ডেঙ্গুতে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রাম

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

ডেঙ্গুতে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৪১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

print
ডেঙ্গুতে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রাম

তবে স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ ভাগের মতো। শুরু শহরাঞ্চলে নয় গ্রামেও স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। শহরে এডিস ইজিপটাই ডেঙ্গুর জন্য দায়ী হলেও গ্রামে এ রোগ ছড়াচ্ছে এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। গত তিন দিনে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যে আট জন মারা গেছেন তাদের সাতজনই ঢাকার বাইরের। এর মধ্যে, যশোরে দুজন, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে একজন করে মারা গেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, গ্রামে ডেঙ্গু মোকাবিলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৫০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ২৩৭ জন ভর্তি হলেও বাইরে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৫১৩।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিন হাজার ২৯ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৩৫৫ জন হলেও ঢাকার বাইরে এ সংখ্যা ছিল এক হাজার ৬৭৪ জন।

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, গ্রামে অ্যালবোপিকটাস নামে যে প্রজাতির এডিস মশা রোগ ছড়াচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি আলাদা। কেননা, এ প্রজাতির মশা ঘরে কামড়ায় না, ঘরের বাইরে কামড়ায়। আর এ প্রজাতির মশা বংশবৃদ্ধি করে প্রাকৃতিক বিভিন্ন উৎসে। তাই এ প্রজাতির মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গু চিকিৎসায় নগরে পর্যাপ্ত সুবিধা থাকলেও ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় তা অপর্যাপ্ত। আবার এডিস মশা নির্মূলে ও ডেঙ্গু নিয়ে নগরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলেও গ্রামে এখনো তা হয়নি। ফলে জ্বর হলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন না অনেকে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু না হওয়ায় অনেকের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু চিকিৎসার বড় চ্যালেঞ্জ গ্রামে।

এ বিষয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও বিএসএমএমইউর সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ গ্রামের মানুষের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর জন্য চলতি সেপ্টেম্বর মাসটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, এ কারণে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও কিছুটা বাড়ছে-কমছে। এখন শহরের চেয়ে গ্রামে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। এর কারণে হচ্ছে গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের মতো এত বেশি সচেতন নন।

তিনি বলেন, গত মাসে কোরবানির ঈদে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেক মানুষ শহর থেকে গ্রামে যান। সেখানে এডিস মশা তাদের কামড় দিয়ে অ্যাফেক্টেড হয়েছে। অ্যাফেক্টেড মশাগুলো এখন সুস্থ মানুষকে কামড়ানোয় তারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এই ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, গ্রামে আক্রান্ত মানুষ সময়মতো চিকিৎসা নিতে অবহেলা করছেন। ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষায় তাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে তাদের সচেতন করতে হবে, প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। আর এ কাজটি করতে হবে সরকারকে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও তা খুব বেশি নয়। সাধারণ মানুষ সচেতন হলে আর ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য আরও একটু নজর দিলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

আরও তিনজনের মৃত্যু
কমা-বাড়ার মধ্যেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন। গত বুধবার রাত ৮টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে একজন, বরিশালে একজন এবং সাভারে একজন মারা গেছেন। প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন-
চট্টগ্রামে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের স্ত্রীর মৃত্যু : গতকাল বৃহস্পতিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বান্দরবানের আওয়ামী লীগ নেত্রী দমে চিং মারমার (২৪) মৃত্যু হয়েছে। বান্দরবান সিভিল সার্জন ড. অং সুই জানান, গত সপ্তাহে দমে চিং মারমা জ্বরে আক্রান্ত হন। স্থানীয়ভাবে পরীক্ষার পর তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে বান্দরবান হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল সিএসসিআরে ভর্তি করা হয়। সেখানে গতকাল ভোর সাড়ে ৩টার দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তিনি বান্দরবানের রুমা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লাচিং মারমার স্ত্রী।

বরিশালে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু : এছাড়াও বৃহস্পতিবার সকালে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুরাইয়া (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত সুরাইয়া বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা গ্রামের বাসিন্দা বাদল মুন্সীর মেয়ে। সে হাড়িটানা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বরিশাল মেডিকেলের পরিচালক বাকির হোসেন জানান, গত বুধবার সকালে ডেঙ্গু আক্রান্ত সুরাইয়াকে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ঢাকায় যুবকের মৃত্যু : সাভারে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবির হোসেন (২৫) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত আবির হোসেন সাভারের বনগাঁও এলাকার ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনের ছেলে।

নিহতের বাবা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, হঠাৎ করেই দুই সপ্তাহ আগে আবির ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাকে রাজধানীর কল্যাণপুর এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ধানমন্ডি জেনারেল ও কিডনি হাসপাতালে ভর্তি রাখার পর সর্বশেষ গত মঙ্গলবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।