সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,
২৭ মাঘ ১৪৩২
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শিরোনাম: ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল নিতে বাধা নেই      নির্বাচনের ফল প্রকাশ কবে, জানাল ইসি      ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ হাসিনার নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে : হামিম      ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারি      অচলাবস্থা কাটিয়ে অপারেশনে ফিরল চট্টগ্রাম বন্দর      নাকভিকে কৃতজ্ঞতা জানালেন বুলবুল, যেসব বিষয়ে আলোচনা হলো লাহোরে      দূরপাল্লার বাস চলাচল নিয়ে যা জানা গেল      
খোলাকাগজ স্পেশাল
এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রিতে নৈরাজ্য, নির্বিকার সরকার
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:২৩ এএম আপডেট: ০১.০২.২০২৬ ১০:৩০ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। 

সরকার নির্ধারিত মূল্য জানতে চাইলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সিলিন্ডার দিতে অস্বীকৃতি জানালেও অতিরিক্ত টাকা দিলে গোপন স্থান থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। বাজারে এই নৈরাজ্য চললেও কার্যকর নজরদারি ও অভিযানের অভাবে সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যেন নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। ফলে সরবরাহ ঘাটতি, একক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। 

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, অনেক দোকানে ‘সিলিন্ডার নেই’ বলা হলেও পেছন দরজা দিয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। 
সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। তবে বর্তমানে বিভিন্ন দোকানে ২০০০  থেকে ২৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন। 

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বলছেন, গ্যাসের বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে মাসিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা বিলকিস বেগম। তাদের বাসায় তিতাস গ্যাসের সংযোগ থাকলেও দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। খুব ভোরে কিংবা গভীর রাতে কখনো কখনো অল্প সময়ের জন্য গ্যাস পাওয়া যায়। ফলে রান্নার কাজ চালাতে নিয়মিতই বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাকে।

বিলকিস বেগম বলেন, মাসের শুরুতেই তাকে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়। এটি এখন তাদের পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে এই সিলিন্ডার কখনোই কেনা সম্ভব হয় না। প্রতিবারই নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হয়। তিনি জানান, দোকানদারদের কাছে দামের বিষয়ে জানতে চাইলে বলা হয়, ‘এই দামে নিতে হলে নিতে হবে, না হলে সিলিন্ডার নেই।’ অনেক সময় দেখা যায়, সামনে বলা হচ্ছে গ্যাস নেই, কিন্তু পেছনে বেশি দাম দিলে অন্য ক্রেতাকে সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে।

গত সপ্তাহের অভিজ্ঞতা আরও হতাশাজনক ছিল বলে জানান মেরিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘মিরপুরের আশপাশের বেশ কয়েকটি দোকানে ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি। সবাই বলেছে সিলিন্ডার নেই। শেষে বাধ্য হয়ে পরিচিত একজনের মাধ্যমে বেশি দামে সংগ্রহ করতে হয়েছে।’

বিলকিস বেগমের অভিযোগ, নিয়মিত অতিরিক্ত টাকা দিতে সংসারের মাসিক খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ‘গ্যাস বিল তো দিচ্ছিই, আবার রান্না করতে গিয়ে আলাদা করে সিলিন্ডারের জন্য এত টাকা দিতে হচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের জন্য এটা বড় চাপ।

মিরপুরের আরেক গৃহিণী বলেন, ‘দোকানদার বলেছে সিলিন্ডার নেই। পরে অন্য একজন বেশি দাম দিতে চাইলে তাকেই সিলিন্ডার দেওয়া হয়েছে। আমরা জানতে চাইলে বলে—নিতে হলে বেশি দিতে হবে, না হলে নেই।’
রাজধানীর মান্ডা এলাকার বাসিন্দা কাজলী বেগম। তার বাসায় তিতাস গ্যাসের সংযোগ থাকলেও লাইনে গ্যাস পাওয়া যায় খুব সীমিত সময়ের জন্য। সেটিও মূলত গভীর রাতে বা ভোরের দিকে। দিনের বেলায় চুলায় গ্যাস না থাকায় নিয়মিত রান্নার জন্য তাকে প্রতি মাসে অন্তত একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়।

কাজলী বেগম জানান, বেশ কিছুদিন ধরে সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার কেনা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রতিবারই বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। দোকানে গিয়ে সিলিন্ডার চাইলে প্রথমে বিক্রেতারা জানান, গ্যাস সিলিন্ডার নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বলা হয়, ২ হাজার ৫০০ টাকা দিলে সিলিন্ডার দেওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘বিকল্প কিছু না থাকায় বাধ্য হয়েই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। গ্যাস বিল দিচ্ছি, আবার রান্না করতে গিয়ে আলাদা করে এত টাকা খরচ করতে হচ্ছে।’

বিলকিস বেগম ও কাজলী বেগমের মতো রাজধানীর অনেক বাসিন্দাই একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, বাজারে নজরদারি জোরদার না হলে এই ভোগান্তি কমবে না। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। খুচরা দোকানে গ্যাস চাইলে প্রথমে বিক্রেতারা জানান, ‘গ্যাস নেই’, ‘সাপ্লাই বন্ধ’ বা ‘মাল আসেনি’। তবে কিছুক্ষণ পরই বলা হয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা দিলে গোপন স্থান থেকে সিলিন্ডার এনে দেওয়া যাবে।

সরেজমিন দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে ইলেকট্রিকের দোকান, মুদি দোকান কিংবা অন্যান্য খুচরা ব্যবসায়ীরাই মৌসুমি গ্যাস ব্যবসায়ীর ভূমিকায় নেমেছেন। বৈধ ডিলার না হয়েও তারা এলপিজি সিলিন্ডার মজুত করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছেন। 
মিরপুর ১০ নম্বর বাংলা স্কুলের বিপরীত পাশের একটি দোকানে এখনো ছোট সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া মিরপুর ৬০ ফিট পাকামসজিদের গলি এবং পাবনা গলিতে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব এলাকায় একটি একক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। একজন স্থানীয় ব্যক্তি গ্যাস বিক্রির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন এবং নিজের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছেন। তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউ পাচ্ছেন না বলেও জানান তারা। স্থানীয়রা বলছেন, বাজারে নজরদারি না থাকায় এই অনিয়ম চলছে। দ্রুত প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান না চালালে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। 

একজন খুচরা বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘ডিস্ট্রিবিউটররা নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার দিচ্ছে না। আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কয়েকজন ডিস্ট্রিবিউটর।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান না থাকায় ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। 
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে অনেকেই অভিযোগ না করায় সব অনিয়ম আমাদের নজরে আসে না।’ তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত দামে বিক্রি প্রমাণিত হলে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের বিধান রয়েছে। নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর দেশে এলপিজি আমদানি প্রায় দেড় লাখ টন কমেছে। বিশেষ করে বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি কমার হার বেশি ছিল, যা বাজারে সংকট তীব্র করেছে। বর্তমানে এলপিজির সংকট মূলত সরবরাহজনিত। গত নভেম্বর পর্যন্ত ১৭০টি জাহাজ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল এবং ডিসেম্বরে আরও ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। ফলে ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি চীনের মতো বড় ক্রেতারা বৈশ্বিক বাজার থেকে বেশি এলপিজি কিনছে, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও চাপের মুখে পড়েছে। 

এলপিজি সিলিন্ডারের বাজারে চলমান অস্থির পরিস্থিতির জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশকেই দায়ী করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তার মতে, বছরের পর বছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তিনি বলেন, এই অবস্থার জন্য সরকারই মূলত দায়ী। কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে রেখে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।

কেকে/এমএফ


মতামত লিখুন:

সর্বশেষ সংবাদ

বিএনপি প্রার্থী তুহিনের নির্বাচনি মিছিল ও গণসংযোগ
বিএনপির প্রার্থী মিন্টু নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে : জামায়াত প্রার্থী ফখরুদ্দিন
ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল নিতে বাধা নেই
মাদারীপুর-৩ আসনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার দাবিতে জামায়াত প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন
সরকার গঠন করতে পারলে প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ : তারেক রহমান

সর্বাধিক পঠিত

শারজাহে প্রবাসী সনাতনী ঐক্য পরিষদের জমজমাট পিঠা উৎসব
মোবাইল নিয়ে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশ্বাস ইসির
মৌলভীবাজার-৪ আসনে নুরে আলম হামিদীর ইশতেহার ঘোষণা
রংপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী সুজনের নির্বাচনি পথসভা
ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের মোবাইল বহনে নিষেধাজ্ঞায় বিওজেএর উদ্বেগ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close