নোবিপ্রবি শিক্ষার্থী পার্থের প্রথম হওয়ার গল্প

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

সাফল্য

নোবিপ্রবি শিক্ষার্থী পার্থের প্রথম হওয়ার গল্প

মাইনুদ্দিন পাঠান ১:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২০

print
নোবিপ্রবি শিক্ষার্থী পার্থের প্রথম হওয়ার গল্প

পার্থ চশমা ছাড়া চোখে দেখতে পায়না আবার চশমা দিয়েও তেমন স্পষ্ট দেখতে পারেনা। তাই এ পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য কখনোই তার দেখা হয়ে উঠেনি। বইয়ের পাতায় বর্ণগুলো সত্যিকারে দেখতে কেমন তাও সে জানেনা। কিন্তু পড়াশেনায় তার অদম্য ইচ্ছা। তাই অদম্য সেই ইচ্ছাশক্তির উপর ভর করেই সফলতার সাথে সকল ক্লাস অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লাটফর্মে জায়গা করে নিয়েছেন।

বলছি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার অদম্য শিক্ষার্থী পার্থ বণিকের কথা। ২০১৩ সালে চৌদ্দগ্রাম এইচ জে হাই স্কুল থেকে জিপিএ-৫ এবং ২০১৫ সালে নটরডেম কলেজ, ঢাকা থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিসারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি ৩.৮৮ সিজিপিএ নিয়ে বিভাগে প্রথম স্থানে রয়েছেন। 

আটমাস বয়সে চোখে অনেক বড় সমস্যায় পড়েন তিনি। বাবা পেশায় একজন স্বর্ণকারের দোকানদার। চোখের চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা প্রয়োজন ছিল যেটা তার বাবার পক্ষে বহন করার সম্ভব হয়নি। ধীরে ধীরে চোখের সমস্যা বেড়েই চলছিল। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। জীবনের চাকা থামতে দেননি। বর্তমানে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পড়াশোনা সমাপ্তির পথে। শুধুমাত্র চোখের সমস্যার প্রতিবন্ধকতাকেই নয়। দারিদ্রের কঠিন চড়াই উৎরাইও পার্থকে অপ্রতিরোধ্য পথ চলাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

এক ভাই, দুই বোনের সংসারে পার্থ সবার ছোট। বাবার পর পরিবার ভর করে আছে পার্থের উপর। এলাকার স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করার পর পার্থের ইচ্ছা ছিলো ঢাকা নটরডেম কলেজে পড়ার কিন্তু পার্থের বাবা চোখের সমস্যা নিয়ে তাকে ঢাকায় দিতে ভয় পেয়ে যাচ্ছিল। এদিকে এলাকার মানুষ তাকে নিয়ে হাসি তামাশা করে বলে বেড়াচ্ছে এই অন্ধ ছেলে নাকি নটরডেমে পরীক্ষা দিবে! চোখে দেখেনা আবার ঢাকায় গিয়ে পড়বে। গ্রামের মানুষের এসব কথায় পার্থ ও তার বাবা খুবই কষ্ট পেয়ে কখনো কান্নায় চোখের পানি ফেলতেন। সকল কিছু উপেক্ষা করে পার্থ চলে গেল নটরডেমে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে কলেজ জীবনের যাত্রা শুরু করে। নটরডেম কলেজের একটা নিয়ম ছিলো সবাই রোল নম্বর সিরিয়াল অনুযায়ী ক্লাসে বসবে। সেই অনুযায়ী পার্থের আসন থেকে হোয়াইট বোর্ড ছিলো প্রায় ১৫ মিটার দূরে কিন্তু পার্থ চশমা ছাড়া দেখেইনা আবার চশমা দিয়েও ৩ মিটারের বেশী দেখতেননা। তাই আসন থেকে বোর্ডের লেখা বুঝা যেতো না। হঠাৎ একদিন প্রাইভেট পড়তে গিয়ে গণিত স্যারকে এসকল সমস্যার কথা বললে স্যার সামনে বসার ব্যবস্থা করে দেন।

তারপর চোখের সমস্যা নিয়ে যতটুকু সম্ভব হয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে নিজেকে পরিচালিত করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে পার্থ বলেন, এই সময়গুলো আমাকে প্রচ- পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমার অনেক বড় একটা অপূর্ণতা হলো কখনো নিজে ভালোভাবে ল্যাবে কাজ করতে পারি নাই। ল্যাবের ক্ষুদ্র বস্তুগুলো কখনো দেখার সুযোগ হয়না। নটরডেমে থাকতেও যখন ল্যাব ক্লাস হতো বন্ধুদের ভীড়ে দাড়িয়ে থাকতাম কিন্তু কখনো ভালোভাবে বুঝার সুযোগ হয়নি এমনকি আমাকে করতে দিলেও করতে পারতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিসারিজ ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হওয়ার পর ল্যাবে একটি মাছ কিভাবে কাটতে হয়, মাছের কোথায় কি থাকে সবই জানতাম কিন্তু চোখের জন্য কখনো নিজে কাজ করতে পারিনাই। আমার বন্ধুরা অনেক আন্তরিকতার সাথে সবসময় আমাকে সহযোগিতা করত। বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে ল্যাবের কাজগুলো সম্পন্ন করতাম।

বিভাগীয় শিক্ষকদের নিয়ে পার্থ বলেন, শিক্ষকরা সবসময় অন্যান্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় আমার প্রতি একটু বেশী আন্তরিক ছিলেন। শিটের শব্দগুলো ছোট থাকলে স্পষ্ট বুঝা যেত না। তাই মোবাইলে ছবি তুলে জুম করে পড়া লাগত। সেজন্য শিক্ষকরা সবসময় দুই কপি শিট বের করতেন যেখানে এককপি থাকত সকলের জন্য আর এককপি বড় শব্দে প্রিন্ট করা থাকত শুধু আমার জন্য। কিভাবে পড়ালেখা করেন জানতে চাইলে পার্থ বলেন, আমি দুইটা চশমা ব্যবহার করি। একটি পড়াশোনার জন্য আর অন্যটি চলাফেরা জন্য। ছোট শব্দওয়ালা বই থেকে সরাসরি পড়তে পারিনা এক্ষেত্রে আমি প্রথমে মেবাইলে ছবি তোলে জুম দিয়ে বড় করে পড়ি।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমার বন্ধুরা পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। আমি সবসময় আমার বন্ধু ও শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ। আর আমার বাবার কথা না বললেই নয়।

আমি ছোটবেলা থেকে যতকিছু করেছি আমার বাবার জন্য করেছি এবং আমি বাবার জন্যই সামনে আরো ভালো কিছু করতে চাই। বাবা সবসময় আমার সহযোগিতার অপেক্ষায় থাকতেন। আর্থিক সমস্যা থাকার পরও বাবা কখনো কোনো কিছুতে না করেন নাই। তবে আমার একটা ইচ্ছা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা আমাকে যদি একটাবারের জন্য স্বাভাবিক চোখ দিত তাহলে পৃথিবীটা দেখে নিজের বর্তমান অবস্থার সাথে তুলনা করতাম। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও করতে পারেননি এমন প্রশ্নে পার্থ বলেন, ছোটবেলায় যখন ক্রিকেট খেলতে যেতাম বল দেখে খেলতে গেলে বল আর ব্যাটে লাগাতে পারতাম-না।

আবার ফুটবল খেলার সময় শুধু গোলকিপার দাঁড়াতাম কখনো মাঠে খেলতে পারতাম-না। আবার চোখের সমস্যার কারণে অনেক খেলার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও খেলতে পারিনা। ব্যাডমিন্টন খেলার অনেক ইচ্ছা থাকার পরও কখনো খেলতে পারিনা। তবে আমি কখনো নিজেকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মনে করিনা।