বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ঢুকলেই বোঝা যায়, কত পরিবার প্রতিদিন জীবন চালানোর হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সাধারণ এক ঘরে মায়ের দুশ্চিন্তা ঘোরে সন্তানের পাতে কী তুলে দেওয়া যাবে, যখন চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দিন দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। একই সময় পরিবারের উপার্জনকারী মানুষটি ভাবনায় থাকেন, পরদিন কাজ মিলবে কি না। সাম্প্রতিক খাদ্যপণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি আর সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ এ বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ঠিক এমন সময়েই ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগ অনেকের কাছে নতুন করে আশার কথা শোনাচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু কার্ড হিসেবে দেখলে ভুল হবে, এটি দরিদ্র পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা আর নারীর অবস্থান শক্ত করার একটা সুযোগ। বাস্তব চিত্র দেখায় যে এ উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে লাখ লাখ পরিবারের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১.২% থেকে কাছাকাছি ২৮% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে মিলে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে এ প্রস্তাবটি একটি সাহসী উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়, যা দারিদ্র্য নিরসনে নতুন দিশা দিতে পারে। তবে একইসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশের মতো সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে আদৌ এ কার্ড সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব কি না। এ বিষয়টি নিয়ে বিরোধী পক্ষের মধ্যে জোরালো সংশয় ও প্রশ্ন বিদ্যমান।
ফ্যামিলি কার্ডের প্রস্তাবটি নতুন নয় কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনায় এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ইতোমধ্যে ৫৭ লাখ পরিবারকে সুলভ মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করছে, যা ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে চালু হয়েছে। এরপরও প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোতে পর্যায়ক্রমে ৪ কোটি পরিবারকে কভার করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা মাসিক ২০০০-২৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা বা খাদ্যপণ্য প্রদান করবে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুসারে, দেশের মোট পরিবার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ১ লাখ, যার মধ্যে অতিদরিদ্র পরিবার ৫০ লাখেরও বেশি। এ কার্ড যদি নারীদের নামে জারি হয়, তাহলে পরিবারের ভেতরে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়বে। ইউএনএফপিএ-এর রিপোর্ট দেখায় যে মায়েদের হাতে টাকা দিলে বাচ্চাদের পড়াশোনা এবং খাবারে বেশি খরচ হয়। এর পেছনে কারণ নারীদের সঞ্চয় প্রবণতা এবং দায়িত্বশীলতা।
আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো ঠিকভাবে চালানো গেলে তবেই ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ কাজে আসতে পারে। ২০২৫-২৬ বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, যা আইএমএফের সুপারিশ অনুসারে দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে প্রথম পর্যায়ে ৫০ লাখ পরিবারকে কভার করতে মাসিক ১০০০ কোটি টাকা লাগবে, যা বিদ্যমান খাত থেকে যোগান সম্ভব। বৈশ্বিক উদাহরণ দেখলে ব্রাজিলের বোলসা ফামিলিয়া প্রোগ্রামে দারিদ্র্য ২৫ শতাংশ কমেছে, যেখানে মাসিক নগদ সহায়তা শিশুদের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম ৮০ কোটি মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে সাহায্য করেছে। মেক্সিকোর প্রসপেরা প্রোগ্রামও এমন একটি উদাহরণ, যা নগদ স্থানান্তরের মাধ্যমে নারীদের হাতে টাকা দিয়ে পুষ্টি এবং শিক্ষা উন্নয়ন করে। এর ফলে শিশুমৃত্যু হার ১১ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশে এ মডেল অনুসরণ করলে পুষ্টিহীনতা কমবে, যা বিবিএস-এর সাম্প্রতিক জরিপে ২০ শতাংশ শিশুর মধ্যে দেখা গেছে।
বর্তমান বাজারদর এবং আয়ের বাস্তবতা দেখলে ফ্যামিলি কার্ডের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পুষ্টিহীনতা কমাতে পারে, বিশেষ করে শহুরে স্লাম এবং গ্রামীণ এলাকায়। নারী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা হ্রাস পাবে, যা ইউএনডিপি-এর রিপোর্টে বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত। পরিসংখ্যান বলছে যে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে খাদ্যমূল্য ২০ শতাংশ বেড়েছে, যা ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের ডেটায় উল্লেখিত। এ কার্ড যদি ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে বিতরণ হয়, তাহলে স্বচ্ছতা বাড়বে। আমরা জানি, ভিজিডি ও ভিজিএফের মতো বিদ্যমান প্রোগ্রামের সঙ্গে একীভূত করলে দুর্নীতি কমবে। কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত হলে উৎপাদন বাড়বে। এ ছাড়া এটি মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেরও উন্নয়ন হবে।
প্রথম পর্যায়ে ৫০ লাখ অতিদরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে পরে বিস্তারের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়ক হবে। এতে নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও পরিবারে অবস্থান শক্তিশালী হবে। নারীরা সাধারণত অর্থ ব্যবহারে সতর্ক হওয়ায় শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টিতে উপকার হবে। স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক বিতরণ নিশ্চিত হলে এটি দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে এটি অন্তত স্বল্পমেয়াদে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে শহর ও গ্রামে সহজে টাকা পৌঁছানো যাবে। ধীরে ধীরে সঞ্চয় বাড়লে নারীরা ছাগল পালন বা সেলাই মেশিন কিনে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
যদিও ফ্যামিলি কার্ডের উপকারিতা অনেক তবু সমালোচনাগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না। টিসিবির পুরোনো ফ্যামিলি কার্ডে স্বচ্ছতার অভাব ছিল, যেখানে ৭৫ শতাংশ কার্ড না পাওয়ার কারণ দুর্নীতি। নতুন প্রোগ্রামেও লক্ষ্যভিত্তিক বিতরণে সমস্যা হতে পারে, যেমন পণ্য পুনরায় বিক্রির প্রলোভন। অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় ৪ কোটি পরিবার কভার করতে বিপুল অর্থ লাগবে, যা বাজেটে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিদ্যমান প্রোগ্রামের সঙ্গে একীভূত না হলে ডুপ্লিকেশন হবে। সমাজীয় অসমতা বিবেচনায় কার্ড শুধু দরিদ্রদের জন্য হওয়ায় মধ্যবিত্তরা বাদ পড়তে পারেন এবং জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য যেমন হিজড়া সম্প্রদায়ের অধিকার বিবেচনা না করলে অসমতা বাড়বে। বাস্তবায়নে শাসনগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন পুলিশ ভেরিফিকেশন যা দুর্নীতি বাড়াতে পারে। ডেটা নির্ভুল না রাখলে প্রোগ্রাম সফল হবে না।
ফ্যামিলি কার্ড খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পুষ্টিহীনতা কমাবে। এতে পারিবারিক সহিংসতা কমতে পারে। এটি দারিদ্র্য কমিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনবে। কৃষি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হলে উৎপাদন বাড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে দরিদ্রদের জন্য এটি সহায়ক হবে।
অন্য দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনা যতই ভালো হোক—স্বচ্ছতা আর ঠিক মানুষ বাছাই না হলে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচিও টেকসই হয় না। বাংলাদেশে এ মডেল থেকে অনুপ্রেরণা নেয়া যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় এটাকে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামে রূপান্তরিত করা দরকার। সাম্প্রতিক আলোচনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে, যা জনমত বিভক্ততা দেখায়। একদিকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে সমালোচনা হয়।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বয়স্ক ভাতা নিয়ে অনিয়ম হয়েছে। তাই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা জরুরি। নইলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। রাজশাহীর পদ্মার চর এলাকায় বসবাসকারী নব্বই ঊর্ধ্ব বৃদ্ধা সবেজান বেওয়া আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে তার একমাত্র চাওয়া একটি বয়স্ক ভাতা কার্ড। সেই আশায় তিনি দিনের পর দিন চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরের অফিসে ঘুরেছেন, কিন্তু শেষে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে ঋতুর প্রহর গুনছেন। এসব ঘটনা দেখায়, সমস্যা কার্ডে নয়, সমস্যা বিতরণ ও তদারকিতে। ফ্যামিলি কার্ড যদি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তাহলে পুরোনো অনিয়ম আবার ফিরে আসবে। শক্ত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোতে বাস্তবায়ন করলেই এর সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমার মতে, ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ভিন্ন মত আছে। কেউ এটাকে বড় উদ্যোগ মনে করেন, আবার কেউ শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভাবেন। আমি মনে করি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা কঠিন হলেও ধাপে ধাপে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, তদারকি থাকলে সমস্যাও সামলানো যায়। এখন অনেক মানুষ রাষ্ট্রের সহায়তায় বিশ্বাস করতে ভয় পান। তবে ফ্যামিলি কার্ড সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে সেই বিশ্বাস ফিরে আসতে পারে। মানবিকভাবে চালানো গেলে এতে দেশই উপকৃত হবে।
আমার মতে, এ বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ডকে দারিদ্র্য মোকাবিলার একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি কাজে লাগতে পারে। তবে আমাদের আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয়, কারণ তদারকি না থাকলে এমন কর্মসূচি টেকসই হয় না। আমি মনে করি, নারীদের হাতে সহায়তা পৌঁছালে ফল দীর্ঘস্থায়ী হয়। সবকিছু ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে সুফল মিলবে, তবে আসল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নেই। এতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হবে এবং সবাই উপকৃত হবে। সংক্ষেপে বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড একটি সম্ভাবনাময় সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এটি খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করবে। তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে এটি ব্যর্থ হতে পারে। তাই সম্মিলিত উদ্যোগ, বাস্তবসম্মত নীতি এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করা জরুরি। তবেই ফ্যামিলি কার্ড মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনে দুস্থ পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত করতে পারবে।
শেষ কথা হলো, শুধু ফ্যামিলি কার্ড বিলি করে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে দেশের রাজস্ব আয় বাড়ানোর দিকে, খুঁজে বের করতে হবে রপ্তানির নতুন বাজার, বৃদ্ধি করতে হবে উৎপাদন এবং তৈরি করতে হবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। এসব পদক্ষেপ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত নারী ক্ষমতায়ন এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর স্থায়ী সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। স্বীকার করতেই হবে, ফ্যামিলি কার্ড জাতির জীবনে এখন নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে সময়ই বলে দেবে এর সফলতার গতিপথ।
লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
কেকে/এজে