জন্ম নিরোধকের জনক মার্গারেট

ঢাকা, শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২ | ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

জন্ম নিরোধকের জনক মার্গারেট

রোকেয়া ডেস্ক
🕐 ৬:০৮ অপরাহ্ণ, মে ১১, ২০২২

জন্ম নিরোধকের জনক মার্গারেট

মার্গারেট হিগিন্স স্যাঙ্গার ১৪ সেপ্টেম্বর ১৮৭৯ সালে জন্মগ্রহন করেন। তিনি একজন মার্কিন জন্ম নিরোধক কর্মী, যৌন শিক্ষক, লেখিকা এবং সেবিকা হিসেবে দেশটিতে ‘জন্ম নিরোধক’ শব্দের প্রচলন শুরু করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্ব প্রথম জন্ম নিরোধক ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। তার তৈরি সংগঠনই পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত পরিবার পরিকল্পনা ফেডারেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

স্যাঙ্গার নিজের লেখনী ও বক্তব্য দ্বারা প্রাথমিকভাবে নিজের বক্তব্য ও চিন্তাধারা প্রচার করেন। তিনি তার রচিত বই ‘ফ্যামিলি লিমিটেশন’ এর জন্য ১৯১৪ সালে কমস্টক এক্ট আইন ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত হন। ভয় পেয়ে তিনি ব্রিটেনে পালিয়ে যান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার আগ অব্দি সেখানেই অবস্থা করেন। স্যাঙ্গার বেশ কিছু আইনি কেসে অবদান রাখেন যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিরোধক উপকরণ আইনগত ভাবে স্বীকৃতি পায়। পরিকল্পিত পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি প্রায়ই গর্ভপাত বিরোধীদের আক্রমনের শিকার হতেন। যদিও স্যাঙ্গার জন্ম নিরোধক ও গর্ভপাতের মাঝে পার্থক্য করে নিয়ে নিজের কর্মজীবনের বড় সময় গর্ভপাত বিরোধীতা করে এসেছেন। স্যাঙ্গার এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জনসম্প্রদান অধিকার নিয়ে কাজ করায় প্রশংসিত চরিত্র। সুপ্রজননবিদ্যা সমর্থনের জন্য তিনি বিভিন্ন সময় নিন্দিত হন।

প্রাথমিক জীবন
১৯১৯ সালে (আনুমানিক) পুত্র গ্রান্ট ও স্টুয়ার্টের সাথে স্যাঙ্গার ১৮৭৯ সালে নিউ ইয়র্কে করনিঙে জন্মগ্রহণ করেন। স্যাঙ্গারের পিতা একজন মুক্তি চিন্তা ধরানার আইরিশ ব্যক্তি- মাইকেল হেনেসি হিগিন্স এবং মা এন পুরসেল হিগিন্স একজন ক্যাথলিক আইরিশ-আমেরিকান। মাইকেল ১৪ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ১৫ বছর বয়সেই তিনি সামরিক বাহিনীতে ড্রামবাদক হিসেবে যোগ দিয়ে সিভিল ওয়ারে অংশ নেন। মাইকেল একজন ক্যাথলিক থেকে নাস্তিক হন এবং নারীভোটাধিকারসহ বিনামূল্যে পাব্লিক শিক্ষার জন্য সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেন। স্যাঙ্গারের মাতা এন আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার আলুর দূর্ভিক্ষের সময় কানাডায় চলে যায়। ১৮৬৯ সালে এন মাইকেলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনে এন ১৮ বার গর্ভবতী হন। ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ১১ জন জীবিত সন্তানের জন্ম দেন। স্যাঙ্গার এর মাঝে ষষ্ঠ ছিলেন।

দুই বড় বোনের সহায়তায় স্যাঙ্গার ক্লেভার্যাক কলেজ ও হাডসন রিভার ইনষ্টিটিউটে ভর্তি হন। এর আগে ১৯০০ সালে তিনি হোয়াইট প্ল্যান্স হাসপাতালে সেবিকা হিসেবে দীক্ষা নেন। ১৯০২ সালে তিনি স্থপতি উইলিয়াম স্যাঙ্গারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পড়ালেখায় ইস্তফা দেন। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে স্যাঙ্গার তিন সন্তানের জন্ম দেন। পরিবারসহ নিউ ইয়র্কের ওয়েস্টচেস্টারে বসবাস শুরু করেন।

সামাজিক কর্মী
১৯১১ সালে একটি অগ্নিদূর্ঘটনায় স্যাঙ্গারের বাড়ি পুড়ে গেলে তিনি পরিবারসহ নিউ ইয়র্ক শহরে চলে আসেন। শহরের পশ্চিমে একটি বস্তিতে সেবিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন। মারগারাটের অর্ধাঙ্গ সেসময় স্থপতি হিসেবে একজন রঙ মিস্ত্রী সহ কাজ করতেন। উইলিয়াম স্যাঙ্গারের বামপন্থী রাজনীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মারগারেট প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী আধুনিক মননার রাজনীতিতে আগ্রহী হন। নিউ ইয়র্কের সমাজতান্ত্রিক দলের নারী কমিটিতে যোগ দেন। এই দলের অংশ হিসেবে তিনি ১৯১২ সালের লরেন্স টেক্স্টাইল হরতালসহ একাধিক শ্রমিক আন্দোলে যোগ দেন। এরই মাধ্যমে তিনি স্থানীয় বুদ্ধিজীবী, বামপন্থী রাজনীতিবীদ, সমাজকর্মীদের সান্নিধ্যে আসেন। এর মাঝে রয়েছেন জন রীড, আপটন সিনক্লেয়ার, মাবেল ডজ এবং এমা গোল্ডম্যান।

স্যাঙ্গারের রাজনৈতিক আগ্রহ তাকে নারীবাদের উদ্বুদ্ধ করে। সেবিকার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যৌনশিক্ষার উপর দুই সিরিজের কলাম লিখেন। (১৯১১-১৯১২) এবং (১৯১২-১৯১৩) শিরোনামের এই কলাম সিরিজ সমাজতান্ত্রিক ম্যাগাজিন নিউ ইয়র্ক কল। সেই সময়ের চিন্তাধারায় স্যাঙ্গারের নিবন্ধগুলোতে অকপটভাবে যৌনতা নিয়ে কথা বলায় অনেক পাঠকই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলো। অবশ্য আরো অনেক পাঠকেরা এই কলাম সিরিজের প্রশংসা করে। একজনের মতে অতি শুদ্ধ নৈতিক চর্চা যখন লাইব্রেরিগুলো কপট শিষ্টতায় পূর্ণ। ৬৫ মারগারেট স্যাঙ্গারের এই নিবন্ধগুলো ১৯১৬ সালে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। নিজের দায়িত্ব পালনকালে স্যাঙ্গার অনেক শ্রমজীবি অভিবাসী নারীদের সান্নিধ্যে আসেন। এসকল নারীরা ঘনঘন বাচ্চা প্রসবের মধ্য দিয়ে যেতো। একই সাথে গর্ভপাত, ঝুকিপূর্ণ স্ব-গর্ভপাত ও ওজন হ্রাসের মতো পরিণাম ভোগ করতো। ১৮৭৩ সালের আইন অনুযায়ী সেই সময়েও গর্ভনিরোধক সংক্রান্ত তথ্য প্রচারণা অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ ছিলো।

এই সকল অভিবাসী নারীদের সাহায্য করতে সরকারি পাঠাগারে যান, কিন্তু গর্ভনিরোধকের ব্যাপারে কোনো ধরনের তথ্য পান না। পরবর্তীতে স্যাঙ্গার তার এই অভিজ্ঞতার কথা নিজের বক্তব্যে প্রচার করেন। স্যাঙ্গার সেবিকা থাকাকালীন অবস্থায় ‘স্যাডি স্যাচস’ নাম্নী এক নারী নিজের গর্ভপাত করতে গিয়ে প্রচণ্ড রকমের অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্যাডি ডাক্তারের কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য প্রার্থনা করলে ডাক্তার গর্ভনিরোধের ব্যাপারটিই হেসে উড়িয়ে দেন, আপনি কেক খাওয়ার সময় নিজেও তো উপভোগ করেন, তাই না? এক কাজ করা যেতে পারে, আপনার স্বামী জ্যাককে ছাদে ঘুমুতে বলতে পারেন। কয়েক মাস পরে স্যাঙ্গার স্যাডির সাথে দেখা করতে গেলে কিছু সময় পরেই স্যাডি আরেকটি গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে মারা যায়। স্যাঙার প্রায়শঃই নিজের গল্প এই বলে শেষ করতেন যে, আমেরিকার কর্মজীবি নারীদের জন্মনিরোধক পদ্ধতির ব্যাপারে যথাযথ তথ্য প্রদান সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত আমি আর একটি কেইস নিয়ে কাজ করবো না। অবশ্য জীবনীকার এলেন চেসলার এই গল্পের মাঝে অনেক অমিল খুজে পেয়েছেন এবং খুব সম্ভবত এই গল্পটি স্যাঙ্গার নিজের প্রচারনার জন্য বানিয়েছিলেন।

জন্ম নিরোধক আন্দোলন
স্যাঙ্কার ঙ্গার রচিত ১৯১৭ সালে প্রকাশিত বই ‘ফ্যামিলি লিমিটেশন’ বইয়ের পাতায় সার্ভিকাল ক্যাপের বর্ণনা। তদকালীন সময়ে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশে জন্ম নিরোধক প্রচলিত থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখনও তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ১৯১৫ সালে তিনি একটি ডাচ জন্ম নিরোধক ক্লিনিক পরিদর্শনকালে প্রথম ডায়াফ্রাম সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি অনুধাবন করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মনিরোধক ডুশের তুলনায় এই ডায়াফ্রাম অনেক বেশি কার্যকরী। সেই সময়ে ডায়াফ্রাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যাতো না। তাই স্যাঙার ও অন্যান্যরা ডায়াফ্রাম ইউরোপ থেকে আমদানি করা শুরু করেন, যা মার্কিন আইনের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি করছিলো।

১৯১৬ সালের ১৬ই অক্টোবর মারগারেট ব্রাউন্সভিলের কাছে, ব্রুকলিনে একটি পরিবার পরিকল্পনা ক্লিনিক খুলেন। এটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রথম কোনো চিকিতসালয়। অবশ্য ক্লিনিক খোলার ৯ দিনের মাথায় মারগারেট স্যাঙ্গার গ্রেফতার হন। জামিন নিয়ে বাড়ি ফিরতে তাকে ৫০০ ডলার জরিমানা দিতে হয়। এসত্ত্বেও ক্লিনিকটিতে স্যাঙ্গার নারীদের সেবা দিয়ে আসছিলেন। দ্বিতীয়বার পুলিশ আসলে মারগারেট স্যাঙ্গার এবং তার বোন, ইথেল বাইর্ন দুইজনই বেআইনিভাবে জন্মনিরোধক বস্তু বিতরণে গ্রেফতার হন। এইবেলা মারগারেট স্যাঙ্গারকে জনসম্মুখে গোলযোগ তৈরির দায়েও অভিযুক্ত করা হয়। ১৯১৭ সালে দুই বোনকে বিচারের আওতায় আনা হয়।

ইথেলকে অপরাধী সাব্যস্ত করে ত্রিশ দিনে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হলে, তিনি সেখানে অনশনে যান। সেখানে তাকে জোর করে খাইয়ে অনশন ভাঙানো হয়। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কোনো নারী অনশনকারী হিসেবে গণ্য হন। ১০ দিন পর মারগারেট স্যাঙ্গার আদালতে তার বোন ভবিষ্যতে কোন আইন ভাঙবেনা বলে প্রতিশ্রুতি দিলে ইথেল বাইর্নকে ক্ষমা ঘোষণআ করা হয়। অবশ্য মারগারেট তখনও অপরাধী হিসেবেই গ্রেফতার ছিলেন। তাকে দোষ স্বীকার করে ভবিষ্যতে কোনো আইন ভাঙবেন না কথা দেয়ার শর্তে লঘু শাস্তির প্রলোভন দেখানো হলে তিনি জানান, আজকের এই আইনকে আমি শ্রদ্ধা করতে পারছি না। এরপরে তাকে ত্রিশ দিনে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। ১৯১৮ সালে একটি আপীলের সূত্র ধরে বিচারক ফ্রেডেরিক ই ক্রেইন ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বড়ি বা অন্য সেবা গ্রহণকে আইনগত ভাবে সিদ্ধ ঘোষণা করেন।

মৃত্যু
মারগারেট স্যাঙ্গার ১৯৬৬ সালে আরিজোনার টুসানে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর এক বছর পর মার্কিন উচ্চ আদালত জনম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে সমগ্র দেশ জুড়ে আইনি স্বীকৃতি পায়। স্যাঙ্গারের মরদেহ নিউইয়র্কে সমাহিত করা হয়েছে।

 
Electronic Paper