ভূত মামা

ঢাকা, শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

ভূত মামা

মনিরা পারভীন
🕐 ৪:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০২১

ভূত মামা

ভূত মামা, ভূত মামা... বলে একদল ছেলেমেয়ে এক লোকের পিছু ছুটতে থাকে। লোকটি দৌড়ে পালাতে থাকে। হাত নেড়ে পেছন ফিরে বলতে থাকে, এখন যাও। পরে কথা হবে। শিশুদের দল থেমে যায়। যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। আসলে লোকটি তার বোনের বাড়ি এসেছে। নাম তার শফিক। মাথায় বড় বড় চুল। চাপ দাঁড়ি-গোঁফ বেশ মানিয়েছে। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। পাঞ্জাবি আর পায়জামায় তাকে এ গ্রামে প্রায়ই দেখা যায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দর্শন নিয়ে পড়েন। ঢুলি গ্রামে তার বোনের শ্বশুরবাড়ি। দুলাভাই কলেজ শিক্ষক। বোন গৃহিণী। একমাত্র ভাগনি মুমু তার প্রাণের বন্ধু।

মুমু ক্লাস সিক্সে পড়ে। কোঁকড়া মাথার চুল। শ্যাম গায়ের রঙ। খুব চঞ্চল আর বুদ্ধিমতী। মামার সঙ্গে তার খুব ভাব। বাসায় এলেই মুমু বায়না করে ভূতের গল্প শোনার। অনেক সময় শফিক গ্রামের বাচ্চাদের নিয়ে গোল করে বসে গল্প শোনায়। সকল শিশুর কাছে শফিক ভূত মামা নামে পরিচিত।

অমাবস্যার রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। শফিক হাট থেকে ফিরছে। মোবাইল ফোনে চার্জ নেই। ব্যাটারি লো দেখাচ্ছে। বড়ই বিপদ। টর্চ বেশিক্ষণ জ্বালিয়ে রাখতে পারছে না। চেনা পথ। তবে রাত আজ গভীর। হঠাৎ তার মনে হলো কেউ পিছু পিছু হাঁটছে। শফিক থেমে গেল। পেছনে পায়ের শব্দ নেই। আবার হাঁটতে শুরু করেছে। শব্দটা আগের মতোই আছে। শফিক এসব ভূত-প্রেত বিশ্বাস করে না। তবে জ্বিন তো আছেই। আর একটু কী যেন আগ্রহ কাজ করে এসবের প্রতি। তাই সারাদিন বাচ্চাদের ভূতের গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলতে সে পছন্দ করে। এবার হয়তো একটা সত্যি ঘটনা বলতে পারবে। একটু ভয় ভয় করছিল শফিকের। তাই সে গান শুরু করে দেয়। গলা দিয়ে সুর যেন বের হয় না। তবু চিৎকার করছে যাতে ভয় কম লাগে। কোনো গান সম্পূর্ণ গাইতে পারছে না। একটার দুই লাইন তো আরেকটার এক লাইন। তবু সে ভুলভাল গেয়ে চলেছে। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। শফিকের ইচ্ছে করছে ওদের গলা চিপে ধরতে। মনে মনে বলছে, তোরা যদি এত চেঁচামেচি করিস তো আমার গান ভূত শুনবে কী করে!
শফিকের হঠাৎ মনে হচ্ছে ঘাড়ে কী যেন সুড়সুড় করছে। কোনো পরীর আঙুল কিনা বুঝতে পারছে না। এর আগে তো আর পরীর দেখা মেলেনি। পরীর স্পর্শ পায়নি। ভয় পেলেও ভালোই লাগছে তার। গল্প করবে সবার কাছে। দুরুদুরু বুকে ভয়কে করল জয়। বাম হাত দিয়ে চিপে ধরল ডান পাশের গলা। আর চিল্লিয়ে বলল, কার এতো বড় সাহস রে, আমার ঘাড় ধরে। একটু পর অনুভব করল এটা কোনো পরী নয়। অন্যকিছু সে চিপে ধরেছে। একটু নরম আর কাঁটাযুক্ত। হাতটা চোখের সামনে এনে মোবাইলের আলোতে দেখে একটা বড় কালো পোকা তার ঘাড়ে চড়ে বসেছে। শফিক কিনা পোকাকে ভয় পেল! সে মনে মনে নিজেকে ধ্বিক্কার দিতে লাগল। বলে, ছি শফিক! শেষপর্যন্ত তুই পোকার ভয়ে কাঁপাকাঁপি করলি? লজ্জায় শফিকের বুক ধড়ফড় করা কমে আসে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ব্যাটা পোকা রে! আমি ভাবলাম ভূতের রানি। আর তুই কিনা পোকার হদ্দ। হাউ ফানি, হাউ ফানি।
না হয় যেন জানাজানি। অবশেষে শফিক বাড়ি ফিরে। আর মুমুকে রঙ-চঙ মাখিয়ে গল্প শোনায়।
মুমু পরদিন একঝাঁক বাচ্চাকাচ্চা একত্রিত করে। তারপর গল্প শুরু করে দেয়Ñ জানিস, ভূত মামার কাছে পরী এসেছিল। পরী ভূত মামার ঘাড়ে চিমটি কেটেছে।
সবাই চিৎকার করে বলে, ভূত মামা, দেখাও দেখাও।
শফিক বলে, না রে আজ থাক। কে শোনে কার কথা। সবাই ঘিরে ধরে। দেখে ঘাড়ে কালো দাগ। সবাই ভয়ে চিৎকার করে বলে, ওরে বাবা! পরী আঁচড় দিয়েছে মামাকে। তারপর নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় শফিককে। পরী দেখতে কেমন? কত বড় চুল? কত লম্বা? কী পোশাক পরে ছিল? কী বলল? ইত্যাদি ইত্যাদি। শফিক বানিয়ে বানিয়ে বললো, পরী চাঁদের মতো উজ্জ্বল। সাদা গাউনে রুপোলি কারুকাজের পোশাক পরেছিল। ঝলমলে দুটো পাখা। পা পর্যন্ত ঝরঝরে চুল।
একজন প্রশ্ন করল, ভূত মামা, ও তোমাকে চিমটি দিলো কেন?
শফিক একটু থতমত খেয়ে বলল, পরী আমাকে নিয়ে যেতে চাইল। আমি রাজি হইনি। তাই চিমটি দিয়ে পালিয়ে গেল।
সবাই ও... করে আওয়াজ করল। রাতুল বলল, ভাগ্যিস তুমি যাওনি ভূত মামা। তাহলে আমরা কার কাছে গল্প শুনতাম।
হিয়া বলল, মামা তুমি যে বলেছিলে, পরী যাকে ধরে তাকে আর ছাড়ে না। তাহলে ও কী তোমাকে আবার এসে নিয়ে যাবে?
শফিক একটু গলা খকখক করল। মনে মনে বলল, মিথ্যে মিথ্যে গল্প বানিয়ে ভালোই বিপদে পড়লাম দেখি। তারপর ওদের বলল, আরে আমার কাছে আর আসতে পারবে না। আমি একটা মন্ত্র শিখেছিলাম। সেটা পড়ে নিয়েছি। সবাই লাফাতে লাগল। চিৎকার শুরু করল। বলো ভূত মামা কী সেই মন্ত্র। না হলে আজ ছাড়ব না। মুমুও গলা জড়িয়ে বললÑ হ্যাঁ মামা, আজ বলতেই হবে! বেচারা শফিক উপায় না পেয়ে বানিয়ে বানিয়ে যা মনে এলো বলে ফেলল-
হাকরি ঝাকরি ভূতরি কামরি
মারকি পাকরি চু চা
লাথথি খামচি চিমচি ঘিমচি
ধাককি ধুককি ফু ফা।
সবাই হি হি হো হো করে হাসতে লাগল আর মুখস্থ করার চেষ্টা করল। শফিক বলল, আজ আর গল্প বলব না। মন্ত্র পড়তে পড়েতে বাড়ি যাব। চলো সবাই। সকলে ভূত মন্ত্র পড়তে পড়তে ভূত মামার সঙ্গে বাড়ি ফিরল।

 
Electronic Paper