৬৪ কিলোমিটার রেল

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২ | ১৩ মাঘ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

৬৪ কিলোমিটার রেল

সঞ্জিব দাস, ফরিদপুর
🕐 ১০:১৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩১, ২০২০

৬৪ কিলোমিটার রেল

ভোর ঠিক ৬টা। রাজবাড়ী রেলস্টেশন থেকে হুঁইসেল দিয়ে রাজবাড়ী এক্সপ্রেস ট্রেন যাত্রা শুরু করল ফরিদপুরের ভাঙ্গার উদ্দেশে। ট্রেনটি ফরিদপুর স্টেশন হয়ে ভাঙ্গা রেলস্টেশনে গিয়ে পৌঁছায় সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে। এভাবে গত কদিন ধরে ট্রেনের হুঁইসেল আর ঝিকির ঝিকির শব্দে ঘুম ভাঙছে ভাঙ্গাবাসীর। ট্রেনের সঙ্গে এ এলাকার মানুষের পরিচয় পর্বটা বলতে গেলে একেবারেই নতুন। এতদিন এই এলাকার মানুষের কাছে যা ছিল স্বপ্ন, তা আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। নিজেদের এলাকায় ছুটে চলা ট্রেন দেখেন তারা অবাক চোখে।

মূলত রাজবাড়ী-ফরিদপুর-ভাঙ্গা লাইনে ৬৪ কিলোমিটার রেলপথে প্রতিদিন চারবার আসা-যাওয়া করছে রাজবাড়ী এক্সপ্রেস। গত ২৬ জানুযারি সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজবাড়ী-ফরিদপুর-ভাঙ্গা লাইনে এই রেলযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত নতুন লাইনে ট্রেন চালু হওয়ায় এলাকাবাসী অত্যন্ত আনন্দিত। ফরিদপুর-ভাঙ্গা ট্রেন চালু হওয়ায় অনেকখানি কমেছে ঝক্কি-ঝামেলা। যাত্রীরা স্বল্প খরচে গন্তব্যে যেতে পারছেন। রাজবাড়ী থেকে ভাঙ্গা ট্রেন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ২৫ টাকা। ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গা ১৫ টাকা, ফরিদপুর থেকে রাজবাড়ী ১৫ টাকা।

রেল কর্মকর্তারা জানান, রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুর ট্রেন চলাচল ১৯৯৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এলাকাবাসীর একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় সড়কপথ। ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটার রেললাইনে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ফরিদপুর এক্সপ্রেস নামের ট্রেন প্রতিদিন সকাল ও বিকাল দুই বার ফরিদপুর-রাজবাড়ী আসা-যাওয়া করে। পরে সরকার ফরিদপুর স্টেশন থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার রেলপথ চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, ফরিদপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটির নতুন নাম রাখা হয়েছে রাজবাড়ী এক্সপ্রেস। এই ট্রেনে এখন দিনে চারবার রাজবাড়ী-ফরিদপুর-ভাঙ্গা লাইনে চলাচল করছে। ট্রেনটি প্রতিদিন সকাল ৬টায় রাজবাড়ী স্টেশন থেকে ছেড়ে ভাঙ্গায় পৌঁছায় সকাল ৭টা ৫০মিনিটে। ভাঙ্গা স্টেশনে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে ট্রেনটি সকাল সোয়া ৮টায় যাত্রা শুরু করে রাজবাড়ীর উদ্দেশে। আবার ট্রেনটি বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে রাজবাড়ী থেকে ছেড়ে ভাঙ্গায় পৌঁছায় সন্ধ্যা ৭টা ০৫ মিনিটে। পরে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ফের যাত্রা করে রাজবাড়ীর উদ্দেশে।

ট্রেনের ভেতর কথা হয়, রাজবাড়ী থেকে ভাঙ্গাগামী যাত্রী উজ্জ্বল শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, ট্রেন যাত্রা সব সময় নিরাপদ ও ঝামেলা মুক্ত। আমরা এখন স্বল্প খরচে ভাঙ্গা-রাজবাড়ী যাওয়া-আসা করতে পারছি। রেলে এত কম ভাড়া দিয়ে যেতে পারছি। যদি বাসে বা অন্য কোনোভাবে যেতাম তবে ভাড়া লাগতো এক’শ টাকার উপরে। তবে এই লাইনে একটি আন্তঃনগর ট্রেন যদি রাজশাহী পর্যন্ত দেওয়া হয় তাহলে আমরা আরও উপকৃত হব।

ট্রেনের আরেক যাত্রী জাকির হোসেন বলেন, আমাদের অনেক দিনের আশা পূরণ হয়েছে রাজবাড়ী থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চালু হওয়াতে। ট্রেনের প্রসারে অর্থনৈতিকভাবে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা হচ্ছে এই অঞ্চলের ট্রেনের প্রবেশদ্বার। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা ও বরিশাল এবং মংলা সমুদ্র বন্দরও যুক্ত হবে রেলসেবায়-এমনটাই শুনেছি। এটা হবে এই সরকারের বড় সাফল্য। আমাদের জন্য এ এক কল্পনাতীত ব্যাপার।

রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন গত ২৫ জানুয়ারি রেল বিভাগের জি এম মিহির কান্তি, চিফ কমান্ডার আবদুল খাত্তাব ভূঁইয়া, ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার, পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান এবং রেলবিভাগ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ভাঙ্গা রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন। এ সময় রেলমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছাতেই ফরিদপুর এক্সপ্রেসের নাম বদলে রাখা হয়েছে রাজবাড়ী এক্সপ্রেস। প্রধানমন্ত্রী রেল সেবার যে আধুনিকায়ন শুরু করেছেন সেটা অব্যাহত থাকবে।

ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ট্রেন একটি নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা। প্রতিটি উন্নত দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রথম সারিতে রয়েছে ট্রেন। এভাবে যদি ট্রেন যোগাযোগ আমরা দেশে বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে আমাদের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে। তবে সবার উচিত ট্রেনের ভাড়াটা দেওয়া। একই সঙ্গে ট্রেন সম্পদকে নিজেদের মনে করে তা রক্ষা করা।

এদিকে কর্মকর্তারা জানান, ভাঙা হবে রেল জংশন। আর রেলওয়ের দুটি অঞ্চলকে চার অঞ্চলে ভাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। চট্টগ্রাম-সিলেট নিয়ে পূর্বাঞ্চল, ঢাকা-ময়মনসিংহ নিয়ে নতুনভাবে গঠিত হবে উত্তরাঞ্চল, পাকশী ও লালমনিরহাট নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল এবং রাজবাড়ী ও খুলনা নিয়ে গঠিত হবে দক্ষিণাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলের সদর দফতর থাকবে চট্টগ্রামে, উত্তরাঞ্চলের ময়মনসিংহে, পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহীতে এবং দক্ষিণাঞ্চলের সদর দফতর হবে ফরিদপুরে।

 
Electronic Paper