ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০২৪ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো. শাহজাহান চিশতীর স্মৃতিচারণ

অনলাইন ডেস্ক
🕐 ৫:০৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৫, ২০২৩

বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী মো. শাহজাহান চিশতীর স্মৃতিচারণ

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও তার অবস্থান সমপর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সবেমাত্র শৈলজুড়া হাই স্কুলে ক্লাস ট্রেনে পড়ি। এ সময়ই পাক হানাদার বাহিনী এদেশের নিরীহ জনগণের উপর প্রকটভাবে অত্যাচার অনাচার শুরু করে, যা ভাষাতীত। তখন বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিলেন এবং বাঙ্গালি জাতিকে পাক বাহিনী ও তাদের মদদ দাতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেন । তখনই আমার তরুণ রক্ত টগবগিয়ে লাফিয়ে উঠে এবং এ দেশকে পাক বাহিনীর কবল থেকে উদ্ধার করতে সংকল্প করি ও যুদ্ধে যাওয়ার জন্য গোপনে গোপনে বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে পরামর্শ করে যুদ্ধে যাবার জন্য তৈরী হয়। স্বাধীনতা লক্ষে চলে যায় মুক্তিযুদ্ধে।

একাত্তরের রণাঙ্গণে কারা সঙ্গী ছিলেন এবং কোনধরণের অস্ত্র পরিচালনায় ট্রেনিং করেছেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধে যাবার সময় আমার সঙ্গে ছিল মুড়িয়াউক গ্রামেরই সাবেক লাখাই উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, মৃত মফিজুল ইসলাম চৌধুরী। সিংহ গ্রামের সফিকুল ইসলাম চৌধুরী (আজদু)। বর্তমান সহকারী কমান্ডার হবিগঞ্জ জেলা ইউনিট আলহাজ্ব এডভোকেট সালেহ আহমেদ ও বামৈ গ্রামের কৃতি সন্তান তৎকালীন সময়ের বিপ্লবী যুব নেতা বর্তমান আমেরিকা প্রবাসী জনাব নুর মোহাম্মদ। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে ত্রি নট ত্রি রাইফেল, ফোর মার্ক রাইফেল, এস এল আর, এইচ থার্টিসিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিব, এন টি ট্যাং মাইন, এন টি পার্সোনাল মাইন, এল এম জি সহ আরো নানান সামরিক অস্ত্র ট্রেনিং দিয়েছি।

কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ও আমার সঙ্গীরা বাংলাদেশের ভিতরে সীমান্ত এলাকায় বিশেষ করে গেলিরা যুদ্ধ করতাম। আমরা রাজাকার, আলবদর, আল সামস ও পাক বাহিনীর দালাল এবং তাদের সাহায্যকারী মদদ দাতাদের ধরে নিয়ে আসতাম বা মেরে ফেলতাম। এছাড়াও পাক হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ মাধ্যম সাঁকো, ব্রিজ, টেলিফোন লাইনসহ ইত্যাদি করে দিতাম। যাতে হানাদার বাহিনীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

কত নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধে অংশ নেন এবং সেক্টর কমান্ডার কে ছিলেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশকে এগারটা ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। আমি ৩ নাম্বার সেক্টরে অংশগ্রহণ করি। তখন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বর্তমান ফোরামের সভাপতি কর্ণেল সফি উল্লাহ।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারের কী ধরণের ক্ষতি হয়েছিলো? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৩১ অক্টোবর ১৯৭১ খৃষ্টাব্দ। ভোর রাতে পাক বাহিনী ও তাঁদের দোসরদের নিয়ে মুড়িয়াউক গ্রামে আমার বাড়িতে আক্রমণ করে ওবং আমকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়ির আশ পাশের জঙ্গলে তল্লাশি করতে থাকে। তখন আমি বাড়িতে ছিলাম না। তাই পাক হানাদার বাহিনী আমকে না পেয়ে আমার বৃদ্ধ বাবা আব্দুল জব্বার (৭০) দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যায় এবং আমার বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়ে ছারখার করে দিয়ে যায়। এই আগুনে আমার বাড়ির দক্ষিণ পাশে থাকা কিছু গরিব নিরীহ মানুষের ঘর ও পুড়ে যায়। পরে তাঁরা আমার পিতাকে নিয়ে নৌকাযোগে আমার গ্রামে থেকে প্রায় ১০ কিমি. দূরে মানপুর গ্রামের এক বিশিষ্ট দালালের বাড়ি হয়ে লাখাই থানায় নিয়ে যায়। সাথে যুদ্ধকালীন কমান্ডার ইলিয়াস কামালের পিতা ইদ্রিস মিয়া (৭৫) কে নিয়ে যায়। তখন ছিল রমজান মাস, তাঁরা নাকি সেখানে ইফতারি করায়। পরে রাতে পাক হানাদার বাহিনী লাখাই থানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের কোথাও রাইফেল দিয়ে গুলি করে শহীদ করে ফেলে দেন। পরে আমার আত্মীয় স্বজন তাহা জানতে পেরে অনেক খোঁজাখুঁজি করলেও তাঁদের লাশের সন্ধান মেলাতে পারেননি। সর্বশেষ, জীবনের শেষ চাওয়া কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, একটি সুন্দর মৃত্যু।

উল্লেখ্য, সাক্ষাৎকারটি তার জীবদ্দশায় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ‘মাসিক কলমবাণী’ ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়েছিলো।

 
Electronic Paper