বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র জনগণের নৈতিকতা, ন্যায়বোধ ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ দায়িত্ব বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলো ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণসহ বড় আকারের অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নিঃসন্দেহে এসব উদ্যোগ ইসলামী কার্যক্রমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে একটি জাতির নৈতিক ও চারিত্রিক পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নৈতিক অবক্ষয় এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার। এ প্রেক্ষাপটে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকা যথেষ্ট নয়।
রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের নৈতিকতায় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নীরবতা :
বর্তমান বাস্তবতায় একটি গভীর উদ্বেগজনক দিক হলো—রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়ন বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যকর কোনো কর্মসূচি দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ক্যাডারভুক্ত একটি অংশ নিয়মিতভাবে সরকারকে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য চাপ দিয়ে থাকে। তাদের যুক্তি সাধারণত এমন যে, বেতন বাড়ালে তারা সৎ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে সরকারি চাকরিজীবীরা দেশের মোট কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর দশ শতাংশেরও কম। দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, পরিবহন ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি কি সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের কোনো নিশ্চয়তা দেয়?
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়—বেতন বাড়লেও দুর্নীতি কমে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের চাপ বহনের জন্য সরকার সাধারণ মানুষের ওপর কর ও পরোক্ষ কর বাড়ায়। ফলে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ন্যায়সংগত রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টান্ত হতে পারে না।
ক্যাডারভিত্তিক সুবিধা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য—আরও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সরকারি কাঠামোর ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট বেসামরিক ও সামরিক ক্যাডার গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে নিজেদের জন্য অতিরিক্ত ভাতা, বিশেষ সুবিধা ও সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করে।
এর ফলে একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ জনগণ ও অন্য পেশাজীবীরা বঞ্চিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্টতই অন্যায়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—কেবল ঘুষ গ্রহণই দুর্নীতি নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বসে অন্যায্য ও অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণ করাও এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এটি সরাসরি আমানতের খেয়ানত। রাষ্ট্রীয় কোষাগার, উন্নয়ন প্রকল্প ও ইসলামী নৈতিক সীমারেখা বাংলাদেশে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থায়নে বিপুল সংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। অবকাঠামো ও সেবাখাতে বিনিয়োগ বাড়ছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায় যে কিছু প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা-বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাঠামোর ভেতরে—রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বরাদ্দকৃত প্রকল্প, সম্পদ ও সুযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে অতিরিক্ত আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এর মধ্যে থাকে, বিশেষ ভাতা, প্রকল্পভিত্তিক সুযোগ, আবাসন, যানবাহন, বিদেশ সফর, পদায়ন, প্রশাসনিক প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ সুবিধা।
অনেক ক্ষেত্রে এসব সুবিধা আইনগত কাঠামোর ভেতর থেকেই নেওয়া হয়, কিন্তু ইসলামী নৈতিকতার মানদণ্ডে সেগুলো প্রশ্নাতীত নয়। এই প্রেক্ষাপটে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি মৌলিক দায়িত্ব হওয়া উচিত—রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রাপ্ত সুবিধার ক্ষেত্রে কোনটি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ এবং কোনটি অনৈতিক ও অবৈধ, সে বিষয়ে স্পষ্ট ও জাতীয় নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা।
এ বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ইসলামী নীতিনির্দেশনা—প্রথমত, রাষ্ট্রীয় কোষাগার জনগণের আমানত। দায়িত্ব পালনের জন্য বাস্তবিকভাবে অপরিহার্য নয়—এমন অতিরিক্ত সুবিধা কেবল পদমর্যাদার কারণে গ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে আমানতের খেয়ানত।
দ্বিতীয়ত, কোনো প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর্থিক লাভ, আত্মীয়স্বজনের সুবিধা, পদায়ন বা বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করেন, তবে তা প্রচলিত ঘুষের সংজ্ঞার বাইরে হলেও ইসলামী শরিয়তে অবৈধ সুবিধা হিসেবে গণ্য হবে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের জন্য বিশেষ আবাসন, যানবাহন, বিদেশ সফর বা অতিরিক্ত ভাতা সৃষ্টি করা, যদি তা দায়িত্ব পালনের জন্য অপরিহার্য না হয়, তবে তা নৈতিকভাবে অন্যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত। চতুর্থত, কোনো নির্দিষ্ট ক্যাডার বা গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ ও সুবিধা নিজেদের জন্য কৌশলগতভাবে বৃদ্ধি করে এবং অন্যদের বঞ্চিত করে-ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বৈষম্য ও জুলুম। পঞ্চমত, কেবল “আইন অনুমোদন করে” এই যুক্তি দিয়ে কোনো সুবিধা গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে যথেষ্ট নয়। শরিয়তের মানদণ্ডে প্রশ্ন হলো—এটি কি ন্যায়সংগত, প্রয়োজনভিত্তিক এবং জনগণের হকের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এখনো রাষ্ট্রীয় কোষাগার ব্যবহারের নৈতিক সীমারেখা নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। করনীতি ও বরকত কমে যাওয়ার নৈতিক গল্প এ প্রসঙ্গে সমাজে প্রচলিত একটি নৈতিক গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা সহিহ হাদিস নয়, বরং একটি শিক্ষামূলক উপকথা।
একদিন এক রাজা এক সাধারণ ফলচাষির কাছ থেকে এক গ্লাস ফলের রস পান করলেন। অল্প ফল ব্যবহার করেই চাষি গ্লাস ভরে রস পরিবেশন করল। রাজা মনে মনে ভাবলেন, এই চাষির ওপর আরও কর আরোপ করা যায়।
কিছুক্ষণ পর রাজা আরেক গ্লাস রস চাইলে চাষি এবার একই মানের ফল ব্যবহার করেও অনেকগুলো ফল দিয়ে গ্লাস ভরলেন। রাজা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলে চাষি বলল—‘সম্ভবত শাসক এখন আমার ওপর আরও কর আরোপ করার চিন্তা করছেন, তাই আল্লাহ এ ফলের বরকত তুলে নিয়েছেন।’এই গল্পটি সহিহ সূত্র নয়, তবে এর শিক্ষা কুরআন ও সুন্নাহর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বরকত তুলে নেওয়া সম্পর্কে সহিহ দলিল—
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো জাতি ওজনে ও মাপে কম দেয়, তখন তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ, কঠোর জীবনযাপন এবং শাসকদের জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯ - হাসান)
ইসলামী ব্যাখ্যায় ‘ওজনে ও মাপে কম দেওয়া’ বলতে বোঝায়—
মানুষের ন্যায্য অধিকার খর্ব করা, নাগরিকের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় নীতিতে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করা, শাসকশ্রেণির স্বার্থকে জনগণের স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়া।
কুরআনের স্পষ্ট নীতি, আল্লাহ তায়ালা বলেন—“আর যদি জনপদের লোকেরা ইমান আনে ও তাকওয়া অবলম্বন করে, তবে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকত খুলে দিতাম।’ (সূরা আল-আ’রাফ, ৯৬)
অর্থাৎ কর আদায় নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা হয় তখনই, যখন রাষ্ট্র কেবল রাজস্ব বৃদ্ধিকে উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করে এবং জনগণের কল্যাণ ও ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করে।
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—
সরকারি বেতন ও সুবিধা কাঠামোর চাপ বহনের জন্য সাধারণ মানুষের ওপর কর বাড়ছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে এবং সামাজিক হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার নমুনা নয়।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকৃত দায়িত্ব—এই বাস্তবতায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেবল মসজিদ নির্মাণ, শিশু শিক্ষা বা ইমাম প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এই মন্ত্রণালয়ের উচিত—
সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের জন্য ইসলামী নৈতিকতা, আমানতদারিতা ও জনস্বার্থভিত্তিক বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা, জুমার খুৎবাকে রাষ্ট্রীয় আমানত, দুর্নীতি, বৈষম্য ও নাগরিক অধিকার বিষয়ে সচেতনতার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার ব্যবহারে ইসলামী নৈতিক মানদণ্ড প্রকাশ্যে ঘোষণা করা।
উপসংহার
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি রাষ্ট্রের সাফল্য অবকাঠামো, বাজেট বা বেতন কাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না। রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয়—রাষ্ট্র কতটা ন্যায়পরায়ণ, কতটা আমানতদার এবং কতটা জনগণের কল্যাণমুখী। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় যদি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নে নীরব থাকে, তবে কেবল প্রকল্প ও স্থাপনা দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো রাষ্ট্রের ভেতর থেকে নৈতিক সংস্কার। আর এই নৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় যদি এটি সত্যিকার অর্থে তার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
লেখক : প্রকৌশলী
কেকে/এজে