বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা খাতে নতুন যুগে ঢুকেছে। সমরাস্ত্র তৈরিতে পৃথিবীর প্রযুক্তিনির্ভর দেশগুলোর সাথে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সমরাস্ত্র উৎপাদনে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। গেল মাসে চীনের সাথে ড্রোন উৎপাদনে চুক্তি সই হয়। এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে জাপানের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। চুক্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সমরাস্ত্র উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছে।
আইএসপিআর বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা সেনানিবাসে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সম্পর্কিত একটি চুক্তি সই হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিটি সই করেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসান এবং জাপানের পক্ষে সই করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইডা শিনিচি। এ চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব নতুন উচ্চতায় উন্নীত হলো।
চুক্তির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে দুদেশ। আর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি এ চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে।
দুই দেশই নিজ দেশের প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধি সাপেক্ষে এবং এ চুক্তির বিধান অনুসারে অন্য পক্ষকে নির্ধারিত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। সঙ্গে অনুচ্ছেদ-২’-এর বিধান অনুসারে মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। এ জাতীয় প্রকল্পগুলো হবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখার জন্য, যৌথ গবেষণা, উন্নয়ন এবং উৎপাদন প্রকল্পের জন্য। পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য।
চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত প্রকল্পগুলোর জন্য হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি নির্ধারণের জন্য যৌথ কমিটি করতে হবে। জাপানের পক্ষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র এবং অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন করে প্রতিনিধি থাকবে।
একইভাবে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি ও সরকার মনোনীত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একজন প্রতিনিধি যৌথ কমিটিতে থাকবে।
হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক তথ্য কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে জাতীয় বিভাগগুলোতে জানানো হবে। আর এ অনুসারে প্রদত্ত প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি জয়েন্ট কমিটি দ্বারা নির্ধারিত হবে।
এ চুক্তি বাস্তবায়নে অন্য বিষয়ের সাথে হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি, হস্তান্তরের দেশগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং হস্তান্তরের বিস্তারিত শর্তাবলি সম্পর্কে উভয় পক্ষের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে করা হবে। জাপানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হবে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের হবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ চুক্তি অনুসারে কোনো দেশই হস্তান্তরিত কোনো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির মালিকানা বা দখল পূর্ব লিখিত সম্মতি ব্যতীত, এমন কোনো ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করবে না, যিনি সে দেশের ঠিকাদার ও উপঠিকাদারসহ কোনো কর্মকর্তা বা এজেন্ট নন অথবা অন্য কোনো সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে না।
প্রতিটি পক্ষ নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি সাপেক্ষে, দেশগুলোর মধ্যে প্রযোজ্য অন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রযোজ্য ব্যবস্থা অনুসারে এবং এ চুক্তি অনুসারে হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত গোপনীয় তথ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ জন্য জাপানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ।
এ চুক্তি অনুসারে নেওয়া সব ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিধিমালা এবং বাজেট বরাদ্দের সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করা হবে। চুক্তিটি পাঁচ বছরের জন্য করা হয়েছে। তবে, পরবর্তী স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিবছর এ চুক্তির মেয়াদ বাড়বে। তবে, কোনো দেশ যদি কূটনৈতিক মাধ্যমে ৯০ দিন আগে অপর দেশকে এ চুক্তি বাতিল করার ইচ্ছা সম্পর্কে লিখিতভাবে অবহিত না করে।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সাল থেকে উভয় পক্ষের নিবিড় ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ এ চুক্তিটি স্বাক্ষর সম্ভব হয়েছে। এ চুক্তি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করবে বলে আশা করা হয়। এ চুক্তিটি জাতিসংঘ সনদের নীতিগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতি রেখে সম্পাদন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উন্নত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম অধিগ্রহণ এবং যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করবে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর হবে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরের ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক বিশেষজ্ঞ বিনিময় বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে উভয় দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক ও সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হয়।
এদিকে, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চুক্তিটি ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এ চুক্তিটি জাপান ও বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য একটি আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। যাতে যৌথভাবে নির্ধারিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে চুক্তিটি প্রতিটি নির্দিষ্ট হস্তান্তর নির্ধারণ, নিশ্চিত করার পদ্ধতি ও হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মৌলিক নিয়মাবলি নির্ধারণ করেছে। এ চুক্তি জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে হস্তান্তরিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।
আশা করা হচ্ছে, এ চুক্তি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জাপান এবং বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা, জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য উৎপাদন, প্রযুক্তিগত ভিত্তি বজায় রাখা ও উন্নত করার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে।
কেকে/এমএ