ঢাকায় বসে অনেকটা অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এমতাবস্থায় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত অধিকাংশ সংবাদে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের কোনো বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয় না। এমনকি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তথ্য না পেয়ে গত বছর সিনিয়র একজন সাংবাদিক তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু তাতেও গড়িমসি করে প্রশাসন।

জানা যায়, তথ্য অধিকার আইনে সুজন- সুশাসনের জন্য নাগরিক এর রংপুর মহানগরের সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। প্রশাসন নির্দিষ্ট সময়ে তথ্য না দিলে তিনি তথ্য কমিশনে আপিল করেন। তারপরও তথ্য না পেয়ে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করেন।

ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, এরপর একদিনের সময় নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরবর্তীতে শুনানি হলে, সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রার্থীর চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নির্দেশ প্রদান করে চিঠি দেয় তথ্য কমিশন। পরে প্রশাসন ফখরুল আনাম বেনজুকে আংশিক তথ্য প্রদান করেন তারা। যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তাতে সন্তুষ্ট নয় উল্লেখ করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আবারও তথ্য কমিশনে আবেদন করেন তিনি। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি মাসের ৩০ নভেম্বর আবার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে কমিশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রফেসর নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ উপাচার্য হিসেবে যোগদানের কিছুদিন পরই বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ থেকে সিনিয়র শিক্ষকদের সরিয়ে দিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র শিক্ষকদের অধিকাংশ প্রশাসনিক পদে চলতি দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ দেন। চলতি দায়িত্ব পালন করা এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চলতি দায়িত্ব মানে ‘জাস্ট আই ওয়াশ’। চলতি দায়িত্ব দিয়ে উপাচার্য মূলত দফতরের সার্বিক ক্ষমতা নিজের হাতেই রাখেন। যারা চলতি দায়িত্বে থাকেন তাদের সাইনিং পাওয়ার ছাড়া কার্যত আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। তারা নিজেরা দফতরের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। এমনকি দফতর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা সংবাদমাধ্যমে কথা বলার স্বাধীনতাও রাখেন না।

সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও সংবাদমাধ্যমে উপাচার্যের কোনো বক্তব্য পায়নি সংবাদ কর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তথ্য গোপন রেখে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করছে বেরোবি প্রশাসন।

‘সকল দুর্নীতি ও অনিয়ম লোকচক্ষুর আড়াল করতেই মূলত প্রশাসন তথ্য গোপন রাখছে। প্রশাসন সৎ থাকলে অবশ্যই তথ্য প্রদান করতেন’, বলে মন্তব্য করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদিক সমিতির সভাপতি মোবাশ্বের আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশ ও বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে সাংবাদিকদের ভূমিকা অনেক। কিন্তু বর্তমান বেরোবি প্রশাসন সাংবাদিকদের কোনোরকম তথ্য দিতে চায় না। তথ্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ মূলত প্রশাসনের হীনমানসিকতার পরিচয়। প্রশাসনের উচিত সাংবাদিকদের তথ্য প্রদান করা যাতে করে সাংবাদিকরা সবার সামনে সবকিছু সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণিত বিভাগের শিক্ষক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, মূলত বর্তমান উপাচার্য তার দুর্নীতি ঢাকতেই তথ্য গোপন করছে। সংবাদকর্মীরা হচ্ছে সমাজের আয়না, তারা তথ্য পাওয়ার অধিকার রাখে।

সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য উপাচার্য, উপ উপাচার্য, ট্রেজারার ও রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গিয়ে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। পরে তাদের মুঠোফোনে ফোন দেওয়া হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদেবার্তা পাঠালে, ফিরতি কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।