বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে এবারের নির্বাচন কোনো একক রাজনৈতিক ধারার ভেতরে সীমাবদ্ধ নাই। বাইরে থেকে পরিস্থিতি শান্ত মনে হলেও ভেতরে চলছে ভোটের জটিল অঙ্ক। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় আগের নির্বাচনের প্রচলিত সমীকরণ ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত মিলছে।
দলীয় বিভাজন, নীরব ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতিতে এখানে তৈরি হয়েছে একটি স্পষ্ট ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের বড় একটি অংশ দলীয় রাজনীতির বাইরে অবস্থান করায় তাদের আচরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তারা উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রার্থীর মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। প্রকাশ্যে অবস্থান না নেওয়া এই ভোটাররা শেষ মুহূর্তে যেদিকে ঝুঁকবেন, সেদিকেই যেতে পারে নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ। ফলে নতুন ভোটারদের অবস্থান এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে এবং ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এদিকে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরাসরি মাঠে না থাকলেও দলটির ভোট যে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, এমনটি মনে করছেন না স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। বরং এই ভোটের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও শেষ মুহূর্তে সমন্বিতভাবে কোনো একটি দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নীরব কিন্তু সংগঠিত ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলতে সক্ষম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তিনি এলাকায় নিয়মিত সময় দিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় সাংগঠনিক ভোটব্যাংক তার বড় শক্তি হলেও একই ভোটব্যাংকের ভেতরের বিভাজন তার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ভোট বিভাজনের কেন্দ্রেই রয়েছেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুস সোবহান। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন এবং পরবর্তীতে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে বহিষ্কারের পরও তার মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় ভাটা পড়েনি। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত আগৈলঝাড়া উপজেলায় তার বাড়ি হওয়ায় ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক যোগাযোগ ও স্থানীয় প্রভাব তাকে ওই এলাকায় শক্ত অবস্থানে রেখেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোটও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা কামরুল ইসলাম খান শুরু থেকেই সংগঠিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী ও দলীয় ভোটব্যাংক তার শক্ত জায়গা। বিএনপির ভোট বিভাজন এবং নতুন ও নীরব ভোটের একটি অংশ তার দিকে গেলে তিনি হঠাৎ করেই লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. রাসেল সরদার মেহেদী এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) মনোনীত বাইসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী ছেরনিয়াবাত সেকান্দার আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি সীমিত বলেই মনে করছেন ভোটাররা।
বরিশাল-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২৮ হাজার ১৯৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৪ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৪ জন।
সব মিলিয়ে দলীয় রাজনীতি, স্বতন্ত্র প্রার্থীর স্থানীয় প্রভাব এবং নতুন ও নীরব ভোটের সমীকরণে বরিশাল-১ আসনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চিত ও টানটান এক নির্বাচনি পরিস্থিতি। প্রকাশ্যে অবস্থান না নেওয়া ভোটারদের সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে এই আসনের চিত্র আমূল বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন সিদ্ধান্ত নেন, তারই প্রতিফলন মিলবে ভোটের দিন ব্যালট বাক্সে।
কেকে/এসএএস