ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১১ দিন বাকি। দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সংঘাত। প্রাণহানিও ঘটছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি প্রচারণার বাগবিতণ্ডা এখন রূপ নিচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীর মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
এই পরিস্থিতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, গণভোট ঘিরে পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন থাকবে- এমন প্রশ্নও সামনে আসছে। নির্বাচনি জনসভায় একে অন্যের প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ছেন। কথার লড়াইয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচনি মাঠে মেজাজ হারাচ্ছেন নেতাকর্মীরা।
বিশেষ করে রাজনৈতিক মাঠে বড় শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে লক্ষ্য করে ছোড়া তীরে যেন বিদ্ধ হচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। মেজাজ নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। এমনকি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কমিটি গঠন ও পদ-পদবিকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ককে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এক নেতা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুইজন। নিহত আজাহারুল ইসলাম (৫৫) রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি।
এ ছাড়া গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনি সহিংসতায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল শনিবার ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নির্বাচনি প্রচারকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। সকালের দিকে উপজেলার টবগী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মুলাইপত্তন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে বোরহানউদ্দিন থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জামায়াত নেতা আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে ২০-৩০ জন দলটির ভোলা-২ আসনের প্রার্থী মাওলানা মুফতি ফজলুল করিমের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন। এ সময় তারা বিএনপি কর্মী আয়ুব আলীর বাড়িতে প্রচারের জন্য প্রবেশ করেন। তখন দুপক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয় এবং একপর্যায়ে দুই দলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা হাতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
তাছাড়াও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার উপজেলার জগন্নাথদিঘি ইউনিয়নের হাটবাইর গ্রামে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চৌদ্দগ্রাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জামায়াতের সমাবেশ শেষে নেতাকর্মীরা বাড়ি ফেরার পথে জগন্নাথদিঘি ইউনিয়নের হাটবাইর গ্রাম এলাকায় পৌছলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের দেখে বিভিন্ন ধরণের উসকানিমূলক কথা বলতে থাকেন।
এ সময় জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু মাহমুদ কাওসার হোসেন বলেন, খবর পেয়ে থানা পুলিশের একটি টিম ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌছেন। বর্তমানে পরিস্থতি শান্ত রয়েছে।
এর আগে শুক্রবার নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ফেরি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিএনপি ও এনসিপির সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
এ ছাড়া গত বুধবার শেরপুর-৩ আসনে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম। যদিও শেরপুরের সহিংসতার ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। আর এসব সহিংসতা প্রতিরোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তারা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আট দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩৫৩ জন। ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ৬৫টি। এতে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন।
তপশিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীদের প্রচারণা শুরু হয়। ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত প্রচারণা চালানো যাবে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, ‘ভোট সম্পন্ন করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরপর যদি দু-চারটি ঘটনা ঘটে, তা নির্বাচনের জন্য বড় বাধা নয়। আমাদের যা যা করণীয়, তা নিচ্ছি।’
মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রমে যে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগের কারণ। গত আট দিনে দেশে অন্তত ৪২টি সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু ও সাড়ে তিনশর বেশি মানুষের আহত হওয়া স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় নির্বাচনি পরিবেশ এখনও নিরাপদ ও সহনশীল হয়ে ওঠেনি।’’
তপসিল ঘোষণার পর ২০০ সহিংসতা
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী তপসিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে ২০০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ৯টি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ৭৩টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ২টি, হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন ৮টি, প্রচারকাজে বাধা ২২টি, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অফিস, প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ১৪টি, আক্রমণাত্মক আচরণ ১৫টি, রাজনৈতিক হত্যা ৪টি, সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ ১টি, অবরোধ-বিক্ষোভ ১১টি এবং অন্যান্য কারণে সহিংসতার ঘটনা ৪২টি।
ভোটের প্রচারে ঘুরে ফিরে ‘দোষারোপের রাজনীতি’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর বার্তা ছিল ‘সমালোচনা’ আর ‘দোষারোপের রাজনীতি’ এড়ানোর। তবে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হতেই অতীতের মতো সেই পথই বেছে নিয়েছে তারা। আনুষ্ঠানিক প্রচারের শুরু থেকেই দুই বড় জোটের তরফে একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
কখনও নেতারা সরাসরি বলছেন, কখনও কোনো দলের নাম না নিয়ে আকারে ইঙ্গিতে অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন, কখনওবা বিভিন্ন অভিযোগ আনছেন পরস্পরের বিরুদ্ধে। শুধু বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য নয়, ভোটের প্রচারকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
তার বলছেন, দেশে দীর্ঘদিন সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু না হওয়ায় দলগুলো এমন প্রচার কৌশল থেকে বের হতে পারেনি। ভোটের লড়াইয়ে নেতারা যেসব বক্তব্য রাখছেন তা সংঘাত উসকে দিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ বলেন, ‘যে কথাটা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়-সেই উপলব্ধি দলগুলোর মাঝে তৈরি না হলে সংঘাত তৈরি হতে পারে। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ না করাটাই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ।’
রাজনৈতিক দলগুলো যে অতীতের কার্যক্রম থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি- সে বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী। তিনি বলেন, ‘যে কোনো ধরনেরই উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়, সহিংসতা বাড়িয়ে দেয়, কর্মীদের মনোবল অন্যভাবে চাঙ্গা করে।’
কেকে/এমএফ