ঘন জঙ্গল আর কুয়াশায় ঢাকা এক গ্রামের নাম ছিল রূপসীডাঙা। দিনের আলোয় গ্রামটা সাধারণ মনে হলেও সূর্য ডোবার পরই সব বদলে যেত। বাতাস তখন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে উঠত, গাছের ডাল নিজে নিজে নড়তো, আর জঙ্গল থেকে ভেসে আসত অচেনা হাসির শব্দ। রূপসীডাঙার মানুষ বিশ্বাস করতো এসব কিছুর পেছনে আছে এক তান্ত্রিক।
গ্রামের ঠিক উত্তর দিকে ছিল এক পোড়া ঢিবি। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল কালো রঙের একটি ভাঙা মন্দির। কেউ সেখানে দিনের বেলাতেও যেত না। কারণ সবাই জানতো, সেই মন্দিরেই থাকে তান্ত্রিক আর তার ভয়ংকর যাদুর লাঠি। বলা হতো, লাঠিটা রাতে নিজে নিজে হাঁটে, ফিসফিস করে কথা বলে, আর রেগে গেলে আগুন ছিটাতে থাকে।
রূপসীডাঙার এক কিশোরের নাম ছিল আবীর। বয়স কম হলেও সে ছিল অসম্ভব সাহসী। যেখানে নিষেধ, সেখানেই তার কৌতূহল। রাতে অন্য ছেলেরা যখন কম্বলের ভেতর ঢুকে ঘুমাতো, আবীর তখন জানালার ফাঁক দিয়ে জঙ্গলের অন্ধকার দেখত।
এক রাতে গ্রামের কুয়ো থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে লাগলো। গরু-ছাগল ছুটোছুটি শুরু করল। ঘরের দরজায় কেউ যেন নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে কিচ কিচ কিচ! কেউ দরজা খুললে বাইরে কিছুই নেই, শুধু মাটিতে পুড়ে যাওয়া দাগ।
সবাই বলল, ‘তান্ত্রিক রেগে গেছে!’
আবীর আর অপেক্ষা করল না। সে ঠিক করলো আজ সত্যটা দেখবেই।
চাঁদ মেঘে ঢাকা ছিল। বাতাসে পচা পাতার গন্ধ। আবীর ধীরে ধীরে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ল। প্রতি কদমে পায়ের শব্দ যেন দশ গুণ বড় হয়ে কানে বাজছিল। হঠাৎ সামনে থেকে ভেসে এলো ঠক ঠক ঠক!
আবীর থেমে গেল। একটা লাঠি!
কালো, বাঁকানো, মাথায় লাল পাথর জ্বলছে; আর সেটা নিজে নিজেই এগিয়ে আসছে!
লাঠিটা ফিসফিস করে বলল, ‘পা টিপে হাঁটো!’ আবীরের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল, কিন্তু সে পালালো না। ‘তুমিৃ তুমি যাদুর লাঠি?’ লাঠি খিকখিক করে হেসে বলল, ‘আমি ভয় খাই। যে ভয় পায়, তাকে খেলনা বানাই!’
ঠিক তখন মন্দিরের ভেতর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে বেরিয়ে এলো তান্ত্রিক। তার চোখ দুটো লাল আগুনের মতো, গলায় ঝুলছে দাঁতের মালা।
‘এত সাহস?’ গর্জে উঠলো সে।
তান্ত্রিক লাঠি মাটিতে আঘাত করতেই চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। মাটি ফেটে বেরিয়ে এলো ছায়ার হাত! গাছগুলো বাঁকা হয়ে দাঁত বের করে হাসতে লাগল। আকাশে বাজ পড়ল কড়াৎ কড়াৎ!
আবীর কাঁপছিল, কিন্তু চোখ নামাল না।
তান্ত্রিক অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি ভয় পাচ্ছো না?’
আবীর বলল, ‘পাচ্ছি কিন্তু পালাচ্ছি না।’ তান্ত্রিক এক পা এগিয়ে এসে বলল, ‘তাহলে ধরো লাঠি।’
লাঠি হাতে নিতেই আবীর চিৎকার করে উঠল। সে দেখতে পেল সরূপসীডাঙার ভয়ংকর সব দৃশ্য। মানুষ ব্যাঙে বদলে যাচ্ছে, ঘর উল্টে আকাশে ঝুলছে, আগুনের পাখি চিৎকার করছে!
লাঠিটা পাগলের মতো হেসে বলছে, ‘আরও ভয়! আরও ভয়!’
গ্রামে তখন ভয়াবহ কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। ঘড়ি উল্টো ঘুরছে, শিশুদের ছায়া দেয়ালে নাচছে, কুয়ো থেকে কান্নার শব্দ আসছে।
আবীর বুঝে গেল—যাদু থামাতে হবে।
সে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে বলল, ‘থাম! আমি ভয়কে মানি না!’
হঠাৎ সব স্তব্ধ হয়ে গেল। লাঠির আলো নিভে গেল। ছায়াগুলো মিলিয়ে গেল। তান্ত্রিক ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল, যেন সে নিজেই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তান্ত্রিক ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি পেরেছো, তুমি ভয়কে হারাতে পেরেছো।’
পরদিন সকালে রূপসীডাঙায় আর মন্দির নেই, নেই তান্ত্রিক, নেই যাদুর লাঠি। শুধু পোড়া ঢিবির ওপর লেখা: ‘যে সাহসী আর বুদ্ধিমান, সেই-ই আসল জাদুকর।’
আবীর জানত; সেই রাত কোনো স্বপ্ন ছিল না। রূপসীডাঙা আর আগের মতো ভয়ংকর নয়। কারণ ভয় এখন আর কাউকে শাসন করে না।
কেকে/ এমএস