জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ওপর ভর করে চলছে জামায়াতে ইসলামীর ধারাবাহিক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পাঁয়তারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরাতে কোথাও আইনি প্রক্রিয়া, আবার কোথাও ভয়-ভীতি ও মব তৈরি করা হচ্ছে।
যার সামনে থেকে কাজ করছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল— এনসিপি এবং আড়ালে থেকে রসদ জোগাচ্ছে জামায়াত। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে রিট করেছেন ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রিটে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। নাহিদ ইসলামের পক্ষে আইনজীবীরা হলেন, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা, অ্যাডভোকেট আলী আজগর শরীফী।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে ড. এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন নাহিদ ইসলামের আইনজীবীরা। এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মূসা বলেন, এ সপ্তাহেই হাইকোর্টে রিট আবেদনটির ওপর শুনানি হবে।
রিট শেষে আইনজীবীরা বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম এ কাইয়ুম হলফনামায় তার ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব থাকার তথ্য গোপন করেছেন। এ তথ্য পরে প্রকাশ হয়েছে এবং সে তথ্যগুলো আপনারা ইতোমধ্যে দেখেছেন। সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য মিডিয়ায় তার পাসপোর্টের ছবি দেখা গেছে।
আইনজীবী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী যারা দ্বৈত নাগরিক, যারা অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, তারা সংসদ সদস্য নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুপযুক্ত। এ ছাড়া এ বিষয়টি তিনি তার হলফনামায় গোপন করেছেন। এ দুটি বিষয়কে সামনে রেখে নাহিদ ইসলাম আজকে একটি রিট মামলা দায়ের করেছেন।
এ ছাড়া হলফনামা তথ্য গোপনের অভিযোগে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের বিএনপির আরেক প্রার্থী মীর শাহে আলমের প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করেছে জামায়াত। গতকাল সোমবার বগুড়া জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে এ আবেদন দাখিল করেন শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বগুড়া শহর জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আলমগীর হোসাইন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ অনুযায়ী কোনো প্রার্থী হলফনামায় তথ্য গোপন বা মিথ্যা ঘোষণা প্রদান করলে তার মনোনয়নপত্র বাতিলযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, মীর শাহে আলম বর্তমানে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)-এর পরিচালক পদে বহাল রয়েছেন। অথচ মনোনয়নপত্রে এসব তথ্য গোপন করে তিনি মিথ্যা ঘোষণা প্রদান করেছেন। আবেদনকারী দাবি করেন, বিসিকের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ না করেই মীর শাহে আলম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, যা নির্বাচন আইন ও আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ছাড়া দাখিলকৃত হলফনামায় মীর শাহে আলম উপজেলার অন্তত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাজার ও মসজিদ কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এসব পদ থেকেও পদত্যাগের কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল তিনি জমা দেননি।
এ বিষয়ে জেলা সিনিয়র নির্বাচন অফিসার ফজলুল করিম বলেন, আইন অনুযায়ী এখন আর প্রার্থিতা বাতিলের কোনো সুযোগ নেই। আর এসব পদ থেকে তিনি যেহেতু নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না, তাহলে এটা অবশ্যই অলাভজনক পদ। তিনি বলেন, এতদিন পর এসব অভিযোগ কেন? প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের দিন এসব অভিযোগ দিতে পারতেন।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল ওহাব বলেন, জামায়াত নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু শিবগঞ্জের মানুষ ধানের শীষকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে, ইনশাআল্লাহ।
এর আগে ঋণখেলাপি ইস্যুতে বিএনপির দুই প্রার্থী কুমিল্লা-৪ আসনে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ও ১০ আসনে আবদুল গফুর ভূঁইয়া নির্বাচন থেকে বাদ পড়েন। প্রার্থিতা ফিরে পেতে এ দুজনের লিভ টু আপিল বা আপিলের অনুমতি চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। গতকাল রোববার সকালে প্রধান বিচারপতির জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দিয়েছেন।
এর ফলে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী থাকল না। এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও ১১ দলের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। এরও আগে মঞ্জুরুল আহসানের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেছিলেন এনসিপির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি আপিলে অভিযোগ করেছিলেন, বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে শুনানি শেষে গত ১৭ জানুয়ারি হাসনাত আবদুল্লাহর আপিল মঞ্জুর করে ইসি।
এতে মঞ্জুরুল আহসানের মনোনয়নপত্র অবৈধ হয়। ইসির এ সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে মঞ্জুরুল আহসান হাইকোর্টে রিট করেন। শুনানি নিয়ে গত ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিটটি সরাসরি খারিজ করে আদেশ দেন। এরপর হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে মঞ্জুরুল আহসান আপিল বিভাগে আবেদন করেন। গত ২৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগ শুনানি ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করেন। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশের প্রত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে তিনি নিয়মিত লিভ টু আপিল করেন। ৩০ জানুয়ারি লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি শেষে আপিল বিভাগ গত ১ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুরুল আহসানের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন।
এদিকে কুমিল্লা-১০ আসনে আবদুল গফুর ভূঁইয়া নির্বাচন করতে না পারলেও এ আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে পারবেন বলে আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
গফুর ভূঁইয়ার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে দাবি করে গত মাসে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন একই আসনের বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজী নূরে আলম সিদ্দিকী। ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের শুনানি শেষে গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল করে। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আবেদন জানিয়ে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন আবদুল গফুর ভুঁইয়া। ২২ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট আবেদন খারিজ করে দেন।
রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং আইনজীবী নাসির উদ্দিন আহমেদ আসিম। কাজী নূরে আলম সিদ্দিকীর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও এ এস এম শাহরিয়ার কবির। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মো. ফয়জুল্লাহ।
কেকে/এমএফ