নারীদের অনুপ্রেরণা অরুন্ধতি

ঢাকা, শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

নারীদের অনুপ্রেরণা অরুন্ধতি

আতিকুর রহমান কাযিন
🕐 ১:৫২ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০২২

নারীদের অনুপ্রেরণা অরুন্ধতি

নর্মদা ড্যাম প্রজেক্টের বিরুদ্ধে তীব্রকন্ঠ ছিলেন অরুন্ধতি। তিনি মিলিয়ন মানুষকে গৃহহীন করে ছাড়বে এবং তাও কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়া। নিজের বুকার প্রাইজ থেকে পাওয়া অর্থ ও বই এর স্বত্ত্ব হতে পাওয়া অর্থ তিনি দান করেন ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে’। তার এই আন্দোলনও কংগ্রেস ও বিজেপি নেতাদের সমালোচনার শিকার হয়। পরিবেশ ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহও অরুন্ধতির এই আন্দোলনকে তীব্র সমালোচনা করেন। 

প্রারম্ভিক কর্মজীবন : অরুন্ধুতী তার কর্মজীবনের প্রথম দিকে, টেলিভিশন এবং চলচিত্রের জন্য কাজ করেছেন। তিনি ইলেকট্রিক মুন (১৯৯২) এবং ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ান্স (১৯৮৯) -এর জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। শেষেরটি স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্রী হিসাবে তার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র, যেখানে তিনি একজন অভিনেত্রী হিসেবেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। চলচিত্রদ্বয় তার বৈবাহিক জীবন চলাকালীন, তার স্বামী প্রদীপ কৃশেন দ্বারা পরিচালিত। ১৯৮৮ সালে অরুন্ধতী ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ান্স এর জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ১৯৯৪ সালে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন, যখন তিনি ফুলন দেবীর জীবনের উপর ভিত্তি করে নির্মিত শেখর কাপুরের চলচ্চিত্র, ব্যান্ডিট কুইন, এর সমালোচনা করেছিলেন। তার চলচ্চিত্রের পর্যালোচনাতে ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রেপ ট্রিক’ শিরোনামে, তিনি অনুমতি ব্যতিরেকে একজন জীবিত নারীর, ধর্ষণকে ভিন্নভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এবং ফুলন দেবীকে কাজে লাগিয়ে তার জীবন ও জীবনের অর্থ, উভয়কে মিথ্যা বর্ণনা করা নিয়ে শেখর কাপুরকে অভিযুক্ত করেন।

প্রারম্ভিক জীবন : অরুন্ধতী রায় ১৯৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতের আসাম রাজ্যের শিলংয়ে অরুন্ধতী জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রঞ্জিত রায় এবং মাতার নাম সিরিয়ান খ্রিস্টান ম্যারি রায়। ম্যারি রায়ও একজন নারী অধিকার কর্মী ছিলেন। তিনি কেরালার আয়মানাম এলাকায় শৈশবকাল কাটান। কত্তায়ামের কর্পাস ক্রিস্টি বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর তামিলনাড়ুর নীলগিরিতে লরেন্স বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্থাপত্যবিদ্যা বিষয়ে দিল্লির পরিকল্পনা ও স্থাপত্য বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানেই তিনি তার প্রথম স্বামী স্থাপত্যবিশারদ গেরার্ড দ্য কুনহা’র সাথে পরিচিত হন।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন : অরুন্ধতী রায় প্রথম গেরার্ড দ্য কুনহার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে তাদের বিচ্ছেদ ঘটার পর ১৯৮৪ সালে দ্বিতীয় বারের মত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্বামী প্রদীপ কৃষাণ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৮৫ সালে পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র মাসি সাহিবে উপজাতীয় বালিকার চরিত্রে অভিনয় করেন। দ্য গড অব স্মল থিংসের সাফল্যের পূর্বে আর্থিক সচ্ছলতা আনয়ণে অনেকগুলো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তন্মধ্যে-দিল্লির পাঁচতারা হোটেলে এরোবিক্স ক্লাস পরিচালনা করা অন্যতম। অরুন্ধতী’র কাকাতো ভাই প্রণয় রায় টিভি মিডিয়া গ্রুপ এনডিটিভির প্রধান। বর্তমানে অরুন্ধতী রায় দিল্লিতে বসবাস করছেন।

যদি আপনি ধার্মিক হয়ে থাকেন, তাহলে মনে রাখুন, এই বোমা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের চ্যালেঞ্জ। যেন খুব সহজ ভাষায় বলা যায়, তুমি যা কিছু সৃষ্টি করেছো, সে সব কিছু ধ্বংসের ক্ষমতা আমাদের আছে। আর যদি আপনি ধার্মিক না হন, তাহলে এভাবে ভাবুন, আমাদের ৪৬০ কোটি বছরের পুরোনো এই পৃথিবী এক বিকেলেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এই কথাগুলো পড়েই পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কতটা সূক্ষণতা অবলম্বন করে বক্তা কথাগুলো বলেছেন।  একইসাথে দুটো আলাদা মানসিকতার মানুষদের কথা মাথায় রেখে তাদের একই ধারায় চিন্তা করতে বাধ্য করার মতো সুষ্ঠু কূটনৈতিকতা অবলম্বন করে কথাগুলো বলা। এই লাইনগুলো লিখেছিলেন অরুন্ধতি রায়। ১৯৯৮ সালে তিনি ভারত সরকারের নিউক্লিয়ার পলিসির একটি সমালোচনা লিখেন ‘দ্য এন্ড অব ইমাজিনেশন’ নামে। সেখানেই উক্ত কথাগুলো উল্লেখ করেন তিনি।

অরুন্ধতি রায় একজন প্রখ্যাত ভারতীয় ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং মানবাধিকার ও পরিবেশ বিষয়ক আন্দোলনে জড়িত রাজনৈতিক কর্মী। ১৯৯৭ সালে নিজের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ এর জন্যে ম্যান বুকার পুরষ্কার পান অরুন্ধতি। ভারতে বসবাসরত কোনো ভারতীয় নাগরিক কর্তৃক রচিত সবচেয়ে অধিক বিক্রিত বই হয় এটি সেই সময়। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষহীন এবং নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে সর্বদা উচ্চকন্ঠ, মানুষ এবং সমাজ সম্পর্কিত গভীরতর বোধসম্পন্ন এক মহিয়সী বুদ্ধিজীবি এ নারী। নামটি হয়তো অনেকেরই জানা, চলুন কিছু জানা যাক তার কর্ম ও ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে।

অরুন্ধতির জন্ম ১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর, ভারতের মেঘালয়ের শিলং-এ। বাবা রাজীব রায় ছিলেন কলকাতার একজন বাঙালি হিন্দু। পেশায় তিনি ছিলেন চা-বাগান প্রকল্পের ম্যানেজার। আর মা মেরী রায় ছিলেন কেরালার খ্রিস্টান পরিবারের মেয়ে, পেশায় নারী অধিকার রক্ষা কর্মী। অরুন্ধতির বয়স যখন ২ বছর, তখন তার বাবা-মা’র বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর মায়ের সাথে কেরালায় চলে আসেন শিশু অরুন্ধতি। মাঝে কিছুদিন উটি-তে নানার বাড়িতেও কাটান তিনি। ৫ বছর বয়সে পুনরায় ফিরে আসেন কেরালায়। সেখানে তার মা একটি স্কুল চালু করেন। অরুন্ধতির ছোটবেলা কেটেছে এই প্রাকৃতিক রুপ-সৌন্দর্যে ঘেরা কেরালাতেই।

কোট্টায়ামের ‘করপাস ক্রিস্টি’ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা নেন অরুন্ধতি। এরপর তামিলনাড়ুর নীলগিরিতে লাভডেল লরেন্স স্কুলে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে দিল্লীর স্কুল অব প্ল্যানিং এন্ড আর্কিটেকচার থেকে আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। এখানে তিনি আর্কিটেক্ট জেরার্ড দা কানহা’র সাথে মিলিত হন এবং পরবর্তীতে তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। দিল্লী এবং গোয়ায় বেশ কিছুদিন একসাথে বসবাসের পর তাদের বিচ্ছেদ হয়।

দিল্লীতে ফিরে ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট আরবান অ্যাফেয়ার্স’-এ কর্মজীবন শুরু করেন অরুন্ধতি। ১৯৮৪ সালে চিত্রনির্মাতা প্রদীপ কৃষাণের সাথে পরিচয় হয় তার। নিজের নির্মিত একটি চলচ্চিত্রে অরুন্ধতিকে একটি রোল দেন তিনি। ‘ম্যাসেই সাহিব’ নামক চলচ্চিত্রটি বেশ কিছু পুরষ্কারপ্রাপ্ত হয়। পরবর্তীতে তারা দুজন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মিলিত প্রচেষ্টায় এই দম্পতি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে একটি টিভি সিরিজ এবং ‘ইন হুয়িচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ (১৯৮৯) ও ‘ইলেকট্রিক মুন’ (১৯৯২) নামে দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। প্রথমটির জন্যে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে জাতীয় পুরষ্কার পান অরুন্ধতি।

‘দ্য গড অব স্মল থিংগস’: অরুন্ধতী তার প্রথম উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস ১৯৯২ সালে লিখতে শুরু করেন। যা ১৯৯৬ সালে শেষ হয়। বইটি আধা-আত্মজীবনীমূলক এবং একটি প্রধান অংশ আয়ামানামে তার শৈশবের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। দ্য গড অব স্মল থিংগস রায়কে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শিখরে পৌছে দেয়। বইটি ১৯৯৭ বুকার পুরস্কার পায় এবং ১৯৯৭ এর জন্য নিউ ইয়র্ক টাইমস উল্লেখযোগ্য বইগুলির একটি হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়। এটি মৌলিক কথাসাহিত্যের জন্য নিউইয়র্ক টাইমসের বাইশেলস্টেরার তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে পৌঁছেছে। শুরু থেকেই, বইটি বাণিজ্যিক সাফল্যও লাভ করেছিল। অরুন্ধতী অর্ধ মিলিয়ন পাউন্ড অগ্রিম হিসাবে পেয়েছিলেন। এটি মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল এবং জুন মাসের শেষের দিক অবধি এই বইটি ১৮ টি দেশে বিক্রি হয়েছিল। দ্য গড অব স্মল থিংস, আমেরিকান মুখ্য সংবাদপত্রগুলিতে অগ্রণী পর্যালোচনা পায় যেমন দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। ‘অসাধারণ’, ‘প্রাথমিকস্তরে নৈতিকভাবে তেজঃপূর্ণ এবং কল্পনামূলকভাবে এত নমনীয়’ এবং লস এঞ্জেলেস টাইমস ‘কাঁটার মত খোঁচা দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ বেগময় উপন্যাস’ এবং কানাডার প্রকাশনা যেমন টরন্টো স্টার একটি সতেজ, ঐন্দ্রজালিক উপন্যাস। বছরের শেষের দিকে এটি টাইম দ্বারা ১৯৯৭ এর পাঁচটি সেরা বইগুলির মধ্যে একটি গণ্য হয়। যুক্তরাজ্যের সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া ছিল কম ইতিবাচক, এবং বুকার পুরস্কার দেওয়ায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়; কারমেন কলিল, ১৯৯৬ এর একটি বুকার প্রাইজ বিচারক, উপন্যাসটি ‘জঘন্য’ নামে অভিহিত করেন।

আলোচিত নারী : দ্যা গড অব স্মল থিংস বইয়ের নামের সঙ্গে যে নামটি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত সে নাম অরুন্ধতী রায়। ভারতের এই প্রখ্যাত লেখিকা বর্তমানে ঢাকায়। স্বাভাবিকভাবেই তার লেখার ভক্তদের আগ্রহ সীমাহীন তাকে ঘিরে। তাই নতুন করে বাংলাদেশের সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বিষয় অরুন্ধতী রায়। তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব দ্য আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। এই উপন্যাসটিও পাঠক মনে ঝড় তোলে। অরুন্ধতী রায় শুধু একজন লেখক নন তিনি সামাজিক অ্যাক্টিভিস্টও। তার পুরো নাম সুজান্না অরুন্ধতী রায়। ১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর আসামের শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার বাবা রঞ্জিত রায় ছিলেন বাঙালি হিন্দু এবং মা সিরিয়ান খ্রিস্টান ম্যারি রায় নারী অধিকার কর্মী ছিলেন। কেরালার আয়মানাম এলাকায় শৈশবকাল অতিক্রান্ত করেন অরুন্ধতী রায়। দ্যা গড অব স্মল থিংস বইটিতে মূলত অরুন্ধতীর ছোটবেলার গল্পগুলোই তুলে ধরা হয়েছে। এসেছে অনেক ছোট ছোট স্মৃতিকথা। শুধু লেখালেখির জগতেই নয়, সিনেমার জগতেও খানিকটা পরিচিত মুখই অরুন্ধতী রায়। অরুন্ধতী তার কর্মজীবনের প্রথম দিকে, টেলিভিশন এবং চলচিত্রের জন্য কাজ করেছেন। তিনি ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া ইলেকট্রিক মুন এবং ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোস ওয়ান্স-এর জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। দ্বিতীয়টি স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্রী হিসাবে তার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি চলচ্চিত্র, যেখানে তিনি একজন অভিনেত্রী হিসেবেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রের জন্য সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে ন্যাশনাল ফিল্ম এ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেন তিনি।

দ্যা গড অব স্মল থিংস বইটির জন্য তিনি বুকার পুরস্কারও অর্জন করেন। ২০০৪ সালে সিডনী পিস প্রাইজও অর্জন করেছিলেন তিনি। অবদমিত মানুষদের জন্য খোলাখুলি কথা বলার জন্য ২০০২ সালে লান্নান কালচারার ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেন তিনি। ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব লেটার্সের পক্ষ থেকে ২০০৬ সালে পান সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ড। পরবর্তী সময়ে ভারতে সামাজিক ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে নিজের এই পুরস্কার ফিরিয়ে দেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকেন অরুন্ধতী রায়। মানুষকে নাড়া দেয়ার বা মানুষের ভাবা দরকার এমন সব বিষয় নিয়ে বরাবর কথা বলে এসেছেন তিনি। বিশ্বায়ন বিরুদ্ধ বা বিশ্বায়নের বিকল্প আন্দোলন নিয়েও বরাবর কথা বলে এসেছেন তিনি। সমালোচনা তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি নিয়েও। পরমাণু চুক্তি ও শিল্পায়ন নিয়ে ভারতের নীতি নিয়েও বরাবর সমালোচনা তুলেছেন এই লেখিকা।

শুধু ভারতের নয় শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীতিমালা সম্পর্কেও অনেক কিছু লিখেছেন অরুন্ধতী রায়। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কথা বলেও প্রবলভাবে সমালোচিত হয়েছেন অরুন্ধতী রায়। বাংলাদেশি ফটোগ্রাফার শহিদুল আলম যখন কারাবন্দী ছিলেন তখনও তাকে মুক্ত করার কথা বলে অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে বিবৃতি প্রকাশ করেন অরুন্ধতী রায়। এসব মিলিয়েই সবার কাছে প্রবলভাবে আলোচিত এই লেখিকা।

প্রথম উপন্যাস : প্রথম উপন্যাসের অভূতপূর্ব সাফল্যের পরে অরুন্ধতি রায় ঞযব ইধহুধহ ঞৎবব নামে একটি টিভি সিরিয়াল নামে একটি ডকুমেন্টরি তৈরি করেন। প্রথম উপন্যাসের প্রকাশের পর তার বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অতিবাহিত করেন। এই দীর্ঘ সময় তিনি সামাজিক বিষয়াবলির উপর অনেক প্রবন্ধ লিখেন। সবসময় নগ্ন সত্যের পক্ষে কথা বলে বিতর্কিতও কম হননি অরুন্ধতি। ২০০৮ সালে তিনি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে কাশ্মীরের স্বাধীনতার স্বপক্ষে তার মতামত ব্যক্ত করেন। ১৮ আগস্ট, ২০০৮ কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে প্রায় ৫ লক্ষ কাশ্মীরি জনতার একটি র?্যালী অনুষ্ঠিত হয়।

অরুন্ধতির ভাষ্যমতে, তাদের এই র‌্যালী ছিল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হবার আকাঙ্খার নিদর্শন। তার মতে কাশ্মীরে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় কাশ্মীরি জনগণকে স্বাধিকার প্রদান করা। তার এই মতামতের জন্য তিনি কংগ্রেস ও বিজেপি’র তীব্র তোপের মুখে পড়েন। কংগ্রেস নেতা সত্য প্রকাশ মালবিয়া অরুন্ধতিকে তার দেয়া ‘ঐতিহাসিক সত্যের বিপরীত’ এই ‘দায়িত্বহীন’ উক্তি অপসারণ করে নিতে বলেন।

সবসময় নগ্ন সত্যের পক্ষে কথা বলে বিতর্কিতও কম হননি অরুন্ধতি। নর্মদা ড্যাম প্রজেক্টের বিরুদ্ধে তীব্রকন্ঠ ছিলেন অরুন্ধতি। তিনি বলেছিলেন, এই প্রজেক্ট প্রায় আধা মিলিয়ন মানুষকে গৃহহীন করে ছাড়বে এবং তাও কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়া। নিজের বুকার প্রাইজ থেকে পাওয়া অর্থ ও বই এর স্বত্ত্ব হতে পাওয়া অর্থ তিনি দান করেন ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে’। তার এই আন্দোলনও কংগ্রেস ও বিজেপি নেতাদের সমালোচনার শিকার হয়।

সিনেমার পর্দায় : একসময় সিনেমার দুনিয়ায় মন উঠে যায় তার। এরপরে অ্যারোবিক ক্লাস চালানোসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। এর মাঝে তার লেখাও চলতে থাকে। একসময় প্রদীপের সাথে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ’৯৭ সালে প্রকাশিত অরুন্ধতির প্রথম উপন্যাস, সেমি-অটোবায়োগ্রাফিক্যাল ধাঁচের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ তাকে তুমুল জনপ্রিয়তা এবং আর্থিক সচ্ছ্বলতা এনে দেয়। আয়মানামে বাসকালীন সময়ের নিজের বাল্যকালের অনেক স্মৃতির প্রতিচ্ছবি আছে তার এই উপন্যাসে। টাইম, গার্ডিয়ান, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, টরেন্টো স্টার প্রভৃতি নামকরা ম্যাগাজিন কর্তৃক ভূয়সী প্রশংসিত হয় বইটি। অবশ্য তার নিজ বাসভূমি কেরালার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ই. কে. নয়নজার বইটিতে অনবদমিত যৌনতার ব্যবহারের সমালোচনা করে অরুন্ধতির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আনেন।

পুরস্কার: ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ উপন্যাসের জন্যে ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করেন অরুন্ধতী। এ পুরস্কারের অর্থ মূল্য ছিল ৩০,০০০ ডলার। পুরস্কার প্রদান উৎসবে আয়োজক কমিটি উল্লেখ করেন। ‘বইটিতে সকল বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যা ইতোমধ্যেই সৃষ্ট হয়েছে’। এর আগে তিনি ‘ইন হুইচ এনি গিভস ইট দোজ ওয়ানসে’র জন্য ১৯৮৯ সালে সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে ন্যাশনাল ফিল্ম এ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। ২০০২ সালে তিনি লান্নান ফাউন্ডেশনের সাংস্কৃতিক মুক্তি পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকার ও সংস্থাগুলো কর্তৃক সাধারণ নাগরিকগোষ্ঠীর উপর প্রভাব বিস্তার শিরোনামীয় প্রবন্ধে তার জীবন উৎসর্গ এবং মুক্তি, ন্যায়বিচার ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়াবলি তুলে ধরা হয়েছিল।

 
Electronic Paper