আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোট গণনায় সম্ভাব্য দেরির আশঙ্কা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়ছে। ভোট গণনায় বিলম্ব হতে পারে—সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য আসার পর থেকেই রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা ও আশ্বাসের বিপরীতে রাজনৈতিক দল, বিশিষ্টজন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ভোট গণনায় অস্বাভাবিক দেরি হলে তা শুধু ফল ঘোষণাকে বিলম্বিত করবে না, বরং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করবে এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা সামনে রেখে তারা বলছেন, ভোটগ্রহণের পর দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ না হলে গুজব, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ভোট গণনা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে কারচুপির আশঙ্কা আরও জোরালো হয়, যা সাধারণ ভোটারদের আস্থাকেও দুর্বল করে। এই প্রেক্ষাপটে ভোট গণনার সময়সীমা, পদ্ধতি এবং ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখার দাবি উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে ভোটের মতোই গণনা প্রক্রিয়াকেও দৃশ্যমানভাবে স্বচ্ছ করতে হবে, না হলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সম্প্রতি নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠকের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, ‘এবার ভোট গণনায় কিছুটা দেরি হতে পারে বলে বৈঠকে জানানো হয়। অনেক সময় ভোট গণনা দেরি হলে অনেক গুজব তৈরি হয়। কারণ, এখানে শুধু তো নির্বাচন হচ্ছে না, সঙ্গে একটা গণভোট হচ্ছে। ফলে দুটা ভোট গণনাই একসঙ্গে শুরু হবে। এর সঙ্গে আছে পোস্টাল ব্যালট। এজন্য কিছুক্ষেত্রে ভোট গণনার কিছুটা দেরি হতে পারে।’
এ ছাড়া সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, পোস্টাল ব্যালটের কারণে এবার কেন্দ্রভিত্তিক এবং রিটার্নিং অফিসারের থেকে ভোট গণনার ক্ষেত্রে একটু সময় বেশি লাগবে। প্রতি ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটা ভোটকেন্দ্র। ভোটাররা দুটো ব্যালটে ভোট দেবেন। কাজেই স্বাভাবিক সময়ের থেকে একটু বেশি সময় লাগার কথা। আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে প্রার্থীর সংখ্যাও বেশি। কাজেই গণনাতে স্বাভাবিক সময়ের থেকে একটু বেশি সময় লাগতে পারে।
আখতার আহমেদ আরও বলেন, এবার আমরা দুই রকমের ব্যালট ব্যবহার করছি। প্রবাসীদের জন্য এক ধরনের ব্যালট আর দেশের অভ্যন্তরে যারা আছেন তাদের জন্য আরেক ধরনের ব্যালট। প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটের সঙ্গে গণভোট সব মিলিয়ে একটু সময় বেশি লাগবে গণনার ক্ষেত্রে। এই জিনিসটা আমাদের সবাইকে একটু বিবেচনায় রাখতে হবে। সেন্টারের গণনা আগে হয়ে যাবে কিন্তু আপনার রিটার্নিং অফিসারের কাছে যে কেন্দ্রটা ওটার গণনার সময় লাগবে। আর একজন রিটার্নিং অফিসারের কাছে যদি একাধিক আসন হয় তাহলে আরও বেশি সময় লাগবে।
ভোট গণনা করতে কতক্ষণ বেশি সময় প্রয়োজন হবে এ প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, সে ব্যাপারে সংখ্যাগত হিসাবটা বললাম। এখন এটা নির্ভর করছে, পোস্টাল ভোটের যতগুলো ইনভেলপ আসবে, সবগুলো খুলতে হবে। কাজেই এটা বলা খুবই কঠিন। সবটাই একসঙ্গে গুনবেন। একই সঙ্গে রেজাল্টটা দেবেন। সেই কারণেই সময়টা একটু বেশি লাগবে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গণভোটেরও আলাদাভাবে রিটার্নিং অফিসার ঘোষণা করবেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভোট গণনায় দেরি হলে তাৎক্ষণিক প্রতিহতের নির্দেশও দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের পর বিএনপির পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলও অভিযোগ করছে, ভোট গণনা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে কারচুপির সন্দেহ আরও জোরাল হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীতে একটি জরিপের ফল প্রকাশ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গণভোটের বিদ্যমান কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের দুর্বলতার কারণে এর ফলাফল নিয়ে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং ইশতেহার ঘোষণা করে ভোটারদের সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। একইসঙ্গে একটি কথা বলা জরুরি, জাতীয় নির্বাচন যেই অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে সেই অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যাচ্ছে না। সিপিডির পক্ষ থেকে মনে করা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে উদ্বেগের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, ভোট গণনা নিয়ে আগেভাগে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। ভোট গণনায় সময় বেশি লাগা মানেই তা কারচুপির ইঙ্গিত—এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোট গ্রহণের পর দ্রুত কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ না হলে অতীতের অভিজ্ঞতার মতোই নানা গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনাই নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, ভোট গণনা একটি সংবেদনশীল ধাপ, যেখানে সামান্য দেরিও বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ভোট দেওয়ার পর দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে ফল জানা তাদের প্রত্যাশা। ভোট গণনায় অযৌক্তিক বিলম্ব হলে নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভোট গ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে ভোট গণনার সময়সীমা ও ফল প্রকাশের নির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি, যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ কাটেনি।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আমাদের উদ্বেগগুলো নির্বাচন কমিশনকে জানানো দরকার। নির্বাচন কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে, এই উদ্বেগের কোনো ভিত্তি নেই। তবে আমি আশাবাদী, জনগণ কোনো ফাঁদে পা দেবে না। কমিশন নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেবে। কারণ, জনগণের উৎসাহে কোনো ঘাটতি নেই। জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে যে কোনো অপচেষ্টা প্রতিরোধ করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. রুমানা পারভীন বলেন, গত কয়েকটি নির্বাচনে রাতের বেলা ভোট হয়েছে। এ কজন ব্যক্তি একাধিক ভোট দিতে পারেন কি না সেটিও বড় বিষয়। ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচনে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে ভোটারদের প্রভাবিত করার প্রমাণ আছে। তখন সেটি ছিল স্বাধীনতাকালীন অনির্বাচিত সরকার।
তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অফিসিয়ালি ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা বলা হলেও কার্যত ছিল ১০ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে প্রশাসনের সহায়তায় কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। প্রশাসন যদি কারচুপিতে জড়িত হয়, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বা কী করবে?
তিনি প্রশ্ন তোলেন, রাতে কেন ব্যালট পেপার স্থানান্তর করতে হবে? রাতের নিরাপত্তা দিনের চেয়ে কঠিন। এ ছাড়া ভোটার তালিকার ছবি স্পষ্ট কি না তা যাচাই করা জরুরি। ছবি অস্পষ্ট হলে পোলিং অফিসাররা কীভাবে তা যাচাই করবেন? আমি ব্যক্তিগতভাবে এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি।
কেকে/এজে