বীমা শিল্পের পথিকৃৎ

ঢাকা, সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০২২ | ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বীমা শিল্পের পথিকৃৎ

আলতাফ হোসেন
🕐 ৪:০১ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০২২

বীমা শিল্পের পথিকৃৎ

খোদা বকস ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট বাঙালি জীবন বীমা বিক্রয়কর্মী এবং মানবতাবাদী। চার দশক ধরে তিনি সমগ্র অঞ্চল জুড়ে বীমা শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই তিন পৃথক দেশে ব্যবসায় তার চিহ্ন রেখে গেছেন। তিনি নিজেকে স্বনামধন্য বীমা বিক্রয়কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বকস ছিলেন বাংলাদেশে জীবন বীমা শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও বিকাশের পথিকৃৎ। গুণী এই ব্যক্তিকে নিয়ে আজকের আয়োজন। গ্রন্থণা করেছেন খোলা কাগজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন

খোদা বকস ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট বাঙালি জীবন বীমা বিক্রয়কর্মী এবং মানবতাবাদী। চার দশক ধরে তিনি সমগ্র অঞ্চল জুড়ে বীমা শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এই তিন পৃথক দেশে ব্যবসায় তার চিহ্ন রেখে গেছেন। তিনি নিজেকে স্বনামধন্য বীমা বিক্রয়কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বকস ছিলেন বাংলাদেশে জীবন বীমা শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও বিকাশের পথিকৃৎ। খোদা বকস ছিলেন জীবনবীমা কর্পোরেশনের প্রথম ডিরেক্টর। তার নেতৃত্ব গুণের জন্য তিনি বরাবর তার সমকক্ষদের মধ্যে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। খোদা বকস সহকর্মীদের নির্ভরতা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন তার সৎ, সহজ, মার্জিত, মধুর, বিশ্বস্ত, খোলামেলা আচরণ দিয়ে, যে আচরণ তিনি করতেন তার অধস্তনদের সঙ্গেও।

কাজের ব্যাপারে, সংশ্লিষ্ট সহকর্মীদের ওপর তিনি পরিপূর্ণ বিশ্বাসে সব দায়িত্ব দিয়ে দিতেন। তাদের নিষ্ঠা ও যোগ্যতাকে সবসময় সম্মান দিতেন-এভাবেই তিনি এদের মধ্যে আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছিলেন। মানুষকে জয় করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন মাস্টার। বীমা ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে ছাড়া পাওয়া পরে খোদা বখস তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ছোটখাটো গড়নের মানুষ ছিলেন খোদা বকস। কিন্তু বীমাকে পেশা হিসেবে নিয়ে তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন যেটা যে কোনো উদ্যমী কর্মঅন্তপ্রাণ ব্যক্তির আরাধ্য হতে পারে। তার কর্মসাফল্য শিখরস্পর্শী হলেও মানুষ হিসাবে তিনি রয়ে গিয়েছিলেন সরলতা ও আন্তরিকতার প্রতিমূর্তি স্বরূপ।

জনসেবায়ও খুদা বখশের অবদান অপরীসিম। তিনি নিজ গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তার প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলের অনেক যুবককে বীমা শিল্পের চাকরিতে নিয়োগ করা হয়। এছাড়াও ব্যাক্তিগত ভাবে আত্মীয়স্বজন, সহকর্মীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছন। ঢাকার দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার ‘জীবন বীমা টাওয়ার’-এর জন্য জমি খোদা বখসই খরিদ করেছিলেন। প্রকল্পটি তখনকার দিনেই ছিল সোয়া চার কোটি টাকার। ২৪ তলা ভবনের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং নানান পরিকল্পনা ছিল তাতে। তিনি মালিক পক্ষকে বুঝিয়ে রাজি করাতে পেরেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের লোকেরা অন্যান্য বিষয়ের মত বীমার ক্ষেত্রেও যেন নিজেদেরকে বঞ্চিত মনে না করে সেজন্য দেশের পূর্বাঞ্চলেও কোম্পানির স্থায়ী সম্পদ স্থাপন করতে হবে।

প্রাথমিক ও শিক্ষা জীবন
বকস ব্রিটিশ ভারতের অধীনে পূর্ববঙ্গের শরীয়তপুর জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে দামোদ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। সোনাবউদ্দিন হাওলাদার এবং আরজুতা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড়। শৈশবে, বুকস বন্ধুত্বপূর্ণ, শ্রদ্ধাশীল, ধার্মিক, উদার, দয়ালু এবং নীতিবান হিসাবে পরিচিত ছিলেন। দারিদ্র্য এবং দরিদ্রতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি তার গ্রামে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, বকস তার চেয়ে কম ভাগ্যবানদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন। গ্রেড স্কুলে, তিনি ক্লাসের জন্য একই গণিতের পাঠ্যপুস্তক পুনরায় ক্রয় করেছিলেন সহপাঠীদের দেওয়ার জন্য যারা তাদের নিজস্ব বই বহন করতে পারে না। তিনি মেধাবী ছাত্র হিসাবে স্বীকৃত হন এবং স্কুলের সকল স্তরে বৃত্তি লাভ করেন। প্রাইমারি থেকে মিডল স্কুল পর্যন্ত ক্লাসে তিনি প্রথম এবং হাই স্কুলে প্রথম বা দ্বিতীয় হন। তিনি সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলা তার ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। তার দল সফল ছিল, তার মহকুমার বাইরে প্রতিযোগিতা করে এবং অনেক ট্রফি জিতেছিল। উপরন্তু, বুকশ একটি বুদ্ধিমান মন এবং ব্যতিক্রমী আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতার অধিকারী ছিলেন।

বকস ১৯২৯ সালে সিমাচরণ এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন থেকে গণিতে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি কলকাতায় যান এবং মৌলানা আজাদ কলেজে দুই বছর অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৩২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি কলকাতার নামীদামী প্রেসিডেন্সি কলেজে দুই বছর অধ্যয়ন করেন, স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য কাজ করেন। পুরো কলেজ জুড়ে, তিনি হাবিবুর রহমানের পরিবারের সাথে চড়েছিলেন, একটি বাণিজ্যিক সমুদ্র লাইনারের ক্যাপ্টেন, যিনি প্রায়শই বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি, বকশ রহমানের পারিবারিক বিষয় এবং তার শয্যাশায়ী স্ত্রী এবং দুই স্কুলগামী সন্তানকে পরিবারের একজন অভিভাবকের মতো দেখাশোনা করতেন। তবে স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জটিলতার কারণে তিনি ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। পরবর্তীকালে, বক্স কলেজে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে একটি খণ্ডকালীন চাকরি গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন
খোদা বকস ৩০ ডিসেম্বর ১৯৩৯ জোবেদা খাতুনকে বিয়ে করেন। তাদের ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে। বকস তার পরিবারের প্রধান হিসাবে তিনি সকলের প্রতি দায়িত্বশীল এবং স্নেহশীল ছিলেন। তিনি তার সন্তানদের একজন বন্ধু ছিলেন এবং তিনি তাদের সৎ জীবনযাপন করার জন্য, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, এবং কারো সাথে রাগ না করার জন্য তাদের নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি তার হৃদয়, আত্মা এবং অর্থকে বীমার উন্নয়নে লাগান। বকস তার পিতামাতা, গুরুজন এবং শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি ছিলেন স্নেহময় পিতা এবং একজন নম্র ব্যক্তি। তিনি সারাজীবন মানুষকে সাহায্য করেছেন, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। তার আয়ের বেশিরভাগই তার পরিচিতদের বিনোদন এবং দরিদ্র ও নিঃস্বদের সাহায্য করার জন্য ব্যয় করা হয়েছিল। তিনি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় অর্থ সাহায্য দিয়েছেন। নিজ বাড়িতে একটি বিনামূল্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য অর্থ প্রদান করেন এবং অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা ব্যয় বহন করেন। উপরন্তু, তিনি অনেক বিধবা, অনাথ, এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রদের জন্য আর্থিক সাহায্যের উৎস ছিলেন যারা স্কুলের ফি বহন করতে পারত না।

কর্মজীবন
কর্মজীবনের প্রথম ১৯৩৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পাঠাগারিক হিসাবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ওরিয়েন্টাল গভর্ণমেন্ট সিকিউরিটি লাইফ ইন্দুরেন্স কোম্পানির কর্মচারী হিসাবে কাজ শুরু করেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি ১৭ বছর চাকরি করেন। একজন মুসলমান হিসাবে তিনি প্রথম কোম্পানির ফিল্ড এক্সিকিউটিভ পদে নিযুক্ত হন। দক্ষতার পরিচয় দেয়ায় কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার পদে উন্নীত হন। এ সময় সাবেক পুর্ব পাকিস্তানে বৃহত্তর বিনিয়োগ কার্যে মনোনিবেশ। করায় পাকিস্তান ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সহিত তার বিরোধ বাধে ফলে ১৯৬৯ সালের প্রথম। দিকে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে ফেডারেল লাইফ ইন্দুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি বীমা প্রতিষ্ঠান চালু করেন ও তার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সাবেক কেন্দ্রীয় সরকার তাকে পাকিস্তান বীমা কর্পোরেশনের ডিরেক্টর পদে নিয়োগ দান করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ব বীমা শিল্প সংস্থার সার্বিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। ১৯৭২ সালে সুরমা জীবন বীমা সংস্থা গঠিত হওয়ার সময় তিনি তার চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ১৪ মে সুরমা ও রুপসা জীবন বীমা দুটির সমন্বয়ে আজকের জীবনবীমা কর্পোরেশন। খুদা বখস নবগঠিত জীবনবীমা কর্পোরেশনের প্রথম ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদ অলংকৃত করেন।

অস্থায়ী কাজ অপছন্দ
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ পদে খোদা বকস-এর নাম প্রস্তাবিত হয়। রাজনৈতিক গুরুত্বের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানীদের একজন হিসাবে খোদা বকস-এর নাম প্রস্তাব আইয়ুব খানের দৃষ্টিতে মনে হয় ঠিকই ছিল। কেননা একজন শীর্ষস্থানীয় বীমাবিদ হিসাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুই প্রান্তেই খোদা বকস-এর পরিচিতি ছিল। সার্বিক বিবেচনায় মন্ত্রীর পদের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিই বটে। কিন্তু হয় নি! খোদা বকস মন্ত্রিত্বকে বরণ করেননি। প্রেসিডেন্টকে তিনি সবিনয়ে বলেন, ‘স্যার, আপনি আমাকে এতো বড় এক সম্মান দিচ্ছেন। আমি আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু আমি সবিনয়ে একটি কথাই শুধু বলতে চাইছি-এই কাজটা আমার জন্য নয়। আমি কোনো রাজনীতির লোক নই। তাছাড়া যদি আপনি কিছু মনে না করেন স্যার, মন্ত্রিত্বের কাজ অস্থায়ী। অস্থায়ী কাজ আমি সারা জীবন অপছন্দ করে এসেছি।’ তবে যোগ্য লোক হিসেবে তিনি তার এক বন্ধুর রাজনীতিবিদ ওয়াহিদুজ্জামান-এর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরে ওনাকেই প্রেসিডেন্ট বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন।

যেমন মানুষ ছিলেন
সেলস কর্মীদের প্রতি খোদা বকস-এর দরদী ব্যবহার ছিল অনবদ্য। দলগত ও ব্যক্তিগতভাবে ফিল্ড সদস্যদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করার যে প্রথাগত ও প্রথাবহির্ভূত রীতি ছিল খোদা বকস তার সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন তার নিজস্ব কিছু মৌলিক সুচিন্তিত পদ্ধতি-প্রকরণ, যার মধ্যে ছিল-অনুপ্রাণিত করা, স্বীকৃতি দেওয়া এবং কর্মদক্ষতায় অধিকতর সাফল্যকে উদযাপন করা।

বাইরে সফরে গেলে তিনি প্রত্যেক বিক্রয়কর্মীকে টেলিফোন করে বা চিঠি পাঠিয়ে কাজে কৃতিত্বের জন্য অভিনন্দিত করতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টেলিগ্রাম পাঠাতেন প্রতিটি কর্মীর বাড়িতে, তার অসাধারণ কর্মদক্ষতার প্রশংসা ও স্বীকৃতি জানিয়ে। এই টেলিগ্রামগুলো বৈদ্যুতিক উদ্দীপনার মত প্রভাব ফেলত, পরিবারের লোকেদের কাছে সেই ফিল্ডকর্মীর ভাবমূর্তি দারুণভাবে বেড়ে যেত। ঘটনা এমনই ছিল যে, সেই সময়কালে কোন কর্মীর বাড়ির দরজায় ডাকপিওনের টোকা পড়লে, বিশেষত রাত্রিতে, সেটা এক গুরুত্বপূর্ণ বা সিরিয়াস ঘটনা বলে মনে করা হত। সেই পরিবার ও আশেপাশের প্রতিবেশীরাও ধরে নিতেন যে, নিশ্চয়ই কোন মূল্যবান সংবাদ এসে পৌঁছেছে। আশ্চর্য রকম স্মৃতিশক্তি ছিল খোদা বকস-এর। সমস্ত ফিল্ড অফিসার, কার্যনির্বাহক এবং কর্মীসদস্যদের নাম মনে রাখতেন।

বিভাগীয় সহকর্মীদের পারিবারিক অবস্থা, আবেগের ধরন, দক্ষতা, দুর্বলতা এবং চাহিদা সম্পর্কে নিজেকে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রাখতেন। তিনি সরাসরি কর্মীদের বাড়িতে যেতেন, পরিবারের সঙ্গে আলাপ করতেন তাদের অনুভূতি মূল্যবোধ, স্বপ্ন প্রত্যাশা এবং শঙ্কা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য। তিনি উৎসাহ দিতেন, পরামর্শ দিতেন, উন্নতমানের জীবনযাপনের জন্য এবং ছেলেমেয়ে ও নির্ভরশীলদের ভালো রকম লেখাপড়া শেখার জন্য। যখনই কোন সহকর্মী কোন নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করাতে সুপারিশের প্রয়োজন প্রকাশ করত খোদা বকস নিশ্চিতভাবে সাহায্যের হাত এমন আন্তরিকতার সঙ্গে বাড়িয়ে দিতেন যেন তিনি সেই পরিবারের অভিভাবক।

জীবন বীমা বৃদ্ধি এবং সম্প্রসারণে ভূমিকা
ইএফইউ-এর জীবন বিভাগের একজন নেতা হিসেবে বকস পাকিস্তান জুড়ে ভ্রমণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানে এক বছরে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় থাকার সময় তিনি অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে ব্যবসার প্রসার ও উন্নয়নের জন্য তার মাঠ বাহিনীকে উৎসাহিত করেন। যদিও তার স্বপ্ন ছিল প্রতিটি বাড়িতে জীবন বীমা ছড়িয়ে দেওয়া। নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সংগঠন, ব্যবস্থাপনা, অনুপ্রেরণা এবং দল গঠনে এই সময়ে একটি চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা পালন করে। বকস শুরুতে ব্যক্তির গুণাবলী উপলব্ধি করতে পারতেন। জানতেন কীভাবে একটি অবস্থানে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে, তিনি বীমা পেশায় অনেক শিক্ষিত বাঙালিসহ আরও বিক্রয়কর্মী নিয়োগ করেছিলেন।

সরকারি কাজে তিনি প্রায়ই জেলা শহরে যেতেন। সেখান থেকে তিনি অনেককে বীমা ব্যবসায় নিয়ে যান। বীমা পেশাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বকসের অনুপ্রেরণা সাধারণ বিপণনকারীদের জীবন পরিবর্তন করতে সাহায্য করেছিল। জীবন বীমা পলিসি বিক্রি করে তারা বেশি অর্থ উপার্জন করেছে। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, জীবনযাত্রার মান পরিবর্তিত হয়েছে এবং তারা গাড়ি, বাড়ি এবং শহরের ধনী অংশে যেতে সক্ষম হয়েছে।

বকস সততা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং সংগঠিত দক্ষতা ব্যবহার করেছিলেন। সমগ্র অঞ্চল জুড়ে জীবন বীমা ব্যবসা সম্প্রসারণে তার বিপণন দলকে নেতৃত্ব দেন। সেই যুগে, সমস্ত বীমা নথি ইংরেজিতে ছিল। মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসার ফলে, বকস বীমা শিল্পের সাথে সম্পর্কিত সমস্ত কাগজপত্রকে বাংলায় অনুবাদ করতে সাহায্য করেছিলেন, যার মধ্যে বুকলেট এবং প্রিমিয়াম রেকর্ড রয়েছে।

বীমাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেন। বীমা শিল্পে তার আগে যে কারোর চেয়ে বেশি বাঙ্গালী লোক নিয়োগ করার কৃতিত্ব ছিল তার। ১৯৫১ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত, জীবন বীমা পলিসিধারীদের সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি। বীমা শিল্পের এই বিকাশ সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। জীবন বীমা শিল্প দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে অন্তর্নিহিত ধর্মীয় বিশ্বাসকে অতিক্রম করে।

জনসংযোগে ভূমিকা
বকস বিশ্বাস করতেন ব্যবসায় সফল কর্মজীবনের চাবিকাঠি হল ব্যক্তিগত স্তরে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। তার জোরালো জনসংযোগ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি উচ্চ-পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, বীমা নির্বাহী, শিল্পপতি, পেশাদার, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং অন্যান্য অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে সংযুক্ত হন। তার বন্ধু ও পরিচিতির বৃত্ত পাকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তিনি শুধু ঢাকা এবং চট্টগ্রাম নয়, করাচি, লাহোর এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য শহরেও বড় হোটেলে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। বকস দেশের উভয় অংশে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হওয়ায় ব্যক্তিগত এবং সরকারি উভয় ক্ষেত্রেই প্রশংসিত হন। সবাই তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তার মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসার কারণে, প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের (বাংলা নববর্ষ) প্রথম দিনে তিনি তার ঢাকা বাসভবনে ভিআইপি এবং সাংবাদিকদের মধ্যাহ্নভোজের জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন যেখানে শুধুমাত্র বাংলা খাবার পরিবেশন করা হত। তিনি একজন জনপ্রিয় রোটারিয়ান ছিলেন।

প্রেরণাদাতা
বকস তরুণদের বীমা পেশায় যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, তাদের শেখান কিভাবে কিভাবে এই মহৎ, সেবা-ভিত্তিক পেশায় মাঠকর্মীরা তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে। ছাত্র বা শিক্ষক নিয়োগের অংশ হিসাবে, তিনি কখনও কখনও তাদের অগ্রিম হিসাবে বা একটি গাড়ি কেনার জন্য একটি বড় অঙ্কের অর্থ দিতেন। বিমা ব্যবসার প্রতি মানুষের মধ্যে আগ্রহ জাগানোর জন্য তিনি মানুষের সাথে আচরণ করার ক্ষেত্রে মানবিক আচরণে গুরুত্ব দিতেন। তিনি যত্ন সহকারে নিরীক্ষণ এবং প্রতিটি বিক্রয়কর্মীর বাজেটের চাহিদা পূরণ করতেন। বুকস একজন মানবতাবাদী ছিলেন এবং তার জনগণের প্রতি তার সহানুভূতি ও সহানুভূতি ছিল। মানুষ প্রায় তার ব্যক্তিত্ব, উদারতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ প্রকৃতির কারণে তাকে সম্মান দিতেন। তিনি ছিলেন প্রত্যেক মাঠকর্মীর ব্যক্তিগত অনুরাগী।

পুরস্কার
১৯৬৩ সালে পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনে ইএফইউ থেকে স্বর্ণপদক লাভ, ১৯৬৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তান লাহোরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পুরস্কারের জন্য লাহোর শালিমার গার্ডেনের সিলভার রেপ্লিকা পান, ২০০৮ সালে ব্যাংক ও বীমা ম্যাগাজিন (২৮ ফেব্রুয়ারি, ব্যাংক-বিমা পুরস্কার ২০০৭) দ্বারা বীমা শিল্পে (মরণোত্তর) সেরা অবদানের জন্য বুকশকে পুরস্কৃত করা হয়, ২০০৮ সালে, বকশ বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এক্সিকিউটিভ ক্লাব কর্তৃক বীমা পদক ২০০৮ (মরণোত্তর) ভূষিত হন।

 
Electronic Paper