নির্বাচনের বাকি আর মাত্র তিন দিন। চলতি মাসের ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে শেষ সময়ের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে প্রার্থীরা। তবে নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ ভোটাররা।
তাদের ভাষ্য—হাসিনার শাসনামলে ধারাবাহিকভাবে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনের কোনো একটিতেও সাধারণ নাগরিকরা প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হবে কি-না এ নিয়ে রয়েছে সংশয়।
সাধারণের অভিযোগ—নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুরু হয়ে গেছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আঁটছে ভোট জালিয়াতির পরিকল্পনা। যদিও ইলেকশন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে জানানো বলা হয়েছে—এবার কোনো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হবে না এবং নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট সহায়ক পরিবেশ রয়েছে। গতকাল শনিবার বিকালে রংপুর সার্কিট হাউজে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সোচ্চার ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতা থাকলে সব ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতি প্রতিরোধ করে সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে ভোটের মাঠে অনিয়ম ঠেকাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে যেন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের সারি দীর্ঘ না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্ক করে বিশ্লেষকরা বলছেন—অতীতে দেখা গেছে নির্বাচনে পর্যাপ্ত ভোট কাস্টিং না হলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে ভোটার উপস্থিতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এবার যেনো এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের পক্ষে দায়িত্বে থাকা পোলিং এজেন্টদের সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তারা বলেছে—ভোটগ্রহণের পুরো সময় চোখ-কান খোলা রেখে দায়িত্ব পালন এবং একইসঙ্গে ভোট গণনার সময় যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কারচুপি না ঘটে, সেজন্য সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
সবশেষ ভোট গণনা শেষে ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই করে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছ থেকে সঠিক হিসাব বুঝে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ নিশ্চিত করা গেলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।
এদিকে ভোটে কোনো ধরণের কারচুপি হলে প্রতিরোধ করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘নতুন গল্প শুনছি ইদানীং, এবার নাকি ভোট গণনায় অনেক বেশি সময় লাগবে। কেউ যদি ভোট গণনা করতে দেরি হবে এমন অসিলা দিয়ে সুযোগ নিতে চায়, আপনাদের তা প্রতিরোধ করতে হবে।’ গত সোমবার দুপুরে যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশের মানুষ গত একযুগ ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু ভোট দেওয়ার যে অভিজ্ঞতা তাদের নেই, তা না। ৯১ সালে তারা ভোট দিয়েছিলেন। ৯৬ ও ২০০১ সালেও। ভোট গণনা করতে কেমন সময় লাগে বাংলাদেশের মানুষের সে ধারণা আছে।’
এ সময় কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তারেক রহমান অভিযোগ করেন—তারা এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নেওয়ার জন্য। তিনি বলেন, তারা নাকি সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে। আপনাদের এ প্রস্তাবটাই তো সবচেয়ে অসৎ প্রস্তাব। আপনারা অসৎ প্রস্তাব দিয়ে কাজ শুরু করে কীভাবে মনে করেন যে সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন।
উল্লেখ্য, অতিসম্প্রতি লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে প্রস্তুতকৃত ভোটের ছয়টি সিল জব্দসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জামায়াত নেতাসহ আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে পুলিশ। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট প্রদানের জন্য জামায়াত নেতার নির্দেশে সিলগুলো তৈরি করেন বলে স্বীকারোক্তি দেন গ্রেপ্তার ব্যবসায়ী।
অভিযুক্ত ওই জামায়াত নেতা লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি ও দক্ষিণ বাঞ্চানগর এলাকার মো. শাজাহানের ছেলে সৌরভ হোসেন শরীফ এবং আটক ব্যবসায়ী সোহেল রানা সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের টুমচর গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে ও জেলা শহরের পুরাতন আদালত সড়কের ‘মারইয়াম প্রিন্টার্সের’ স্বত্বাধিকারী।
এদিকে সিল জব্দের পরই বিএনপি পক্ষ থেকে সোহেলকে জামায়াত কর্মী বলে দাবি এবং সিল বানানোর অর্ডার দেওয়া জামায়াত নেতা শরীফের ছবিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের আমির ও লক্ষ্মীপুর-২ আসনের প্রার্থী এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া জানান, সিলগুলো জব্দের পরপরই শরীফকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরপর থেকেই নির্বাচকে কেন্দ্র দেশের রাজনীতিতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিতর্ক জন্ম নেয়।
কেকে/এজে