মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের মাঝাইল–মান্দারতলা, মালোপাড়া ও রাজধরপুর এলাকায় মধুমতী নদী থেকে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বলগেট নৌযানে করে বিভিন্ন স্থান থেকে বালু তুলে বিক্রি করার ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব, অন্যদিকে নদীপাড়ের শতাধিক পরিবার পড়েছে চরম ঝুঁকির মুখে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গত দুই বছর ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র মাঝেমধ্যে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করলেও গত দুই মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন রাত আনুমানিক ১১টা থেকে সকাল পর্যন্ত ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে মধুমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে বলগেট নৌযানে করে অন্যত্র বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার গন্ধখালী গ্রামের একটি প্রভাবশালী চক্র এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। তাদের লাগাতার কার্যক্রমের ফলে ইতোমধ্যে মধুমতী নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী একটি মন্দিরসহ শতাধিক পরিবারের বসতভিটা হুমকির মুখে পড়েছে।
আগামী বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে এই অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং ভাঙন দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এতে শতাধিক পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
নদীপাড়ের বাসিন্দা শুকুমার বিশ্বাস বলেন, “মধুমতী নদী থেকে এভাবে ধারাবাহিকভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে আমরা নদীপাড়ের শতাধিক পরিবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ব। আমাদের বসতভিটা ও জমিজমা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চাই।”
একই এলাকার বাসিন্দা সুজলা রায় বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র এই নদী থেকে ড্রেজার ও ট্রলারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমাদের এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা রাতে সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকি। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাই।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলা থেকে এসে তারা নদী থেকে বালু উত্তোলন করে নিয়ে যায়। আমরা নিষেধ করলে শোনে না; বরং আমাদের বকাঝকা ও মারধর করে। প্রশাসনকে অবহিত করলে প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে আবার বালু উত্তোলন শুরু করে। আমাদের পুরোনো পৈতৃক ভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেলে আমাদের আর থাকার জায়গা থাকবে না। তাই সরকারের কাছে আবেদন, রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন যেন বন্ধ করা হয়।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘‘আমার নির্বাচিত এলাকা মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের মাঝাইল–মান্দারতলা ও রাজধরপুর এলাকার পাশ দিয়ে মধুমতী নদী প্রবাহিত। এই নদী থেকে রাতের আঁধারে একটি চক্র অবৈধভাবে ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে নদীর তীর মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং শতাধিক পরিবার ভয়াবহ নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—দ্রুত যেন অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয় এবং নদীভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’’
এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ সালেক মূহিদ বলেন, ‘‘নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগেই বালু উত্তোলনকারীরা পালিয়ে ফরিদপুর জেলার সীমানায় চলে যায়। বালু উত্তোলনে জড়িত ব্যক্তিরা যেহেতু অন্য জেলা ও উপজেলার বাসিন্দা, তাই সংশ্লিষ্ট জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। তারা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’’
তিনি আরও বলেন, মাঝাইল–মান্দারতলা–রাজধরপুর এলাকায় নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে প্রশাসনের নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে, তাই এ বিষয়ে আমাদের জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হবে।
নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান, ড্রেজার ও বলগেট নৌযান জব্দ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
কেকে/এলএ