“আয় হাদির লাশ নিয়ে যা” বাক্যটি সদম্ভে উচ্চারণ করেছিল কনস্টেবল রাশেদ কাজি, বলপ্রয়োগ করে এক কনস্টেবলের বুনো উল্লাস! জুলাইতেও “গুলি করি একটা, মরে একটা, একটাই যায়—বাকিডি যায় না স্যার” এক কনস্টেবল বলেছিল। অভীন্ন চিত্র! অন্যদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দরজায় কড়া নাড়ছে, মাত্র ৫ দিন বাকি! হাদি ইস্যুটা খুবই স্পর্শকাতর, তার হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে রাষ্ট্রের এমন রক্ত উপহার, পুলিশের ঔদ্ধত্য ও আক্রমণাত্মক মনোভাব, আন্দোলনে নেতৃত্ব ও অনুপ্রবেশ অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়- নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রের এক অদৃশ্য গূঢ় ছায়া লক্ষ্মণীয়। এই দেশে রাজনীতির প্যাচ জটিল জট পাকানো।
দৃশ্যমান দেখায় প্রোথিত থাকে অদৃশ্য কুশীলব। হাদিকে কাল্টফিগারের পরিণত করে চরম অতিরঞ্জন করে চেতনা বা দেবতায় উপস্থাপন করার মাঝে রহস্য আছে, এসব করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের সর্বোচ্চ সফল প্রচেষ্টা চলেছে প্রথমে, এরপর সেই রেশ কেটে যাবার পর নতুন কোনো অনুষঙ্গ খুঁজতে পারে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা গোষ্ঠী। এই নির্বাচনটা জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্য, এই নির্বাচন ও গণভোটের রায়ে অনেকের রাজনৈতিক ভাগ্যচক্রের গতি-প্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।
কালচারাল হেজিমনি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্মারক ‘ইনকিলাব মঞ্চ’, এক বুক স্বপ্ন ও দেশপ্রেম নিয়ে শহীদ ওসমান হাদি প্রতিষ্ঠা করেন এই প্লাটফর্ম, যেটি সামনে রেখে ওসমান হাদী একজন একটিভিস্ট থেকে তারুণ্যদীপ্ত বাংলাপন্থী নির্মোহ রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন কিন্তু হাদির মৃত্যু পরবর্তী ইনকিলাব মঞ্চ নিয়েও ধোঁয়াসা কাটে না।
হাদীর কোনো সম্যকসারির সমন্বয়ক ছিলেন না, তাকে কেন টার্গেট করে হত্যা করা হলো, এত টাকা লেনদেন কেন হলো? অযাচিতভাবে ঢাবিতে বঙ্গবন্ধু হলের নাম পরিবর্তন করে হাদীর নামে নামাঙ্কিত করার মাঝে যে বিরাট ধূর্ততা আছে এটি বুঝতেও রকেট সাইন্স প্রয়োজন নেই। তার সম্মানে নতুন কোনো হলের, স্থাপনার নামকরণ করা যেত, সেটা না করে বিতর্কিত চেষ্টা কেন করা হলো? এসব যৌক্তিক প্রশ্ন, কিন্তু হাদিকে নিয়ে এ প্রশ্নগুলো করতে গেলে কিছুটা সংকোচবোধ করতে হয়!
শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সব অনুষঙ্গে তার দখল, গভীর দেশপ্রেমে স্বতন্ত্র বিদ্রোহ সত্তা তাকে আলাদা করেছে। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব কালোত্তীর্ণ, টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র, ওসমান হাদি সেই গুরুত্ব উপলব্ধি করেই তার ভীন্ন আঙ্গিকের এই সুদুরপ্রসারি ও কার্যকর বিপ্লবের সূচনা করেন। এজন্যই হতে পারে তিনি চক্ষুশূলে পরিণত হন এবং নিষ্ঠুর বলি হন আঁততায়ীর হাতে, ধরার পাঠ চুকিয়ে চলে যান দেশকে কান্নার সমুদ্রে ফেলে, সেই শোকের রেশ ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে গেলে এখনো দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো তিনি প্রাসঙ্গিক স্বমহিমায়।
বাংলাদেশের বিচারিক গতি শ্লথ, কিন্তু হাদি হত্যাকাণ্ডে খুব শক্তিশালী মোড়লদের হাত আছে, শর্ষের তলে ভুত থাকার সম্ভাবনা প্রবল, ঘরের শত্রু বিভীষণও হতে পারে পর্দার আড়ালের কুশীলব, সরকারের ওপর অদৃশ্য কোনো চাপ, না- হয় সরকারের কারও কারও এর সঙ্গে গভীর যোগসংযোগ আছে এতেও সংশয় রাখা অত্যুক্তি নয়। হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে পুলিশ অস্বাভাবিক মারমুখী ছিল, চরম বলপ্রয়োগে এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি বর্ষণে প্রায় রণক্ষেত্র যমুনা, এরপর সন্ধার দিকে শাহবাগে ছাত্রজনতার ঢল নেমে আসে। সেখানেও অভীন্ন কায়দায় হামলা হয় শিক্ষার্থীদের ওপর, পরবর্তী দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের একাংশ অতিউৎসাহী ছিল, পথচারী ও আন্দোলনকারী ঘুলিয়ে ফেলে, যেন জুলাইয়ের পুষে রাখা ক্ষোভের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে নগ্ন ব্যবহার পুলিশ ও ছাত্রজনতাকে মুখোমুখি করা হয়েছিল, কথা ছিল গণঅভ্যুত্থান শেষে পুলিশের কার্যকর সংস্কার হবে, সরকারের অযাচিত একপাক্ষিক ব্যবহার করা বন্ধ হবে, কিন্তু বাস্তবতা একই। যে কোনো আন্দোলনে পুলিশের একটি অংশের অতি উৎসাহ দেখা যায় চরমে। রাস্তায় যারা বলপ্রয়োগে থাকে তারা সবাই কনস্টেবল।
কিছু অতিউৎসাহী কনস্টেবল উন্মত্ত হয়ে ওঠে এসময়, পথচারী বা আন্দোলনকারী, দেখামাত্রই ঝাঁপিয়ে পড়ে। পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার চরম সংকট, রাজনৈতিক সরকার তাদের নগ্নভাবে ব্যবহার করে আন্দোলন দমনে, তারাও জবাবদিহিতার বাইরে থাকায় অযৌক্তিক বলপ্রয়োগ করে।
বলাবাহুল্য, পুলিশ রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্রিয়াশীল এবং অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান, দেশের গ্রাম হতে শহর, অলি থেকে গলি, অন্ধি হতে সন্ধি- সবখানে সামগ্রিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পুলিশের বিকল্প কোনো বাহিনী হতে পারে না। ৫ আগস্ট পরবর্তী যেন আরও প্রকটভাবে উপলব্ধি হয়েছে। কিন্তু, এই পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চেয়ে সরকারের পেটোয়া ও গুন্ডা বাহিনীতে পরিণত হলে তখন জনগণ ও পুলিশ মুখোমুখি হয়, পারস্পরিক বৈরিতা দেখা যায় যা কখনোই একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ভালো খবর নয়।
পরিশেষে, নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে হতে হবে। হাদি হত্যার বিচার করতে হবে। সব নাটকীয়তা ও শঠতার প্রাচীর ভেঙে প্রকৃত দোসীদের শাস্তি হতে হবে। কারা হাদি হত্যার ভিকটিম কার্ড খেলে সবচেয়ে উপকার গ্রহণ করেছে, তাদেরও প্রশ্ন করতে হবে। আন্দোলন দমনে পুলিশের অযাচিত আক্রমণ, বাচ-বিচারহীন হামলে পড়ার বন্ধ করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/এজে