জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকারহীনতার অভিজ্ঞতা, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক শূন্যতার পর আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নতুন করে আলোচনায় মুখর দেশের তরুণ সমাজ। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রাজিউল ইসলাম শান্ত।
‘ভোটাধিকার ফিরে পাওয়াই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন’
হাসিবুল হাসান, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা নির্বাচনকে আরও অর্থবহ করে তুলবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমার প্রধান চাওয়া একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ভোটাররা যেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাদের পছন্দের সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলের প্রহসনের নির্বাচন ছাপিয়ে এবারের নির্বাচন একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে বলে আমি আশা রাখছি। আমরা চাই এমন একটি সরকার ব্যবস্থা, যেখানে দুর্নীতি, গুম, খুন ও অন্যায়ের কোনো স্থান থাকবে না। মানুষের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, সবাই সমান অধিকার পাবে। একই সঙ্গে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা থাকবে, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির নামে যেন অপরাজনীতি না হয়। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো যেন দলীয় এজেন্ডার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে এবং নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকে।
‘ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, কাঠামোগত সংস্কারই আসল লক্ষ্য’
সাজেদা রহমান, ইংরেজি বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে। আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই, যা সহিংসতা ও অপরাজনীতিমুক্ত হয়ে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করবে। আমাদের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রকাঠামো বিনির্মাণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশ নতুন এক গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় শামিল হবে বলে আমার বিশ্বাস।
‘নতুন নেতৃত্বই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আশার জায়গা’
মেহেদী হাসান, ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। ফ্যাসিবাদী আমলে দীর্ঘ ১৭ বছর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিজ্ঞতা দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে এবার নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনগণের এই সচেতন ও সতর্ক অবস্থানই আমার আশাবাদের মূল কারণ। অভ্যুত্থান পরবর্তী এই জাতীয় নির্বাচনে আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিপুল পরিমাণ নতুন নেতৃত্ব উঠে আসতে দেখছি, যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সশস্ত্র বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমেও আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। সবকিছু মিলিয়ে আমার বিশ্বাস, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে একটি অন্যতম অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
‘ব্যালট বাক্সে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন’
রফিকুন নাহার রসমী, মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর দেশ এখন এক নতুন সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক অচলায়তন আর নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের গণ্ডি পেরিয়ে এবারের নির্বাচন আমাদের জন্য এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমার প্রধান চাওয়া একটি ত্রুটিমুক্ত নির্বাচনি পরিবেশ। ভোটাররা যেন কোনো চাপ বা প্রভাব ছাড়াই তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং সৎ ও যোগ্য প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করতে পারেন। একই সঙ্গে আমরা চাই ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির অবসান। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত ছাত্র নেতৃত্ব গড়ে উঠুক এবং শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি বন্ধ হয়ে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসুক। আমরা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই, যেখানে দুর্নীতি, গুম, ভয়ের সংস্কৃতির কোনো জায়গা থাকবে না। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার পাবে এবং শাসকরা ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ নয়, দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেবে। পরিশেষে বলতে চাই, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্ত তখনই সার্থক হবে, যখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হোক সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
কেকে/বি