ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আর বাকি ৮ দিন। দেশজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা। এই ভোটের আমেজের মধ্যেও থেমে নেই ষড়যন্ত্র। বিশেষ করে ভোট জালিয়াতির নীলনকশা বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লেগেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটি দেশজুড়ে নিয়মিত প্রচারণার পাশাপাশি নানা কৌশলে ভোট পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে জামায়াতের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া মাঠ প্রশাসনে জামায়াতপন্থিরা আধিপত্য বিস্তার করেছে।
সর্বশেষ গত (৩ জানুয়ারি) মঙ্গলবার রাতে লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে প্রস্তুত ভোটের সিল জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত ভোট জালিয়াতির বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাদের একাধিক ইউনিটকে কাজে লাগাচ্ছে। লক্ষ্মীপুরে যে ভোটের সিল উদ্ধারকাণ্ডে জামায়াত নেতা আটক হয়েছে এটা একটা সংকেত। এর অর্থ হচ্ছে জামায়াতের এমন পরিকল্পনা আছে যে, তারা ব্যালট জালিয়াতি করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ, তারা সমর্থকদের মাধ্যমে গোপনে সিল মারা ব্যালট কেন্দ্রে প্রবেশ করিয়ে সেগুলো ভোটবাক্সে ফেলবে। পরবর্তীতে এ জালিয়াতি যাতে করে ধামাচাপা দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করবে মাঠপ্রশাসনে থাকা জামায়াতপন্থিরা।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, ভোট জালিয়াতিতে নারী কর্মীদের ব্যবহার করতে পারে জামায়াত। দলটির নারী কর্মীরা এরই মধ্যে নির্বাচনি পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কিছু উপদেষ্টা ও প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তির আচরণে সন্দেহ দানা বাঁধছে। প্রশাসনের একটি অংশ এনসিপি ও জামায়াতের দিকে ঝুঁকে আছে।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জামায়াত তার লোকদের সেট করেছে। তারা নানাভাবে জামায়াতের পক্ষে কাজ করেছে। তার একটি প্রমাণ পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীকের অবস্থান। ব্যালটে এমন স্থানে থানের শীষ প্রতীক রাখা হয়েছে যা সহজে চোখে পড়ে না। বিএনপি থেকে এ নিয়ে অভিযোগও করা হয়েছিল।
এ ছাড়া, প্রশাসন ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন এনসিপি ও জামায়াতের প্রতি সহানভূতিশীল বলেও এই বিশ্লেষকের অভিযোগ। তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিন পর মানুষ ভয়হীন পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু তাদের রায় কতটা প্রতিফলিত হবে তাই দেখা বিষয়। তিনি আশঙ্কা করছেন, প্রশাসনে জামায়াতের আধিপত্য তাতে, আরেকটি পাতানো নির্বাচনের শঙ্কা থেকেই যায়।
জামায়াত নেতার অর্ডারে অবৈধভাবে ভোটের সিল তৈরি : লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে প্রস্তুতকৃত ভোটের সিল জব্দের ঘটনায় জামায়াত নেতা জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে। জামায়াত নেতা সৌরভ হোসেন শরীফ ও ব্যবসায়ী সোহেল রানার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। এ মামলায় আটক সোহেলকে পুলিশ গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তবে আত্মগোপনে রয়েছেন জামায়াত নেতা শরীফ। ঘটনার পর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা জামায়াতের আমির।
গতকাল বুধবার (৪ জানুয়ারি) দুপুরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে একই থানার এসআই হুমায়ুন কবীর বাদী হয়ে শরীফ ও সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
অভিযুক্ত শরীফ লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি ও দক্ষিণ বাঞ্ছানগর এলাকার মো. শাজাহানের ছেলে। তিনি হাসপাতাল রোডের ‘আধুনিক অফসেট অ্যান্ড ডিজিটাল সাইন’ এর মালিক। জাল ভোট প্রদানের লক্ষ্যে শরীফ অর্ডার দিলে সোহেল সিলগুলো বানিয়ে দোকানে রেখেছিল বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি নিয়ে মঙ্গলবার রাতে জেলা শহরের গোডাউন রোড এলাকায় বশিরভিলা হলরুমে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে করে লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এই সিলকাণ্ডে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, ‘সিলসহ সোহেল রানা নামে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনি জামায়াতের কর্মী বলে জানতে পেরেছি। হয়তো তার পদ-পদবিও রয়েছে। একটি কম্পিউটারসহ ছয়টা সিল জব্দ করা হয়েছে। সিলগুলো যিনি বা যারা বানিয়েছেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে অনেক কলকবজা রয়েছে, একটা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাব-নিকাশ রয়েছে।’
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের জামায়াত প্রার্থী এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, সিলগুলো জব্দের পরপরই শরীফকে আমরা দল থেকে বহিষ্কার করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এর প্রেস রিলিজ দেওয়া হবে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সোহেল সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের টুমচর গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে ও জেলা শহরের পুরাতন আদালত সড়কের মারইয়াম প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার বিকালে তার দোকান থেকে ১৬ ঘর বিশিষ্ট ৬টি ভোটের সিল, একটি কম্পিউটার ও একটি মোবাইল জব্দ করে পুলিশ। পরে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
আটক সোহেল রানার বরাত দিয়ে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, জামায়াত নেতা শরীফ ৩০ জানুয়ারি সোহেলের কাছে ৫টি নির্বাচনি সিলের অর্ডার করে। এ সংক্রান্ত একটি ভয়েস ম্যাসেজ তিনি সোহেলকে হোয়াটস অ্যাপে পাঠায়। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণার মাধ্যমে জাল ভোট প্রদানের লক্ষ্য অবৈধভাবে ভোটের সিল তৈরি করানো হয়েছে।
সেনা সদস্যদের সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীর অশালীন আচরণ : ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এসএম খালেকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে অশালীন ভাষা ও গালিগালাজের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। গতকাল নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, ডা. খালিদুজ্জামান তার ব্যক্তিগত গানম্যানসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এ সময় সেখানে দায়িত্বরত সেনাসদস্যরা তাকে বাধা দিয়ে জানান, নিয়ম অনুযায়ী সেনানিবাসের ভেতরে অস্ত্র বা সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেনা সদস্যদের এই পেশাদার আচরণে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তাদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন।
এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের আলটিমেটাম : এদিকে দায়িত্বরত সেনা সদস্যদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগে ডা. এস এম খালিদুজ্জামানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে ‘এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন’। নাহলে তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ‘পারসোনা নন গ্রেটা’ (পিএনজি) বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করার জোরালো দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ খান সাইফ (অব.)-এর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী খালিদুজ্জামান ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অস্ত্রসহ প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিলে তিনি সেনা সদস্যদের উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ ও অবমাননাকর মন্তব্য করেন। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের আচরণ সামরিক বাহিনীর মনোবল, মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত।
কেকে/এলএ