সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,
২৭ মাঘ ১৪৩২
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শিরোনাম: ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল নিতে বাধা নেই      নির্বাচনের ফল প্রকাশ কবে, জানাল ইসি      ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে : হামিম      ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারি      অচলাবস্থা কাটিয়ে অপারেশনে ফিরল চট্টগ্রাম বন্দর      নাকভিকে কৃতজ্ঞতা জানালেন বুলবুল, যেসব বিষয়ে আলোচনা হলো লাহোরে      দূরপাল্লার বাস চলাচল নিয়ে যা জানা গেল      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতায় নির্বাচন
রায়হান আহমেদ তপাদার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৪৩ এএম আপডেট: ০৫.০২.২০২৬ ৪:৪৮ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সন্নিকটে। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরই বাংলাদেশে ভোট। ইতোমধ্যে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানামুখী তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপও ততই বাড়ছে। ভারত ও চীনের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্র দুটি নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বললেও যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর কূটনীতিকরা এ বিষয়ে বেশ সরব। ক্রমেই ভোট নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে কূটনৈতিক মহলে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের বিভাজন বিদ্যমান। বিগত কয়েক দশকে নির্বাচন এলেই এই বিভাজন একটি প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। আর ঠিক এই সময় বিভাজনকে কেন্দ্র করে বিদেশি কূটনীতিকদের একধরনের ভূমিকা পালন করতেও দেখা যায়। তারা তখন তুলনামূলকভাবে বেশি তৎপর হয়ে ওঠেন। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই বিভাজিত রাজনীতির মেরুকরণে কূটনীতিকদের তৎপরতাকে ব্যবহার করতে চায়। আর বিরোধীদের তৈরি করে দেওয়া এই সুযোগ কাজে লাগান বিদেশি কূটনীতিকরা। বিরোধীদের তৈরি করা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালান। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা নানা ধরনের পদক্ষেপ নেন এবং বক্তব্য প্রদান করেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তাই কূটনীতিকদের এমন ভূমিকা আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে। তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন, তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছেন। আমরা জানি, নির্বাচনের আগে অনেক কিছুই ঘটে, অনেক ঘটনাই সামনে আসে। এগুলো নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের কিছু দেখি না। বিদেশিরা মূলত নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেন। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৌশলগত স্বার্থ যদি ঠিক থাকে, তাহলে তারাও নীরব হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেই সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

একটি দেশ কোনো বিষয়ে বক্তব্য দিলে অন্য দেশ তা কেন মেনে নেবে—এমন প্রশ্ন স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের ইস্যুতে বক্তব্য দিচ্ছে, তখন রাশিয়াও পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। কারণ পৃথিবী এখন আর আগের মতো নেই। এসব নতুন কিছু নয়। তবে দেশের অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক কাঠামো যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে বিদেশিরা এমন সুযোগ নিতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো অনেক দেশের অগণতান্ত্রিক সরকারের ব্যাপারেও নিশ্চুপ থাকে। সেসব দেশের সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও তারা কথা বলে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ প্যালেস্টাইন। সেখানে ইসরায়েল সরকারের দখলদারত্ব ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় পশ্চিমারা এখনো নীরব। বরং তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনেই ইসরায়েল এসব অগণতান্ত্রিক নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থা যখন প্যালেস্টাইনে গণহত্যার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে, তখনও পশ্চিমাদের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে। যদি পশ্চিমা দেশগুলো সত্যিই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি এতটা শ্রদ্ধাশীল হতো, তাহলে ইসরায়েলের প্রতি এই সমর্থন কেন বজায় থাকত?

আমরা এটাও দেখেছি, আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে আধিপত্য বজায় রাখলেও সেখানে কোনো গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। মিশরে নির্বাচিত সরকার উৎখাতে তারা সেনা-সমর্থিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। এ ধরনের বহু উদাহরণে দেখা যায়, সেখানে গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। সুতরাং বিদেশিদের ভূমিকা আদৌ কতটা গণতন্ত্রের পক্ষে—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

মূল কথা হলো, আমাদের দেশের রাজনীতির বিভাজন যতদিন থাকবে, ততদিন এসব বিষয়ও থাকবে। কিন্তু এতে গণতন্ত্রের কী লাভ হচ্ছে, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এদিকে চীন রাজনৈতিক বিষয়ে পশ্চিমা কূটনীতিকদের তৎপরতাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

চীন কোনো দলের পক্ষে নয়; তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে। ফলে কোনো দল ক্ষমতায় থাকল বা না থাকল, সেটি তাদের কাছে মুখ্য নয়। একই কথা ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন পর্যন্ত ভারতের হাইকমিশনারের মুখ থেকে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ আলোচনায় আসেনি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই বাংলাদেশের রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকসহ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে বড় দলগুলোর যোগাযোগ বাড়ে। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর অতিরিক্ত উৎসাহ কূটনীতিকদের নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এবারের বিশেষত্ব হলো বড় কূটনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মেরুকরণ। পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আবার এর বিপরীতে চীনের রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার কারও নেই।

ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক অনুষ্ঠানে বলেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের প্রশ্নে বাংলাদেশের যে অবস্থান, চীন তা সমর্থন করে। এর পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আদৌ কোনো হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না। অনেক রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকের মতে, বিশেষ করে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে বিদেশি হস্তক্ষেপের নজির রয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, কূটনীতিকদের তৎপরতাকে সরাসরি হস্তক্ষেপ বলা ঠিক নয়; বরং রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগেই তারা চাপ সৃষ্টি করেন। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়ী করেন তারা।

এ ছাড়া বিদেশিদের বক্তব্য যদি কোনো দলের বিপক্ষে যায়, সেই দল সেটিকে চাপ বা হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেয়। ফলে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বিদেশি কূটনীতিকদের কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছেন। তারা সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা নতুন কিছু নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার প্রভাবশালী দেশগুলোর অনেক কূটনীতিকের বক্তব্যে কোনো না কোনো পক্ষের প্রতি অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ কারণেই বিদেশি হস্তক্ষেপ বা চাপের বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে।

যদিও রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে বিদেশি তৎপরতাকে হস্তক্ষেপ বলতে রাজি নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো—দেশের বহু ইস্যুতে তারা একমত হতে না পারলেও এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান প্রায় একই। তবে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিদেশি কূটনীতিকরা ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ নিচ্ছেন কি না—এই প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম জাতীয় ইস্যুতেও ঐকমত্য নেই। এই সুযোগেই প্রভাবশালী দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলছে, আর নির্বাচনের আগে সেই তৎপরতা আরও বাড়ছে। কূটনীতিকরা অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনো দেশ নয়; উন্নয়ন সহযোগী ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে তারা মত প্রকাশ করতেই পারেন।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এখনো একটি গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় বিদেশিরা এমন সুযোগ পাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ যতদিন থাকবে এবং নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে না পারবে, ততদিন বিদেশিদের কথা বলার ও চাপ সৃষ্টির সুযোগ থেকেই যাবে।

নির্বাচন এলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা যেমন সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও তাদের সক্রিয় করার উপাদান জোগান দেওয়া হয়। বিদেশি কূটনীতিকদের উন্মুক্ত তৎপরতা এখন চলছে, ভবিষ্যতেও চলতে পারে। বাস্তবে দেশের রাজনৈতিক দুর্বলতাই কূটনীতিকদের এই তৎপরতার সুযোগ করে দেয়।

আমাদের রাজনীতিতে যতদিন সুস্থ ধারার প্রত্যাবর্তন না হবে, ততদিন বিদেশিদের নাক গলানোর প্রবণতাও বন্ধ হবে না। নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরা না করে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকাই আমাদের রাজনীতির বড় দুর্বলতা। রাজনীতিবিদরা যদি নিজেদের সংশোধন না করেন, তবে বিদেশিদের আনাগোনা কখনোই বন্ধ হবে না। এর ফলে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, সুফল আসবে না। তাই সময় থাকতে সময়ের মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতিকদের।

কেকে/এলএ
আরও সংবাদ   বিষয়:  নির্বাচন  
মতামত লিখুন:

সর্বশেষ সংবাদ

ফরিদপুরে নির্বাচনি এলাকায় ব্যালট হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন
লালমনিরহাটে দুলুর মিছিলে মিশে গেল ভিক্ষুক থেকে পেশাজীবী
রাজশাহী বিভাগে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে ২,৭৮৬ টি
বিএনপি প্রার্থী তুহিনের নির্বাচনি মিছিল ও গণসংযোগ
বিএনপির প্রার্থী মিন্টু নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে : জামায়াত প্রার্থী ফখরুদ্দিন

সর্বাধিক পঠিত

শারজাহে প্রবাসী সনাতনী ঐক্য পরিষদের জমজমাট পিঠা উৎসব
মোবাইল নিয়ে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশ্বাস ইসির
মৌলভীবাজার-৪ আসনে নুরে আলম হামিদীর ইশতেহার ঘোষণা
রংপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী সুজনের নির্বাচনি পথসভা
ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের মোবাইল বহনে নিষেধাজ্ঞায় বিওজেএর উদ্বেগ

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close