মাহমুদ নোমানের কাব্যগ্রন্থ ‘লুইজালে’ সমকালীন বাংলা কবিতার বহুস্তরবিশিষ্ট ও চিন্তাবহুল সংযোজন। এ গ্রন্থ পাঠ করতে গিয়ে প্রবেশ করি জীবনজগতে- যেখানে গ্রাম, নদী, মাছ, নারী, শরীর, মৃত্যু, ধর্ম, লোকাচার ও ব্যক্তিগত স্মৃতি একসঙ্গে মিশে এক ধরনের স্বতন্ত্র কাব্যবিশ্ব নির্মাণ করেছে। ‘লুইজালে’ কোনো একক বিষয় বা একরৈখিক অনুভবের গ্রন্থ নয়; এটি বহুধ্বনিময়, বিচ্ছিন্ন অথচ অন্তর্গতভাবে সংযুক্ত। এ সংযুক্তির মূল সূত্র হচ্ছে নন্দনতত্ত্ব- যেখানে লোকজ উপাদান আধুনিক কাব্যভাষায় রূপান্তরিত হয় এবং মিথ ও বাস্তব পরস্পরকে আলোকিত করে।
এ গ্রন্থে মাহমুদ নোমান যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন, স্বতন্ত্র বরং নিজস্ব ঐতিহ্যের ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি সমকালীন মানুষের উদ্বেগ, অস্তিত্বগত শূন্যতা, শরীরী কামনা ও ধর্মীয় দ্বন্দ্বকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছেন। আল মাহমুদের কবিতায় আমরা যেমন গ্রামকে পাই এক ধরনের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক চেতনার আধার হিসেবে, ওমর আলীর কবিতায় যেমন গ্রাম হয়ে ওঠে স্মৃতি ও নৈঃশব্দ্যের স্থান, মাহমুদ নোমানের কবিতায় গ্রাম হয়ে ওঠে সংঘর্ষের ক্ষেত্র- যেখানে শৈশবের নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, কামনা ও মৃত্যু একসঙ্গে বসবাস করে।
গ্রন্থের নাম-কবিতা ‘লুইজালে’ থেকেই এ সংঘর্ষ স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑ ‘বিলের ধারের বটগাছটি আমার মা।’ এই পঙ্ক্তি কেবল একটি চিত্রকল্প নয়; এটি এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক ঘোষণা। এখানে বটগাছ মাÑ অর্থাৎ প্রকৃতি মাতৃত্বের প্রতীক, আশ্রয় ও শেকড়ের আধার। কিন্তু এ মাতৃত্ব কোনো রোমান্টিক আদর্শ নয়; এটি বাস্তব ও নিরাবরণ। ‘বাবা হয়তো লুইজাল নিয়ে মাছ ধরতে গেছে’- এই বাক্যে পুরুষের শ্রম, অনুপস্থিতি ও জীবিকার অনিশ্চয়তা ধরা পড়ে। বোনের ‘প্যাঁকপ্যাঁক’ শব্দে শিশুর ক্ষুধা ও অসহায়তা, হাঁসের সঙ্গে তুলনা আর কবির নিজের অবস্থান- ‘আমি ঝুলছি বটগাছে— / পরগাছার ইঁয়ড়ে’- এখানে আত্মপরিচয়ের সংকট নগ্নভাবে প্রকাশিত। ‘পরগাছা’ শব্দটি কেবল দারিদ্র্যের নয়, বরং অস্তিত্বগত বঞ্চনার ইঙ্গিত দেয়। আল মাহমুদের কবিতায় শৈশব প্রায়ই নস্টালজিক; মাহমুদ নোমানের শৈশব ঝুলে থাকা, অনিশ্চিত, ক্ষুধার্ত।
এ শৈশববোধ থেকেই কবির লোকজ চেতনার জন্ম। লুইজালের কবিতাগুলোয় লোকজ শব্দ, বস্তু ও আচারের উপস্থিতি প্রবল- লুইজাল, বটগাছ, জিয়লমাছ, চিতা, উলুধ্বনি, তন্দুর, পিদিম, কদমফুল। কিন্তু এগুলো আলংকারিক সাজ নয়; এগুলো জীবনযাপনের অনুষঙ্গ। এইখানেই মাহমুদ নোমান আল মাহমুদ ও ওমর আলীর কাছাকাছি, আবার আলাদা। নোমান লোকজকে রোমান্টিসাইজ করেননি; বরং লোকজের ভেতরকার নিষ্ঠুরতা, ক্লান্তি ও শরীরী বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছেন।
‘চৈত্রের দুপুরে’ এই শরীরী বাস্তবতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। ‘চৈত্র ষোড়শীর স্তন দেখালো / ডুবুডুবু পুকুরের জলে’- এই পঙ্ক্তিতে ঋতু নারীর শরীরে রূপ নেয়। এটি উপমা নয়, এটি রূপান্তর। চৈত্র নিজেই এক কামনাময়ী সত্তা। ওমর আলীর কবিতায় প্রকৃতি ও নারীর শরীরের মধ্যে যে নৈঃশব্দ্যপূর্ণ মিল দেখা যায়, এখানে তা আরও স্পষ্ট ও প্রায় নগ্ন। কিন্তু কবি এই কামনাকে আনন্দে শেষ করেন না। ‘সাবেকি শ্রীমতী / প্রেমিকার বেহাত বেদনা’- এই উচ্চারণে কামনা পরিণত হয় স্মৃতি বেদনায়। প্রেম এখানে অধিকারহীন, অতীতমুখী। ফলে কবিতাটি শরীর ও স্মৃতির দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে থাকে।
ছবি : খোলা কাগজ
০২.
এই দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয় ‘চিতার গান’ কবিতায়। এখানে মৃত্যু, লোকাচার ও খেলনার চিত্রকল্প একসঙ্গে উপস্থিত। ‘আমি তোমার খেলার লাডুম-/ ঘুরিয়ে দাও’- মানুষ এখানে এক যান্ত্রিক খেলনা, নিয়তির হাতে ঘোরে। চিতা, কাঠ, লোহা, উলুধ্বনি, মেঘসিঁদুর- সব মিলিয়ে এক শবযাত্রার লোকজ দৃশ্য তৈরি হয়। আল মাহমুদের কবিতায় মৃত্যু প্রায়ই ইতিহাস ও জাতিসত্তার সঙ্গে যুক্ত; মাহমুদ নোমানের কবিতায় মৃত্যু ব্যক্তিগত, দেহকেন্দ্রিক এবং নির্মম। ‘পুড়িয়ে ফেলে’- এ শেষ উচ্চারণে মুক্তি ও বিনাশের সীমারেখা মুছে যায়।
‘বর্ষার প্রিয় সন্ধ্যায়’ কবিতায় মাহমুদ নোমানের চিত্রকল্প নির্মাণের দক্ষতা পূর্ণতা পায়। ‘জিয়লমাছের ঘোলাজলে-/ ডিপফ্রিজের বর্ষাকাতর সন্ধ্যা’-এই দুই পঙক্তিতে গ্রাম ও আধুনিকতার সংঘর্ষ ধরা পড়ে। ডিপফ্রিজ একটি আধুনিক, শহুরে যন্ত্র; জিয়লমাছ গ্রামীণ জীবনের প্রতীক। এই দুইয়ের সহাবস্থান কবির সময়চেতনার পরিচায়ক। ওমর আলীর কবিতায় আধুনিকতা গ্রামকে ভাঙে নিঃশব্দে; মাহমুদ নোমানের কবিতায় আধুনিকতা গ্রামে ঢুকে পড়ে এক ধরনের ঠান্ডা, নির্বিকার বিষণ্নতা নিয়ে। কবিতার শেষ দিকে- ‘ঢেউয়ের শ্বাসে নিভে যায় পিদিম’- লোকজ আলো নিভে যায়, আধুনিক অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়।
‘মৃত্যু দ্বারে দাঁড়িয়ে’ কবিতাটি সংক্ষিপ্ত হলেও দার্শনিকভাবে গভীর। ‘একটু ঘুমের জন্য মৃত্যু প্রয়োজন’- এই পঙ্ক্তি ক্লান্ত মানুষের আর্তি। এখানে মৃত্যু কোনো রোমান্টিক পরিণতি নয়; এটি বিশ্রাম। আল মাহমুদের কবিতায় মৃত্যু সংগ্রামের স্মারক; এখানে মৃত্যু অবসাদের আশ্রয়। এ পার্থক্যই মাহমুদ নোমানের সমকালীনতা।
‘মাছ সংসার’ কবিতায় নদী, জেলে ও নারী এক জীবনের অর্থনীতি নির্মাণ করে। ‘জেলেডিঙ্গির গ্রীষ্মকালীন রতিশব্দ’- এ চিত্রকল্পে শ্রম ও কামনা একাকার। লোকজ জীবনের যৌনতা এখানে গোপন নয়; এটি প্রকাশ্য ও স্বাভাবিক। আল মাহমুদের গ্রামীণ কবিতায় যৌনতা প্রায়ই প্রতীকী; মাহমুদ নোমানের কবিতায় তা বাস্তব ও ঘামমাখা।
‘পাপমোচনের কলেমা’ কবিতায় ধর্মীয় নন্দনতত্ত্ব প্রবল হয়ে ওঠে। ‘তওবার নামাজ’- এখানে ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়; এটি সামাজিক নৈতিকতার ভাষা। রিকশা, ঘুমন্ত মেয়ে, সূর্যাস্ত- সব মিলিয়ে এক শহুরে বাস্তবতায় ধর্মীয় আত্মসমালোচনা। আল মাহমুদের কবিতার মতো এখানেও ইসলামি শব্দাবলি কাব্যিক হয়ে ওঠে, তবে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায়।
‘মশকরা’ কবিতাটি আত্মব্যঙ্গের এক অনন্য উদাহরণ। ‘ভুলে গেছি গাছে চড়তে হয়!’ -এই উচ্চারণে শৈশব হারানোর বেদনা, নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা ও স্মৃতিভ্রংশ একসঙ্গে ধরা পড়ে। ছোট কবিতা, কিন্তু গভীর ক্ষত।
‘পরকীয়া’ কবিতায় বাজার, মাছ, রক্ত, সিগারেট- সব মিলিয়ে এক সহিংস নগরবাস্তবতা। প্রেম এখানে পবিত্র নয়; এটি লেনদেন, অন্ধকার ও দহন। এ কবিতায় মাহমুদ নোমান আধুনিক নগরের নৈতিক ভাঙনকে লোকজ চিত্রকল্পে ধরেছেন।
‘যদি’ কবিতা একটি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সমাপ্তি। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’- এই কালেমা কবিতাকে ঈশ্বরমুখী করে তোলে। কিন্তু এই ঈশ্বরমুখিতা প্রশ্নহীন নয়। কবি প্রশ্ন রাখেন- সমাজ কি এই তওবাকে বিশ্বাস করবে? প্রেম শেখানোর দায়ে ঈশ্বরও কি দণ্ডিত হবেন? এ প্রশ্নেই গ্রন্থের আধুনিকতা।
সব মিলিয়ে ‘লুইজালে’ একটি আধুনিক কাব্যগ্রন্থ, যেখানে লোকজ জীবন, মিথ, শরীর, ধর্ম ও স্মৃতি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আল মাহমুদ ও ওমর আলীর কাব্যঐতিহ্য এখানে স্পষ্ট, কিন্তু মাহমুদ নোমান সেই ঐতিহ্যকে সমকালীন মানুষের ক্লান্তি, অবসাদ ও অস্তিত্বগত প্রশ্ন দিয়ে পুনর্গঠন করেছেন। ‘লুইজালে’ তাই বাংলাসাহিত্যে সমুজ্জ্বল সার্থক কাব্যগ্রন্থ।