দীর্ঘ ১৭ বছরের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর দেশের মানুষ বুক বেঁধেছিল এক নতুন ভোরের আশায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা পুনরায় শুরু হবে এমনটাই ছিল সাধারণের প্রত্যাশা। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র ৫ দিন বাকি থাকতে জনমনে সেই আশার বদলে এখন দানা বাঁধছে গভীর সংশয় ও শঙ্কা।
মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব, একটি বিশেষ রাজনৈতিক জোটের প্রতি সরকারের নমনীয়তা এবং ব্যালট জালিয়াতির আগাম আলামত এবং একইসঙ্গে হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার না করে, বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করার মাধ্যমে নির্বাচনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলত জাতিসংঘের অধীন শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি চলছিল গত বৃহস্পতিবার থেকে। তাদের দাবি ছিল শুক্রবারের মধ্যে জাতিসংঘে চিঠি পাঠাতে হবে।
গতকাল শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা চালান এবং এতে প্রায় ৫০ জনের বেশি আহত হন। এই যৌক্তিক আন্দোলনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলা আসন্ন নির্বাচনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নির্বাচনের যেখানে আর মাত্র ৫ দিন বাকি সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এহেন আক্রমণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতাকে নির্দেশ করে। কেন হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারে সরকার টালবাহানা করছে? তাদের এ হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা সেটিই এখন প্রশ্ন।
কেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহিংসতায় জড়াল পুলিশ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে যদিও বলা হয়েছে ওসমান হাদি হত্যার বিচারে তারা বদ্ধপরিকর। জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত পরিচালনার আইনগত দিক সরকার গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। আগামী রোববার জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থায় আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাবে সরকার। এরকম আশ্বাস হাদি হত্যাকাণ্ডের পরপরই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হত্যাকারীদের সব আলামাত পাওয়া সত্ত্বেও হত্যাকারীরা নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে। এতদিন পার হওয়ার পড়েও হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া সরকারের অনীহা বলেই মনে হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সেটি হাদি হত্যাকাণ্ড এবং এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার মাধ্যমে কলুষিত হয়েছে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরপরই গত বছর ২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুর্বৃত্তরা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এতে তার মাথা ও ডান কানের নিচে গুলি লাগে এবং তিনি গুরুতর আহত হন এবং গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। সেই দিন থেকে সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা যায়নি।
ফলে হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্তের দাবিতে এখনো রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ ও শহীদের পরিবার। আর এ আন্দোলনকে ঘিরে পুলিশের দমন-পীড়ন এবং আন্দোলনকারীদের রাস্তা না ছাড়া ঝুঁকি তৈরি করছে আসন্ন নির্বাচনে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের এ মুহূর্তে সবথেকে জরুরি হলো আন্দোলনকারীদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে দেশের পরিস্থি স্থিতিশীল করা। অন্যথায় আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হতে পারে আস্থার সংকট।
কেকে/ এমএস