ভোটময় বাংলাদেশ

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ ১৪২৫

ভোটময় বাংলাদেশ

কুন্তল দে ১১:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

print
ভোটময় বাংলাদেশ

ক্যালেন্ডারে এখন মধ্য নভেম্বর। হালকা কুয়াশা, মিষ্টি রোদ আর মৃদু উত্তুরে বাতাসে প্রকৃতি শোনাচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। প্রকৃতির এই রূপান্তরের দিনগুলোতে বাংলাদেশের জনজীবনেও লেগেছে নতুন উদ্দীপনা। গ্রাম, নগর, বন্দর, অফিস, বাস, ট্রেন, লঞ্চ, চায়ের দোকান সর্বত্রই এখন আলোচনায় একটাই বিষয় ভোট। কে কোন আসন থেকে কোন দলের মনোনয়ন ফরম কিনলেন তা নিয়ে গল্প-কাহিনীর শেষ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ভরে উঠেছে নির্বাচনবিষয়ক মন্তব্য-ছবিতে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন মিডিয়া সবখানেই মনোযোগের কেন্দ্রে নির্বাচন। ২০০৮ সালে নবম একাদশ সংসদ নির্বাচনের ১০ বছর পর প্রকৃত অর্থেই ভোটময় দেশ।

উৎসবপ্রিয় বাঙালির অফুরান উৎসবের উপলক্ষ নির্বাচন। গত ২-৩ দিনে নির্বাচন ঘিরে পুরো উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। অথচ দিন ১৫ আগেও কেউ ভাবেনি এমনটা হতে পারে। কেননা, আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারি শেষ হচ্ছে দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ। সংবিধান অনুযায়ী, ওই তারিখের আগেই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করতে হবে পরবর্তী সংসদের আইনপ্রণেতাদের। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছিল ততই যেন সংশয়ের মেঘ জমছিল রাজনীতির আকাশে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা নিজের নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছিলেন না কেউই। কিন্তু নভেম্বর শুরু হতে না হতেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার গুমোট ভাব কেটে যেতে শুরু করল। দেখা দিতে শুরু করল আলোক রশ্মি। হঠাৎ করেই সংলাপ ভাঙল রাজনীতির অচলায়তন। এরপরও যতটুকু অচলাবস্থা ছিল তফসিল ঘোষণার পর তারও অনেকটাই কাটল।
ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, ২০ দলীয় জোট, যুক্তফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী দলগুলোর জোট-একে একে সবাই নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিল। ১০ বছর পর ফের তৈরি হলো সবার অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের। সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোর দাবি বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন পুনঃতফসিল ঘোষণা করায় এ পথ আরও একধাপ এগুলো। প্রথম দফা তফসিল অনুযায়ী, ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৩ ডিসেম্বর। পুনঃতফসিলে ৭ দিন পিছিয়ে ভোটের তারিখ করা হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর। ২৩ ডিসেম্বর ভোটের তারিখ ঠিক করায় জাতিসংঘসহ বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা ও দেশগুলোর পর্যবেক্ষক পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কারণ ২৫ ডিসেম্বর বড় দিন। কিন্তু ভোট পিছিয়ে দেওয়ায় সে অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিদেশি পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে বলে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা নিশ্চিত করেছেন।
নভেম্বরের ১-৭ তারিখ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধারাবাহিক ওই সংলাপেই বদলে যেতে থাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এর আগে মধ্য অক্টোবরে প্রবীণ আইনজীবী কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে গড়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ সাত দফা দাবি জানায় নতুন এ জোটটি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীতে সমাবেশ করে জোটটি। এসব সমাবেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক-উদ্দীপনা তৈরি হয়। অক্টোবরের শেষদিকে কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে সংলাপের জন্য চিঠি দেন। ২৪ ঘণ্টা পেরুতে না পেরুতেই সংলাপে বসার সাড়া আসে। ১ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর দুই দফা আলোচনায় বসে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা। সাত দফার প্রধান দাবিগুলো মানা না হলেও নির্বাচনে সবার সমান সুযোগ দেওয়া, সভা-সমাবেশে বাধা না দেওয়া, রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার না করার মতো কয়েকটি দাবি মেনে নেওয়া হয়। সবার অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন আওয়ামী লীগপ্রধান। যদিও দ্বিতীয় দফা সংলাপেও ফলাফল আসেনি বলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। আন্দোলনের জন্য রোড মার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্য মাঠের আন্দোলনের এ হার্ডলাইন কর্মসূচি থেকে সরে আসেন তারা।
৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা হয়। তফসিলকে স্বাগত জানায় আওয়ামী লীগ, তাদের শরিক ও মিত্র দলগুলো। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট তফসিলের সমালোচনা করলেও, ভাষা ছিল অনেকটাই নমনীয়। তফসিল ঘোষণার পরদিন (৯ নভেম্বর) সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করে। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার জন্য দুটি আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দলটির আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী যাত্রা। রাজধানীর ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় উৎসবক্ষেত্রে। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায়, ঢাকঢোল-বাদ্য ও শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী আসেন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে। চার দিনে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মনোনয়নপ্রত্যাশী ফরম সংগ্রহ করেন। ফরম বিক্রি বাবদ দলের ফান্ডে জমা হয় ১৩ কোটির বেশি টাকা। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহে বড় চমক ছিল জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। এ ছাড়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আমলা, ব্যবসায়ী, তারকাসহ হেভিওয়েট ব্যক্তিরা মনোনয়ন ফরম নেন। তাদের নিয়ে নেতাকর্মী ও জনগণের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়।
গত রোববার বিএনপিপ্রধান দুই জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে আসার ঘোষণা দেয়। গত সোমবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করে দলটি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য তিনটি আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ কার্যক্রম। হঠাৎ ঘোষণা এলেও প্রথম দিনেই নয়াপল্টন এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিক্রি হয় ১৩০০-র বেশি মনোনয়ন ফরম। দ্বিতীয় দিন গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের ভিড়ে জনস্রোতে পরিণত হয় বিএনপি কার্যালয়ের আশপাশের রাস্তা। মনোনয়ন ফরম বিক্রি কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর প্রাণ ফিরে পায় বিএনপি কার্যালয়। আজ পর্যন্ত চলবে দলটির এ কার্যক্রম। ধারণা করা হচ্ছে, চার হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে মনোনয়ন ফরম বিক্রির সংখ্যা।
২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি জোট। সরকার পতন আন্দোলনের ডাক দেয় তারা। হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বোমা, ককটেল, অগ্নিসংযোগে প্রাণ হারান একশর বেশি মানুষ। বিএনপি জোট নির্বাচনে না আসায় ওই নির্বাচন উৎসবের রং হারায়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচত হন ১৫৩ জন সংসদ সদস্য। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য ওই আন্দোলন শুরু করেছিল বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে না বলে জানিয়ে আসছিল। তবে শেষ মুহূর্তে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলে অনিশ্চয়তা কাটে রাজনীতির।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে উৎসবের রং লেগেছে তা সফল করার দায়িত্ব যেমন নির্বাচন কমিশনের ঠিক তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর। নির্বাচনে যাতে সবগুলো রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পায় সেদিকে নজর রাখতে হবে ইসি ও সরকারকে। এরই মধ্যে বিরোধী দলগুলোর দাবির মুখে তফসিল পেছানোর যে ঘোষণা ইসি দিয়েছে তা ইতিবাচক। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থানে অনড় না থেকে দরকষাকষির পরিবেশ খোলা রাখতে হবে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা ও গ্রেপ্তার না করতে পুলিশকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেটাও কার্যকর করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, সরকার, প্রশাসনকে সব দলগুলোর জন্য একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গড়ে দিতে হবে। যাতে নেতাকর্মী ও জনগণের মাঝে আস্থা ও উৎসবের পরিবেশ বজায় থাকে। কেননা আগামী দিনের গণতন্ত্রের সফলতা নির্ভর করছে সফল একটি নির্বাচনের ওপর।