ভাওয়ালে বন বিভাগের কর্মযজ্ঞ

ঢাকা, শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

ভাওয়ালে বন বিভাগের কর্মযজ্ঞ

বিবিধ ডেস্ক ১:৩৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০২০

print
ভাওয়ালে বন বিভাগের কর্মযজ্ঞ

গাজীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যর সঙ্গে মিশে আছে ভাওয়াল বন। গত দেড় দশক ধরে গাজীপুরে ক্রমবর্ধমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং ব্যাপকহারে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের ফলে চাপ বেড়েছে শাল পিয়ালের এই বনে। দেশে অত্যন্ত দখলপ্রবণ বনাঞ্চলের মধ্য গাজীপুরের বনাঞ্চল অন্যতম। তবে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর নেতৃত্বে বনভূমি রক্ষা, বনায়ন, জবরদখল প্রতিরোধ ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ টেকসই বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। গাজীপুরে বন বিভাগের কর্মযজ্ঞ, সাফল্য ও বহুমুখি প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরেছেন তানজেরুল ইসলাম

ভাওয়াল রেঞ্জের পরিচিতি
ভাওয়াল বন বা শালবন। দেশে গজারি বন নামেও খ্যাত। ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন গাজীপুর ভাওয়াল রেঞ্জ। চারটি বিট নিয়ে গঠিত ভাওয়াল রেঞ্জে বনভূমির পরিমাণ আট হাজার ২২২.৪১ একর। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দের সার্বিক দিক নির্দেশনায় বনভূমি ও বন্যপ্রাণী রক্ষাসহ বহুমুখি টেকসই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজল তালুকদার। গাজীপুর ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন মো. মাসুদ রানা।

ভাওয়াল বন রক্ষার চ্যালেঞ্জ
শিল্প অধুষ্যিত জেলা গাজীপুর। জেলায় একদিকে ক্রমবর্ধমান শিল্পের বিকাশ অন্যদিকে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলার অগণিত মানুষের বসবাস এই জেলাতে।
গাজীপুরে জনসংখ্যা এবং অবকাঠামো বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বন দখল প্রবণতা। জেলায় একদিকে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা, অন্যদিকে বহুমুখি সংকটে থাকা বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ে কর্মরতদের নিত্যদিন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির চারাগাছ রোপণের মাধ্যমে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ‘সুফল’ প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন করেছে বন অধিদফতরের মাঠ পর্যায়। তবে করোনা মহামারি উপেক্ষা করে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বন দখল প্রবণতা অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর কয়েকগুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বনভূমি জবরদখল প্রতিরোধ অভিযানে বন বিভাগে কর্মরতদের ওপর হামলার ঘটনা এখন খুব স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

গাজীপুরের বনভূমি ছয়টি রেঞ্জ বা অঞ্চলে বিভক্ত করে বন অধিদফতরের দুটি বিভাগের কর্মরতরা দায়িত্ব পালন করছেন। গাজীপুরে ঢাকা বন বিভাগের অধীন চারটি রেঞ্জ। অন্যদিকে, ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন দুটি রেঞ্জ। গাজীপুরে ছয়টি রেঞ্জের মধ্য ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন ভাওয়াল রেঞ্জ অত্যন্ত দখলপ্রবণ রেঞ্জ হিসেবে পরিচিত। গাজীপুর সদর উপজেলায় ভাওয়াল রেঞ্জাধীন বনাঞ্চলের দক্ষিণ দিক গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উত্তর দিকের শেষ সীমানা। রেঞ্জটি পূর্ব ও উত্তর দিকে গাজীপুর শ্রীপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকা। গাজীপুরে অগণিত ব্যক্তিমালিকানা জমির দাবিদারদের সঙ্গে বন বিভাগের ভূমি সংক্রান্ত আইনি জটিলতা দীর্ঘদিনের।

বিগত দিনে ভাওয়াল রেঞ্জাধীন বিভিন্ন বিট থেকে অগণিত রেকর্ড সংশোধনী মোকদ্দমা দায়ের হলেও অধিকাংশ মোকদ্দমাগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি। এ ছাড়া অগণিত উচ্ছেদ মোকদ্দমার ফাইল রয়েছে ধোঁয়াশায়। আদৌ এসব উচ্ছেদ মোকদ্দমাগুলোর নিষ্পত্তি হবে কি না এমন আশঙ্কা জনমনে। ফলাফলে, ভূমি সংক্রান্ত বহুমুখি জটিলতায় দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়ে অনেকেই বন মামলা উপেক্ষা করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। পরিমাণে জবরদখলে বাধা দিতে গেলে কখনও বন বিভাগে কর্মরতদের ওপর হামলা, কখনও বিজ্ঞ আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা, কখনো আবার থানায় জিডি এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের ঘটনা অহরহ ঘটছে।

আধুনিকতার ছোঁয়া ভাওয়াল রেঞ্জে
ভাওয়াল রেঞ্জাধীন প্রতিটি বিট কর্মকর্তার কার্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ, কম্পিউটার এবং প্রিন্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেঞ্জের চারটি বিট অফিসের মধ্য দুটি বিট অফিসে রয়েছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি ফটোকপি করার ব্যবস্থা। এ ছাড়া ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে একটি অত্যাধুনিক ডিজিটাল ফটোকপি মেশিন। ভাওয়াল রেঞ্জের প্রতিটি বিট অফিসে কর্মরত চৌকষ ও মেধাবী স্টাফদের দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয়েছে।

এতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে যেমন গতি পেয়েছে তেমনি গোপনিয়তা রক্ষার পাশাপাশি সরকারি অর্থ অপচয় রোধ হয়েছে। বর্তমান বিভাগীয় বন কর্মকর্তার আমলে গত ৮-৯ মার্চ সাইট স্পেসিস ফরেস্ট রেস্টোরেশন প্লানিং বিষয়ক দুই দিনের প্রশিক্ষণ, গত বছরের ২৮ নভেম্বর ও ৪ ডিসেম্বর দিনব্যাপী জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল কর্মপরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছর স্মার্ট পেট্রোলিং বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করেন ভাওয়াল রেঞ্জের কর্মকর্তা ও স্টাফরা। এ ছাড়া শুকনো মৌসুমে বনে অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ ও অগ্নি নির্বাপন কার্যক্রম বিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য ইতিমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিভাগটি।

দখলপ্রবণ বিট ভবানীপুর
ভাওয়াল রেঞ্জে বনভূমি দখলপ্রবণ বিটের মধ্য শীর্ষে ভবানীপুর বিট। বহু বছর ধরে চলমান ভূমি সংক্রান্ত আইনি জটিলতার নিরসন না হওয়ায় পরিস্থিতি বর্তমানে জটিল আকার ধারণ করেছে। ভাওয়াল রেঞ্জের চারটি বিটের মধ্য সবচাইতে বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও রিসোর্ট ভবানীপুর বিটের বনাঞ্চল সংলগ্ন। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত অগণিত শ্রমিক। সঙ্গত কারণে, ভবানীপুরে বিশাল জনসংখ্যার বাসস্থান নিশ্চিতে বেড়েছে জমির দাম। এতে অনেকের নজর পড়েছে শালবনে। ভবানীপুর বিট কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন মো. নাজিম উদ্দিন।

ভবানীপুর বিটে বনভূমির পরিমাণ ২৭১১.৯৬ একর। ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ আর্থিক সনে ভবানীপুর বিটের তিন নম্বর মহনা ভবানীপুর মৌজা ও চার নম্বর বারুইপাড়া মৌজার বিভিন্ন এলাকায় সর্বমোট ২৯টি বন দখলের ঘটনা প্রতিরোধ করেছে সংশ্লিষ্ট বিট অফিস। এ সময় বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে উদ্ধার হয়েছে ১.৪৫ একর বনভূমি। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ আর্থিক সনে ভবানীপুর বিটের বিভিন্ন এলাকায় ০.৬০ ও ০.৮৫ একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত বনভূমি বিগত দিনে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গত দুই অর্থ বছরে চার নম্বর বারুইপাড়া মৌজার ০৩ ও ২৭৯ নম্বর সিএস দাগে সর্বমোট ৩.৭০ একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। ভবানীপুরে বিগত দুই অর্থ বছরে উদ্ধার হওয়া বনভূমির মূল্য অন্তত ১৫ কোটি টাকা। ২০২০-২১ আর্থিক সনে ভবানীপুরে তিন হেক্টরে সুফল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নার্সারিতে চারা উত্তোলন করা হয়েছে।

গত দুই অর্থ বছরে জবরদখল প্রতিরোধে বনভূমিতে ৬০০ ফুট কাটাতারের বেড়া ও বনের সীমানা চিহ্নিত করতে ১৮৩টি ‘এফডি’ লেখা সম্বলিত আরসিসি পিলার স্থাপন করা হয়েছে। ভাওয়াল রেঞ্জের চারটি বিটের মধ্য সর্বোচ্চ সংখ্যক পিওআর মামলা দায়ের হয়েছে ভবানীপুর বিট থেকে। ভবানীপুর বিট থেকে ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ আর্থিক সনে গাজীপুর বন আদালতে সর্বমোট ৭০টি মামলা দায়ের হয়েছে। ভবানীপুর বিটের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাব প্রেরিত হয়েছে দুইটি এবং একটি ভায়োলেশন মোকদ্দমাসহ ৭৬টি রেকর্ড সংশোধনী মোকদ্দমা দায়ের হয়েছে।

বিগত দুই আর্থিক সনে ভবানীপুর বিটে আকাশমণি বাগানে ১৫৫ জন উপকারভোগী নিয়োগ করা হয়েছে। ওই দুই আর্থিক সনে অনুন্নয়ন খাতে সৃজিত বাগানের পরিমাণ ১৪৫.৬৯ একর। ভবানীপুর বিটে জনবল সংখ্যা আটজন। সরকারি মোটরসাইকেল সংখ্যা মাত্র একটি। বিগত ২০১৯-২০ আর্থিক সনে ভবানীপুর বিটের চার নম্বর বারুইপাড়া মৌজায় অর্ধশত বছর ধরে কৃষি কাজে জবরদখল করে রাখা বনভূমি উদ্ধার করে বাগান সৃজিত হয়েছে। একই মৌজায় ঘরবাড়ি, বাঁশের বেড়া ও চাষাবাদে জবরদখল করে রাখা তিন একর বনভূমি উদ্ধার করে আকাশমণি বাগান সৃজিত হয়েছে। পরবর্তীতে জবরদখরকারীদের ওই বাগানগুলোর উপকারভোগী হিসেবে নিয়োগ করা হয়।

অবকাঠামো উন্নয়নে মডেল রেঞ্জ
জরাজীর্ণ দুটি টিনশেডের স্টাফ ব্যারাকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে ভাওয়াল রেঞ্জের স্টাফদের। অথচ বিগত বছরগুলোতে ভাওয়াল রেঞ্জে স্টাফ ব্যারাক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বর্তমান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই বন সংরক্ষকের নির্দেশে ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় এবং রেঞ্জাধীন বিভিন্ন বিট অফিস ভবন সংস্কারের উদ্যোগ নেন। এর পাশাপাশি ভাওয়াল রেঞ্জে একটি আধুনিক ও টেকসই স্টাফ ব্যারাক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের পশ্চিম দিকে তিন কক্ষ বিশিষ্ট একটি পাকা দালান (স্টাফ ব্যারাক) নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল টেক ইন্টারন্যাশনাল ব্যারাকটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। চলতি মাস থেকে আধুনিক ও টেকসই নবনির্মিত ব্যারাকটিতে স্টাফরা বসবাসের সুযোগ পাবেন।

ব্যারাকের মেঝেতে উন্নয়তমানের টাইলস স্থাপন করা হয়েছে। আধুনিক সাব-মারর্সেবল পাম্পের মাধ্যমে ব্যারাকে সাপ্লাই পানির ব্যবস্থা, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ব্যারাকটি নির্মাণে গুণগত মানসম্মত নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যারাকটি নির্মাণ শুরু থেকেই নির্মান কাজ তদারকি করছেন ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা। এ ছাড়া সম্প্রতি ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে অবশিষ্ট ৮০ ফুট দেয়াল নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। এ ছাড়া ভাওয়াল রেঞ্জের বিকেবাড়ী বিট অফিস ভবন ও বিট কর্মকর্তার বাসভবন নির্মাণের লক্ষে প্রাথমিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। বারুইপাড়া বিট কর্মকর্তার জন্য বাসভবন ও ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার জন্য বাসভবনসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে বহুমুখি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিভাগটি।

বেহাত বন উদ্ধারে বারুইপাড়া বিট
২২৪৬.০২ একর বনভূমি নিয়ে ভাওয়াল রেঞ্জের বারুইপাড়া বিট অফিসের কার্যক্রম চলছে। গত এক বছরে বারুইপাড়া বিটে রেকর্ড পরিমাণ বেহাত বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। বারুইপাড়া বিট কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন হোসেন আহমেদ। বিট অফিসে জনবল আটজন। নিরাপত্তায় সরকারি অস্ত্র নেই। সরকারি মোটরসাইকেল সংখ্যা মাত্র একটি। বিগত দিনে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজল তালুকদারের নির্দেশনা এবং ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় জবরদখল প্রতিরোধ অভিযান চালিয়ে ১১ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। চার নম্বর বারুইপাড়া মৌজার ২৯৭৪, ১৫১৫, ১৭১১ ও ২৫৩২ নম্বর সিএস দাগে উদ্ধার হওয়া বনভূমির মূল্য অন্তত ৩০ লাখ টাকা। গত এক বছরে বারুইপাড়া বিটের ২৯৭৩ নম্বর সিএস দাগে দুই শতাংশ বনভূমিতে নির্মাণাধীন দুটি দোকানঘর উচ্ছেদ করে বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।

ওই দুই শতাংশ বনভূমির মূল্য অন্তত ১০ লাখ টাকা। বারুইপাড়া বিটে গত এক বছরে ২২০৪ ও ২৩৭৩ নম্বর সিএস দাগে ২২০ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত বনভূমির মূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৪ নম্বর বারুইপাড়া মৌজার ২৯৪৮ নম্বর সিএস দাগে এক একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত বনভূমির মূল্য অন্তত দেড় কোটি টাকা। বিগত দিনে ওই বনভূমিতে চাষাবাদ হতো। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থ বছরে বারুইপাড়া বিটে সুফল কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে নার্সারিতে ২২ প্রজাতির চারা তৈরি করা হয়েছে। দখলপ্রবণ বনভূমি রক্ষার্থে বিভিন্ন স্থানে গত এক বছরে ৭৮৯ ফুট কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে।

বনভূমির সীমানা চিহ্নিত করতে আরসিসি পিলার স্থাপিত হয়েছে ৪১টি। বিগত ২০০৮ সাল থেকে অদ্যবদি বারুইপাড়া বিট থেকে গাজীপুর বন আদালতে সর্বমোট ৬৮টি পিওআর মামলা দায়ের হয়েছে। গত এক বছরে উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের হয়েছে একটি এবং গত দুই বছরে রেকর্ড সংশোধনী মোকদ্দমা দায়ের হয়েছে ২২টি। বারুইপাড়া বিটে শাল কপিচ ম্যানেজমেন্টের আওতায় উপকারভোগী সংখ্যা ১৮৭ জন। আকাশমণি বাগানে উপকারভোগী সংখ্যা ৩৫ জন। এ ছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় আবর্তে আকাশমণি বাগানে ১৪৪ জন এবং বাঁশ বাগানের উপকারভোগী সংখ্যা দুজন।

সবুজে সেজেছে বিকেবাড়ী ও পশ্চিম বিট
১০১২.১১ একর বনভূমিতে চলছে বিকেবাড়ী বিটের কার্যক্রম। বিকেবাড়ী বিটের বিকেবাড়ী মৌজার ৭৫৪ নম্বর সিএস দাগে বিগত দিনে উচ্ছেদ মোকদ্দমার মাধ্যমে একটি পিকনিক স্পট থেকে ১৮ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার হয়। উদ্ধারকৃত বনভূমির মূল্য অন্তত ৭০ লাখ টাকা। ঢাকা বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজল তালুকদারের নির্দেশনায় উচ্ছেদ মোকদ্দমাটি নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বিকেবাড়ী বিট কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বিকেবাড়ী বিটে ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ আর্থিক সনে বিকেবাড়ী মৌজার ৭৩৪ এবং ৭৪৯ নম্বর সিএস দাগে সর্বমোট ৩.৫৩ একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তির জবরদখল থেকে উদ্ধার হয়েছে।

উদ্ধারকৃত বনভূমির আনুমানিক মূল্য অন্তত ছয় কোটি টাকা। উদ্ধার হওয়া বনভূমি বিগত দিনে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিকেবাড়ী বিটে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ আর্থিক সনে বিভিন্ন স্থানে জবরদখল ঠেকাতে ৬৩০ ফুট কাটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। বনভূমির সীমানা চিহ্নিত করতে সর্বমোট ৭৪টি ‘এফডি’ লেখা সম্বলিত আরসিসি পিলার স্থাপন করা হয়েছে। বিকেবাড়ী বিট থেকে গত দুুই আর্থিক সনে পিওআর মামলা দায়ের হয়েছে ৪টি। এ ছাড়া রেকর্ড সংশোধনী মোকদ্দমা তিনটি এবং একটি উচ্ছেদ মোকদ্দমা দায়ের হয়েছে। গত দুই আর্থিক সনে বিকেবাড়ী বিটে আকাশমণি বাগানে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়েছে ৪৪ জনকে। বিকেবাড়ী বিটের জনবল পাঁচ জন। সরকারি মোটরসাইকেল মাত্র একটি।

অন্যদিকে, জনবল সংকট থাকার কারণে বিকেবাড়ী বিট কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের দায়িত্ব পালন করছেন। রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটে বনভূমির পরিমাণ ২২৫২.৩২ একর। গত এক বছরে রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটের ১৭১১ নম্বর সিএস দাগের বনভূমিতে নির্মাণাধীন ছোট-বড় ছয়টি টিনশেড ও আধাপাকা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি কৃষি জমি হসেবে ব্যবহৃত দুই একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত বনভূমির আনুমানিক মূল্য অন্তত ছয় কোটি টাকা। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে এবং ভাওয়াল রেঞ্জ কর্মকর্তার নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযানগুলো পরিচালিত হয়। এ ছাড়া ওই বিটের ১৬০২, ১০৯৬, ২০৯০ এবং ২০৯৮ নম্বর সিএস দাগে ৬.৯০ একর বেহাত বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। ওই বনভূমি বিগত দিনে কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সস্প্রতি চার নম্বর বারুইপাড়া মৌজার ২০০৮ নম্বর সিএস দাগে প্রায় এক একর বনভূমি জবরদখর থেকে উদ্ধার হয়েছে।

উদ্ধারকৃত বনভূমিতে থাকা তিনটি টিনসেড ঘর উচ্ছেদ করা হয়। রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটে কৃষি কাজে ব্যবহৃত হওয়া বিভিন্ন ব্যক্তির জবরদখল থেকে উদ্ধারকৃত বনভূমির মূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে দখলপ্রবণ বনভূমিতে জবরদখল ঠেকাতে কাটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে ১২০ ফুট। বনের সীমানা চিহ্নিত করতে আরসিসি পিলার স্থাপিত হয়েছে ২৯টি। ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ আর্থিক সনে রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিট থেকে পিওআর মামলা দায়ের হয়েছে সাতটি। ওই দুই অর্থ বছরে রেকর্ড সংশোধনী মোকদ্দমা দায়ের হয়েছে দুটি। ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ আর্থিক সনে রাজেন্দ্রপুর পশ্চিম বিটে সর্বমোট ৩৮ জনকে আকাশমণি বাগানের উপকারভোগী করা হয়েছে।

৫২ কোটি টাকার বনভূমি উদ্ধার
ভাওয়াল রেঞ্জাধীন চারটি বিটে ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ আর্থিক সনে সর্বমোট ২২.৭৭ একর বনভূমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবরদখল থেকে উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। ওই দুই অর্থ বছরে উচ্ছেদ করা হয় বিভিন্ন এলাকায় বনে গড়ে ওঠা টিনসেড ও আধাপাকা বাড়ি এবং দোকানপাটসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। এসব উচ্ছেদ অভিযানে উদ্ধার হয় ৩.৭৬ একর বনভূমি। বিকেবাড়ী বিটের বিকেবাড়ী মৌজার ৭৫৪ নম্বর সিএস দাগে উচ্ছেদ মোকদ্দমার নিষ্পত্তির মাধ্যমে একটি পিকনিক স্পট থেকে ১৮ শতাংশ বনভূমি উদ্ধার হয়। উদ্ধারকৃত বনভূমির মূল্য অন্তত ৭০ লাখ টাকা। এ ছাড়া গত দুই আর্থিক সনে ভাওয়াল রেঞ্জাধীন বনাঞ্চলে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা সর্বমোট ১৯.০১ একর বনভূমি উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত বনভূমির বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ৫২ কোটি টাকার।