ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র দুই দিন। নির্বাচনি প্রচারের শেষ প্রান্তে এসে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই লেগেছে প্রচারের রং। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন প্রার্থীদের স্বজনরাও। টানা গণসংযোগে ব্যস্ত তারা। যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই। চলছে রাস্তায় রাস্তায় মাইকিং, পাড়া-মহল্লায় হচ্ছে জনসভা ও উঠান বৈঠক। চলছে ডিজিটাল প্রচারও।
সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এখন সরগরম ভোটের মাঠ। নির্বাচন সুষ্ঠু করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরইমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শঙ্কা ছাপিয়ে সারা দেশে বইছে নির্বাচনি উৎসবের হাওয়া। বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনি সহিংসতার কিছু ঘটনা ঘটলেও উৎসবের আমেজেই দেশজুড়ে চলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন পুরো দেশ যেন এক বিশাল নির্বাচনি ময়দান। গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, অলিগলি, শহরের মোড়-সবখানেই একটাই সুর, একটাই ডাক- ভোট। কোথাও মাইকে ভেসে আসছে গানের ছন্দে কাতর আবেদন, কোথাও উঠান বৈঠকে প্রার্থীর বিনয়ী কণ্ঠে প্রতিশ্রুতির বন্যা।
বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থী- সবাই এখন ভোটের মাঠে। জনসভা, গণসংযোগ, প্রচারপত্র বিতরণসহ নানা কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। ভোট চাইতে প্রার্থীরা কণ্ঠ নরম করছেন, হাত জোড় করছেন, কখনো আবেগের আশ্রয় নিচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। অবশ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সমালোচনামূলক মন্তব্যে জড়িয়েছেন বাকযুদ্ধে। সব মিলিয়ে উৎসবমুখর আবহ বিরাজ করছে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ভোটের মাঠে এক লাখ সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য থাকবেন।
তথ্য সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের মন জয়ের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি সামনে আনছেন। নেতাদের কথার লড়াই যেমন জমে উঠেছে, তেমনি ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল প্রচারযুদ্ধ।
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে শুরু করে শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম সব মাধ্যমেই চলছে প্রচার। চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ড কিংবা বাজার সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ভোট। প্রথমবার ভোট দিতে চলা তরুণদের মধ্যেও উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানগুলো এখন রাজনৈতিক তর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ভোটারদের চুলচেরা বিশ্লেষণে উঠে আসছে প্রার্থীদের অতীত আমলনামা ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। সংসদ সদস্য প্রার্থীরা আত্মীয়-স্বজনসহ অনুসারীদের বহর নিয়ে প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ঘাট ও দুর্গম জনপদ।
ভোট চাইতে ঘরে ঘরে প্রার্থীদের স্ত্রী-সন্তানরা :
নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন আসনে প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদেরও দেখা যাচ্ছে নির্বাচনি প্রচারে সরব। চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ভোলার বিভিন্ন আসনে প্রার্থীদের জন্য ভোট চাইতে গ্রাম-গঞ্জের পথে নেমেছেন স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে এমনকি নাতি-নাতনিরাও। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনেই প্রার্থীদের পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ত সময় কাটছে ভোটের মাঠে। চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপির প্রার্থী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষে তার স্ত্রী নওশীন আরজান চৌধুরী গ্রামের মেঠো পথে হেঁটে হেঁটে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন। শুধু তিনি নন চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা সরাসরি ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন।
চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পক্ষে প্রচারে নেমেছেন তার ছেলে ইসরাফিল খসরু। একইভাবে চট্টগ্রাম-৬, ৮, ৯, ১২, ১৩, ২, ৩, ৪ ও ১০ আসনেও প্রার্থীদের ছেলে-মেয়েরা বাবার জন্য ভোট চাইছেন। আবার কোথাও বাবা নেমেছেন ছেলের জন্য প্রচারে। সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন হাটহাজারীতে ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের জন্য ধানের শীষে ভোট চেয়ে ভোটারদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছেন।
স্ত্রীদের ভূমিকাও চোখে পড়ার মতো। সীতাকুণ্ডে আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী জামিলা নাজনীন মাওলা, বাঁশখালীতে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী আনিলা ইসলাম চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়ায় হুম্মাম কাদের চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামা খানসহ একাধিক আসনে প্রার্থীদের স্ত্রীরা মূলত নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক এমপি মুশফিকুর রহমানের পক্ষে মাঠে নেমেছেন তার মেয়ে মেহভীন রহমান মুনিয়া। স্বামী ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আখাউড়া পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় দোকানে দোকানে গিয়ে ধানের শীষে ভোট চেয়ে লিফলেট বিতরণ করেন। ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে মুনিয়া বলেন, বাবার প্রতি মানুষের ভালোবাসায় তিনি অভিভূত।
ভোলা সদর আসনে বিজেপির প্রার্থী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর পক্ষে ভোট চাইতে গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন তার মা রেবা রহমান। উঠান সভায় তিনি গরুর গাড়ি মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পার্থ যেন তার বাবা মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুরের মতো ভোলার মানুষের সেবা করতে পারেন। একই আসনে পার্থর বড় মেয়ে মাহামা রহমানও বাবার জন্য ভোট চেয়ে উঠান বৈঠকে আবেগঘন বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, ভোলার সঙ্গে তাদের পরিবারের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে এবং বাবাকে সুযোগ দিলে ভোলাবাসী কখনো ঠকবেন না।
ডিজিটাল প্রচারণায় নতুন মাত্রা :
এবারের নির্বাচনে পোস্টার লাগানো নিষেধ। তাই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের বেশি মনোযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারা ডিজিটাল টিম তৈরি করে কনটেন্ট বানাচ্ছেন আর তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সব ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। ফেসবুক পেজ, লাইভ ভিডিও, গ্রাফিক পোস্ট, শর্ট ভিডিও এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা ভোটারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ধরতে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন করছেন প্রার্থীরা। এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব) এখন প্রচারের বড় হাতিয়ার। শুধু তাই নয়, নির্বাচনি প্রচারে প্যারোডি গানের জয়জয়কার চলছে। জনপ্রিয় সব আধুনিক ও লোকজ গানের সুরে তৈরি করা হচ্ছে নির্বাচনি প্যারোডি গান। শ্রুতিমধুর সুরে ও প্রার্থীদের গুণগান গেয়ে তৈরি এই গানগুলো ভোটারদের বেশ আকৃষ্ট করছে।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, নির্বাচন মানেই যুদ্ধ এবং কৌশল। আধুনিক দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো, অনলাইন তথা ডিজিটাল মাধ্যম। প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা ডিজিটাল প্রচারকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেননা, এ মাধ্যমে খুব দ্রুত এবং সহজেই কমবেশি সবার কাছে নিজেকে তুলে ধরা যায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের টানতে প্রার্থীরা ডিজিটাল মাধ্যমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
দিনরাত প্রচার কার্যক্রম :
নির্বাচন উপলক্ষে পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে রাজপথ ও অলিগলি। মাইকের আওয়াজ জানান দিচ্ছে ভোটের আগমনী বার্তা। কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে প্রতীকী ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলি, কাস্তে, কোদালসহ বিভিন্ন মার্কার সমন্বয়ে সাজানো তোরণ। অন্যদিকে সংসদ সদস্য প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এলাকার মানুষের সঙ্গে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। বিভিন্ন সভায় মতবিনিময় ও শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। জনগণের সাড়া খুবই ভালো বলে তিনি জানান।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশার পক্ষে দিনরাত গণসংযোগ করছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে ডোর টু ডোর গণসংযোগ ও প্রচারণা চালিয়েছি।’
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, তিনি গণসংযোগে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। নির্বাচন ঘিরে যেন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে ইসি :
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশ, জাতি এবং বিশ্ব দেখবে যে, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিচ্ছে এবং একটা উৎসবমুখর পরিবেশ মাঠে ঘাটে নির্বাচনে প্রচারণা চলছে।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, নির্বাচন মানেই গণসংযোগ আর প্রচারণা। মানুষ তথা ভোটারদের কাছে প্রার্থীকে তুলে ধরার কোনো বিকল্প নেই। তবে সম্প্রতি দুই-একটা ঘটনা উদ্বেগ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে কোনো ধরনের প্রাণহানি কাম্য নয়।’
কেকে/এমএ