ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বাকি ছয় দিন। আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ ১৭ বছরের অপশাসনের পর এই নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা। মানুষ আশা করেছিল, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; যার মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার আসবে। কিন্তু সেই আশা ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার পক্ষপাতমূলক আচরণ ও একটি দলের কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের ভোট জালিয়াতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকদিন ধরেই বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রশাসনের বড় একটি অংশ একটি দল ও জোটের দিকে ঝুঁকে আছে। বিশেষ করে এনসিপির প্রতি প্রধান উপদেষ্টার পক্ষপাত অনেকটাই প্রকাশ্যে। অন্যদিকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জামায়াতপন্থিদের আধিপত্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরে ব্যালট পেপারের সিল উদ্ধারে জামায়াত নেতার সংশ্লিষ্টতা নতুন করে অনাস্থার সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা একটা লক্ষণ যে নির্বাচন জালিয়াতির মেকানিজম সক্রিয়। এতে জনমনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে যে, এবারও আওয়ামী লীগমার্কা নির্বাচনই হতে যাচ্ছে। তবে এই অনস্থা কাটাতে সরকারেই উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। না হলে ভোটাররা আস্থা ফিরে পাবে না।
লক্ষ্মীপুরে ভোটের অবৈধ ছয়টি সিল উদ্ধারের ঘটনায় বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, এই ঘটনার পর জনমনে প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে তাহলে কি তাদের হাতে ব্যালট পেপার বা ব্যালটের কোনো সফট কপিও আছে? গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি। জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘এটার অর্থ হলো সফট কপিটা কোনো না কোনোভাবে আমরা পেয়ে যাব, যেটাকে পরে আমরা ইজিলি প্রিন্ট করে নিতে পারব। নাহলে ভোট দেওয়ার সিলটা আসলে কেন পাওয়া যাবে? এটা খুবই অ্যালার্মিং ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ভোটের সিল পাওয়ার এই ঘটনা দেশজুড়ে ভোটের ফলাফলকে নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত করার অংশ কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘মাথায় রাখতে হবে, এটা কি শুধু স্থানীয়ভাবে একজন নেতা করছেন, নাকি এটা কোনো রকমের প্ল্যানের অংশ। নানা রকমের প্ল্যানের কথা আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছায়া : গত মঙ্গলবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর শহরের পুরোনো আদালত রোডের মারইয়াম প্রেস থেকে ভোটে ব্যবহারের অবৈধ ছয়টি সিল, একটি কম্পিউটার, একটি মুঠোফোনসহ সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গত বুধবার গ্রেপ্তার প্রিন্টিং প্রেসের মালিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফের নির্দেশে এসব সিল তৈরি করা হয়েছে বলে সোহেল রানা আদালতকে জানিয়েছেন।
নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় বলে মনে করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পেরেছিলেন; কারণ, তিনি নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নিলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে তো আওয়ামী লীগ পার্টিসিপেট করছে না। পার্টিসিপেট করছে সেই দলগুলো, যারা শেখ হাসিনাকে সেখান থেকে বিদায় করেছে। ভালো নির্বাচন চাই বলে, সংস্কার চাই বলে। সেই দলগুলোর এক্সিস্টেন্সের মধ্যে নাগরিকেরা কিন্তু আশ্বস্ত না যে একটা খুবই ভালো মানের নির্বাচন হবে।’ তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ভালো নির্বাচন করা সম্ভব হলে একটা ভিন্ন বাংলাদেশ দেখা যাবে।
বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (ব্রেইন) পরিচালক সফিকুর রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট গণনায় ধীরগতির শঙ্কা, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ এবং ভুঁইফোড় পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়গুলো নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারে। তিনি এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, এত দিন শঙ্কা ছিল, দেশে নির্বাচন হবে কি না, এখন নতুন শঙ্কা ভোট সুষ্ঠু হবে কি না। তিনি বলেন, যারা নির্বাচনকে বানচাল করতে চায়, তারা এখন মরণকামড় দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র রুখতে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। যদিও নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তাদের বিভিন্ন কাজে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। রাশেদ আল তিতুমীর নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে অতিরিক্ত ভোটার স্থানান্তরের ঘটনা, নির্বাচনের দিন ভোট গণনায় অতিরিক্ত সময় লাগার আশঙ্কা, ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মতো অভিযোগগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে এই উদ্বেগগুলো সম্পর্কে আমাদের জানানো দরকার। কমিশন প্রমাণ করবে, নাগরিকদের এসব উদ্বেগের কোনো সত্যিকার বাস্তবতা নেই।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ বলেন, নির্বাচনে কারচুপির জন্য একটি আসনের সব কেন্দ্রে কারচুপি করতে হয় না। নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রে পরিকল্পিতভাবে কারচুপি করলেই ভোটের ফলাফল পরিবর্তন সম্ভব। বাংলাদেশে যারা এই ষড়যন্ত্রে সঙ্গে যুক্ত, তারা ইতোমধ্যে এই কাজকে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অনেক জনপ্রিয় প্রার্থী ভোট দেওয়ার পাশাপাশি জনগণকে ভোট পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘প্রার্থীদের এই আহ্বান প্রমাণ করে, আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কতটা নাজুক। প্রার্থীদের এই আহ্বান মানুষকে উদ্বেগে রাখবে। অনেক মানুষ এই উদ্বেগের কারণে ভোটকেন্দ্র নাও আসতে পারেন।’
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, নির্বাচনে কারচুপির মধ্যে দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান কারচুপির ঘটনা ঘটে। দৃশ্যমান কারচুপির অনেক কিছু তফসিল ঘোষণার আগেই করা হয়। আর অদৃশ্য কারচুপিগুলো তফসিল ঘোষণার পর বা নির্বাচনের দিনও করা হয়। তিনি নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের কারচুপি ঠেকাতে জোরাল ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করার আহ্বান জানান।
কেকে/এজে