ঢাকার কথা ঢাকা রাখা যায় না

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৪ আশ্বিন ১৪২৬

ঢাকার কথা ঢাকা রাখা যায় না

আলম তালুকদার ১০:২৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

print
ঢাকার কথা ঢাকা রাখা যায় না

আমরা ছোটবেলায় একটু বয়স্কজনের সামনে গেলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করতেন, ‘এই ক দেহি, ঢাকার ঘাস সাদা কেন? আর টাঙ্গাইলে মানুষ মরে কেন? একটু চিন্তা কইরা জবাব দিবি’। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো জবাব দিতে পারত, অনেকেই পারত না। আমিও পারতাম না। অনেক পরে নিজে নিজেই জবাব পেয়ে শব্দের বহুমুখী অর্থ বিচরণে মুগ্ধ হয়েছি।

আবার এক যুবক ঢাকাবাসী এক যুবতীকে এক কথা বলে মাইর খাওয়ার উপক্রম! সে শুধু আপন মনে বলেছিল, ‘আপনাদের ওই ঢাকা জায়গায়টাই দেখা হলো না!’

ঢাকা শহরে আগে ছিল ৫২ বাজার ৫৩ গলি। যায় না পাওয়া ঢাকার তলি। এখন যে কত বাজার আর কত গলি গলাগলি করে আছে তা সহজে গোনাগুনতি করা সম্ভব নয়। ৪০০ বছরের বেশি পুরাতন ঢাকা শহর। ক্রমবর্ধমান এ শহরে কয় কোটি লোক বসবাস করে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে ঢাকার আদিবাসীদের বলা হয় ‘ঢাকাইয়া কুট্টি’। তারা এখনও বহাল আছেন পুরান ঢাকায়। তারা রসিকজনা। তাদের রসভা-ার খুললে, আমার এ লেখায় অন্য কিছু লেখা সম্ভব নয়। তাই আমি কেলা? আবে হালায় আছল বাত বাতাও।

এ ঢাকাকে একসময় ‘তিলোত্তমা’ ঢাকা নামে অবহিত করা হতো! আর এখন? সম্প্রতি এক জরিপে ঢাকা খারাপ মানের শহরের তালিকায় অল্পের জন্য এক নম্বর হতে পারেনি!

১৪০টি শহরের মধ্যে ১৩৮তম এর অবস্থান! এইডা কেমুনে মানা যায়? হলে হয় হবে একেবারে লাস্ট না হলে ফার্স্ট! দুই নম্বরের জন্য আমাদের ঢাকা কেন লাস্ট হলো না? এখানেও মনে হয় লবিং হয়েছে! ‘আমাদের ঢাকার মানসম্মান ঐতিহ্যকে ম্লান করিবার এক গভীর ষড়যন্ত্র চলিতেছে বলিয়া মালুম হইতেছে’! ঢাকা শব্দের মহিমা হলো, এখানের কিছুই ঢাকা থাকে না! সব প্রকাশ্য। কিছুই ফাঁকাও থাকে না! সব দখলে! এখানে ওড়ে খালি টাকা! যারা পারে তারা ধরে। অনেকেই রাস্তায় মরে! সব সম্ভবের শহর এ ঢাকা! অনেকেই এমনটা ভাবেন। এই রে একটা জোকস কিলবিল করতাছে যে! আচ্ছা আগে ছাড়ি দেই।

এক বিদেশি সাংবাদিক কয়েকদিন ঢাকা শহরের বেশকিছু অলিগলি দর্শন করে একদিন প্রেস ক্লাবের গেটে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্য উপভোগ, আর নানা কিসিমের শব্দ দ্বারা জব্দ হয়ে হঠাৎ সামনে যাকে পায় তাকেই পায়ে ছুঁয়ে সালাম করা শুরু করে দিলেন। এ দৃশ্য সাংবাদিকরা দেখে তার ছবি তুলছে আর জিজ্ঞেস করছে, ‘আচ্ছা, আপনি ছোট-বড় নির্বিশেষে যাকেই সামনে পাচ্ছেন তাকেই এভাবে সালাম করছেন কেন?’

জবাবে বললেন, ‘ব্রাদার, আপনারা কি মনে করছেন হুদাহুদিই সালাম করছি? গত দুই সপ্তাহ এ ঢাকা শহরে বিভিন্ন যানবাহনে ভ্রমণ করেছি। ট্রেন, বাস, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, রিকশাসহ যাবতীয় যানবাহন ব্যবহার করেছি। এগুলো বহু পুরাতন মডেলের। আমাদের দেশে এসব ২০ বছর আগেই বাতিল। খুব বিস্মিত ও চমকিত হয়েছি এই ভেবে- এটা কীভাবে সম্ভব? আমাদের বাতিল করা মডেল এদেশে দিব্যি চলছে এবং যারা যাত্রী তারাও দিব্যি বেঁচে আছেন!

আমার বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে ঢাকা শহরের প্রতিটি মানুষ ‘কামেল দরবেশ’! বুজুর্গ লোক। নইলে কীভাবে বেঁচে আছেন? তাই আজ এখানে যাদের পাব তাদের সবাইকে সালাম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি!’

তো কথা কিন্তু একেবারে মিছা না! আমরা যে ভেজাল খেয়েও বেঁচে আছি এবং খুব ডাটে-ফাটেই আছি তাতে কিন্তু কামেল না হলে বাঁচার কথা নয়! প্রতিদিন ফেসবুক আর খবরের কাগজে যেসব নেতিবাচক খবর ছাপা হয় তাতে মনে হয় সমস্যার হিমালয় বিদ্যমান এ শহরে। এখন ঢাকায় এডিস মশা মহানায়ক। নগরপিতা দুজন। এডিস নামক লেডিসকে নিয়ে তারা নাকানিচুবানি খাচ্ছেন। আসলে ঢাকায় আপনি বা আমরা কিছুই ঢেকে রাখতে পারছি না!

শেষ করি একটা ছড়া দিয়ে- কত খবর কত ধুলা/ রাজধানীর গলিতে/ নাকে মুখে ঢুকে যায়/ দু’চার কদম চলিতে। এত খবর! এত কিছু/ মরি আমি হাপোসে। ঘরে ঢুকেই খবরগুলো/ মুছে ফেলি পাপোসে’!