ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের চারশো গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহনে আরোপ করা বিধিনিষেধ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।
নির্বাচন বিশ্লেষক, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের অনেকেই মনে করছেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভোটের স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিয়ে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করছে। ইসির এমন সিদ্ধান্ত ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’এর পূর্বাভাস কি-না এ নিয়েও কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে এই বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুযোগ নেই। নিরাপত্তা ও ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান সময়ের নির্বাচনি পরিবেশে মোবাইল ফোন একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। ভোটারদের অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ফলে কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল নিষিদ্ধ করা হলে অনেক ভোটার ভোট দিতে যেতে অনীহা প্রকাশ করতে পারেন। এতে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন ভোট দিতে আসা একজন সাধারণ মানুষ কোথায় তার ফোন রেখে ভোট দিতে যাবেন, সেটি একটি বাস্তব সমস্যা। এই ধরনের বিধিনিষেধ ভোটারদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তার মতে অতীতে মোবাইল ব্যবহারে সীমিত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এত বড় ব্যাসার্ধে নিষেধাজ্ঞা আগে দেখা যায়নি। ফলে এটি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও মোবাইল ফোন একটি অপরিহার্য উপকরণ। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, অনিয়ম পর্যবেক্ষণ এবং তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরিতে মোবাইল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্লেষকদের মতে মোবাইল নিষিদ্ধ করা হলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে সমালোচনার মুখে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে কোনো বাধা থাকবে না। আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের জন্য প্রস্তুত বুথ পরিদর্শনকালে তিনি এ তথ্য জানান।
এদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ ও তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ফোন ব্যবহারে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা ভোটারদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন কমিশনের সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত নয় এবং ভোটার, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের দায়িত্ব পালনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে দাবি করেন ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ভোটারদের মধ্যে ভয় ও শঙ্কা তৈরি করতে পারে এবং সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিধিনিষেধ পরিবর্তন না করলে তারা নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করবেন বলেও জানিয়েছিলেন।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী সোহেল রানার মতে, ভোট দিতে গেলে যদি ফোন নিয়ে সমস্যা হয়, তাহলে অনেকেই হয়তো ঝামেলায় যেতে চাইবে না। অন্যদিকে গাজীপুরের গৃহিণী রুনা আক্তার বলেন, নিরাপত্তার জন্য যদি মোবাইল সীমিত করা হয়, সেটা খারাপ না। তবে ভোটারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা দরকার।
বিশ্লেষকদের মতে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তা পুরোপুরি রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়; বরং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ থেকেই এসব প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, অতীতে মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা সাধারণত ভোটকক্ষ বা গোপন বুথের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে পুরো ভোটকেন্দ্র এলাকায় মোবাইল নিষিদ্ধ করা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনআস্থা ধরে রাখতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেকে/ এমএস