কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন একজন কাল সচেতন ও ইতিহাস সচেতন কবি। আধুনিক কাব্য কলার বিচিত্র ইজম প্রয়োগ ও শব্দ নিরীক্ষের ক্ষেত্রেও তার অনন্যতা বিস্ময়কর। বিশেষত কবিতার উপমা প্রয়োগে জীবনানন্দের নৈপুণ্য তুলনাহীন। কবিতাকে তিনি মুক্ত আঙ্গিকে উত্তীর্ণ করে গদ্যের স্পন্দন যুক্ত করেন, যা পরবর্তী কবিদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে। জীবন বোধকে নাড়া দিয়েছে।
১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘ঝরাপালক’। ১৯৩০ সালের ৯ মে বিয়ে করেন রোহিনী কুমার গুপ্তের মেয়ে লাবণ্য গুপ্তকে। বিবাহিত জীবন তার মোটেই সুখের ছিল না। জীবনানন্দ দাশ বৈবাহিক জীবনে কখনো সফলতা পান নাই। বারবার ভাবতেন আত্মহত্যার কথা। ভেবেছিলেন স্ত্রী, পুত্র, কন্যা নিয়ে সাগরের জলে ডুবে মরবেন। সারাটা জীবন তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান মনে করতেন আমাদের এই বাংলাদেশকে। জীবনানন্দ দাশ কবি হলেও অসংখ্য ছোটগল্প, কয়েকটি উপন্যাস ও প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেছেন। জীবদ্দশায় তিনি এগুলি প্রকাশ করেন নাই। জীবনানন্দের বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলনে ১৯৫৩ সালে পুরস্কৃত হয়। জীবনানন্দের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থটি ১৯৫৪ সালে ভারত সরকারের সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার লাভ করে। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় এক ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে জীবনানন্দ দাশ অকালে মৃত্যুবরণ করেন।
ইতিহাসখ্যাত অর্ধবঙ্গেশ্বরী মহারানি ভবানীর রাজবাড়ী নাটোর, উত্তরাগনভবন নাটোর, কাঁচা গোল্লার শহর নাটোর, কবি জীবনান্দ দাশের বনলতা সেনের বাড়ি নাটোর। বনলতা সেন বলে কোনো নারী কি ইতিহাসে ছিল? নাকি এটি শুধু কবির নিছক কল্পনা। বিখ্যাত বনলতা সেন কবিতায় তিনবার বনলতা সেনের নাম নিয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তার মধ্যে দুবার কবি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন বনলতা সেনের আবাস ভূমি বাংলাদেশের নাটোর। কে এ সুন্দরী নারী? কী তার পরিচয়? নাটোরে বনলতা সেন নামের কোনো মায়াবতী মেয়ের সঙ্গে কী জীবনানন্দ দাশের আদৌ পরিচয় ছিল? তার চেয়ে বড় কথা কবি কি কখনো নাটোরে পদার্পণ করেছিলেন?
নলতা সেন বইটি হাতে নিয়ে গোপাল চন্দ্র রায় একবার কবিকে জিজ্ঞাসা ও করেছিলেন ‘দাদা আপনি যে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন, এই বনলতা সেনটা কে? এই নামে সত্যি আপনার পরিচিত কোনো মেয়ে ছিল নাকি?’ এতগুলো প্রশ্ন শুনে শুধু মুচকি হেসেছেন কবি কিন্তু কোনো উত্তর দেননি। বনলতা সেন বিষয়ে আজীবন এই নীরবতা বজায় রেখেছেন কবি, মনের অজান্তেও কখনো কোনো প্রিয়জনের কাছে বনলতা সেনের কোনো কাহিনী বর্ণনা করেন নি। তবে কবি নীরব থাকলেও গবেষকরা কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। বনলতা সেনের অন্বেষণে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাননি তারা। এমনকি জীবনানন্দ দাশ কখনো নাটোরে পদার্পণ করেছিলেন কিনা এ ব্যাপারে ও কোনো তথ্য উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছেন গবেষকরা।
জীবনান্দ দাশের অন্য লেখায়ও নাটোরে তার আগমন সম্পর্কে অধ্যাবধি কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে গবেষকদের কাছে বনলতা সেন রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে এক রহস্যময়ী নারী। তবে গবেষকরা বনলতা সেন কে রহস্যময়ী মানবী হিসেবে চিত্রিত করলে কী হবে, নাটোরের মানুষের কাছে কিন্তু অধ্যাবধি বনলতা সেন রক্ত মাংসের মানুষ, পরম আপনজন। এমন কি তাকে কেন্দ্রকরে স্থানীয় ভাবে গড়ে উঠেছে কয়েকটি কাহিনি। যদিও এসব কাহিনি ইতিহাসের কোনো সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত হয়নি তথাপি আসুন কাহিনিগুলো শোনা যাক-
জীবনানন্দ দাশ একবার ব্যক্তিগত কাজে ট্রেনে করে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। তখনকার দিনে নাটোর হয়ে যেত দার্জিলিং মেল। একাকী নির্জন কামরায় বসে আছেন কবি। হঠাৎ নাটোর স্টেশনে অপরূপ সুন্দরী একটা মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে উঠলেন এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধের নাম ভুবন সেন। তিনি নাটোরের বনেদি সুকুল পরিবারের ম্যানেজার। ভুবন সেনের সঙ্গিনী কামরায় তারই বিধবা বোন বনলতা সেন। অচিরেই পথের ক্লান্তিতে ট্রেনের কামরায় ঘুমিয়ে পড়েন ভুবন সেন। কামরায় জেগে থাকেন শুধু দু’জন-জীবনানন্দ দাশ আর বনলতা সেন। এই নীবর মুহূর্তে বনলতা সেনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন কবি। এমনিতেই মুখচোরা কবি, একান্ত একসঙ্গে কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। একসময় মাঝ পথে কোনো এক স্টেশনে নেমে যান বনলতা সেন।
কামরায় আবার একা হয়ে যান জীবনানন্দ। বনলতা সেন চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন কবির মনে এক বিষণ্নতার ছাপ। তারই অবিস্মরণীয় প্রকাশ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’। দ্বিতীয় কাহিনীর কেন্দ্রেও আছেন ভুবন সেনের বিধবা বোন বনলতা। তবে ঘটনাস্থল এবার ট্রেন নয় ভুবন সেনের বাড়ী। নাটোর বেড়াতে গেছেন জীবনানন্দ দাশ। অতিথি হয়েছেন নাটোরের বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর বাড়িতে।
এক দুপুরে সুকুল এস্টেটের ম্যানেজার ভুবন সেনের বাড়িতে নিমন্ত্রণ। ভুবন সেনের বিধবা বোন বনলতা সেনের ওপর পড়েছে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব। খাবারের বিছানায় বসে আছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। হঠাৎ অবগুণ্ঠিত এক বিধবা বালিকা শ্বেত শুভ্র বসনের চেয়েও অপরূপ এক সৌন্দর্যমণ্ডিত মুখ। চমকে উঠলেন কবি। এত অল্প বয়সে বিধবা বসন! কবির মনকে আলোড়িত করে। হয়তো বা সে সময় দু-একটি কথাও হয় কবির সঙ্গে বনলতা সেনের। তারপর একসময় নাটোর ছেড়ে যান কবি। সঙ্গে নিয়ে যান এক অপরূপ মুখের ছবি। সেই ছবি হয়তো পরবর্তীতে কবিকে পথ দেখিয়েছে অন্ধকারে, চারদিকে সমুদ্র সফেনের ভেতর ও খুঁজে পেয়েছেন শান্তির পরশ। তৃতীয় কাহিনির ঘটনাস্থলও নাটোর। নাটোর রাজবাড়ির চাকচিক্য তখন ভুবন জোড়া। অর্ধবঙ্গেরশ্বরী রানি ভবানীর রাজবাড়ীতে যে ঐশ্বর্যের সমাবেশ ঘটিয়ে ছিলেন, তার মৃত্যুর পর ও সেই সৌন্দর্যের অনেকটাই ধরে রেখেছিলেন পরবর্তী বংশধররা। বিখ্যাত কীর্তিমান মানুষদের নিয়মিত পদচারনায় তখনো মুখরিত রাজবাড়ী। তাদের আদর-আপ্যায়নে কাহিনি ও ছিল কিংবদন্তিতুল্য।
এমনই সময়ে নাটোরের কোনো এক রাজার আমন্ত্রণে রাজবাড়ীতে বেড়াতে আসেন কবি জীবনানন্দ দাশ। সেখানে দুদিন অবস্থানও করেন। কবির দেখাশোনার জন্য কজন সুন্দরীকে নিয়োগ করেন স্বয়ং রাজা। তাদের সেবায় ও অতিথি পরায়নে মুগ্ধ হন কবি, এদের একজনের প্রতি জেগে ওঠে কবির আলাদা মমতা। সেই মমত্ববোধ থেকে কবি তাকে নিয়ে লিখতে চান কবিতা। লোকলজ্জার ভয়ে শিউরে ওঠে ওই নারী। কবিকে অন্য কোনো নামে কবিতা লিখতে অনুরোধ করেন তিনি। রোমান্টিক কবি তার এ মানসপ্রিয়ার নাম দেন ‘বনলতা সেন’। এভাবেই কল্পনা ও কাহিনিকে ঘিরে সবার কাছে এক রহস্যময়ী নারীসত্তা হিসাবে চিরঞ্জীব হয়ে আছে জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন। আর নাটোরের নামটি বাংলা সাহিত্যে হয়ে উঠেছে আর এক কিংবদন্তি নগরী।
জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আমাদের আগ্রহ ও বিস্ময় প্রায় অন্তহীন। বিশ শতকের অন্যকোনো বাঙালি কবি আমাদের কল্পনায় এমন প্রবলভাবে দাগ কাটেনি। আজ ও তার কবিতার অলঙ্কার শব্দ ব্যবহার এবং অধূনা আবিষ্কৃত গদ্যের ভাষা আমাদের ক্রমেই বিস্মিত করে চলেছে। জীবনানন্দের মৃত্যুর ৬৫ বছর পরও তিনি সমকালীন বাংলা কাব্য সাহিত্যের প্রধান কবি হিসেবে অধিষ্ঠিত।
কেকে/এমএ