আদিবা বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজে ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। সে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে থাকে। সে নিয়মিত সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে। স্কুলের পড়া শেষ করে নাশতা করে। তারপর স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। বাবা অফিসে যাওয়ার আগে তাকে রিকশায় করে স্কুল গেটে পৌঁছে দেন। আর স্কুল ছুটির পর তার মা তাকে স্কুল থেকে বাসাতে নিয়ে আসেন। আজিমপুর গোরস্থানের পাশ দিয়ে তাদের যাতায়াত করতে হয়। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে সে প্রায়ই ফুটপাতে হতদরিদ্র লোকদের শুয়ে থাকতে দেখে। এদের মধ্যে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবক সব বয়সের লোক রয়েছে।
তাদেরকে আদিবা আগে কখনো ভাবেনি। কিন্তু আজ তার বাবা ছুটিতে বাসাতে আছেন। মায়ের পরিবর্তে তিনি গিয়েছেন আদিবাকে আনতে। স্কুল ছুটির পর সে বাবার কাছে আবদার করে যে সে রিকশায় করে যাবে না। হেঁটে হেঁটে বাসায় যাবে। বাবা তার কথায় রাজি হলেন। অবশেষে দু’জনে গল্প করতে করতে বাসার উদেশ্যে হাঁটতে থাকে। ফুটপাতে উঠতেই আদিবার নজরে পড়ে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছেঁড়া কাঁথার ওপর শুয়ে আছে। পাশে তার মা বসা। পথচারীরা তাকে অতিক্রম করতেই তার ডানহাতটা বাড়িয়ে দেয় কিছু সাহায্যের জন্য। আদিবার বাবা তাকে ১০ টাকার একটা নোট দেন।
আদিবা জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবা ওই বাচ্চাটির শীত লাগে না?’ বাবা বললেন, ‘কেন লাগবে না? ওরাও তো আমাদের মতোই মানুষ। ওদের শীত গরম সবই লাগে। আদিবা আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘গতকাল রাতে তো অনেক শীত পড়েছে। ওরা কি এখানেই খোলা আকাশের নিচে শুয়ে ছিল?’ বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, ছিল তো।’ ‘তাহলে তো বাবা ওদের অনেক কষ্ট হয়েছে।’ ‘হ্যাঁ হয়েছে। ওদের তো ঘরবাড়ি নেই। আবার শীত নিবারতের মতো কাঁথা-কম্বলও নেই। তাই ওরা যেখানে সুযোগ পায় সেখানেই কষ্ট করে শুয়ে থাকে।’ ‘কম্বল কেনারও টাকা নেই?’ ‘না, না ওরা টাকা কোথায় পাবে? ভিক্ষা করে যা পায় তা দিয়ে কোনরকমে পেটের ভাতটা জোগাড় করে।’ এভাবে গল্প করতে করতে তারা বাসাতে পৌঁছে যায়।
বাবা বাসাতে এসে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাও তার কাজে ব্যস্ত। আদিবার প্রতি কারোর কোনো নজর নেই। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার বাবার চোখে পড়ে আদিবা খাটের উপরে দাঁড়িয়ে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা বাবার ভালো লাগেনি। তিনি ভয় পেয়ে যান। কাছে গিয়ে দেখে সে কাঁদছে। তার কপোল বেয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে।
তিনি আদিবাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কাঁদছো কেন, মামনি? তোমার কি হয়েছে?’ ‘আমার কিছু হয়নি। ফুটপাতের ওই বাচ্চাটির কথা আমার খুব মনে পড়ছে। ওর কথা মনে হলে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।’ ‘এতে মন খারাপের কি আছে? এরকম শিশু তো ঢাকা শহরে অনেক আছে। তুমি কয়জনের কথা মনে করে কষ্ট পাবে?’ ‘বাবা, আমি আর কোনো শিশুর কথা মনে করতে চাই না। আমি শুধু ওর কথাই ভাবছি। ওই শিশুটার চেহারা আমার চোখের সামনে বার বার ভাসছে।’
‘এখন বল আমরা ওই শিশুটার জন্য আমরা কি করতে পারি?’ ‘আমাদের বাসাতে তো অনেক কম্বল আছে। কিছু পুরাতন কম্বল আছে যেগুলো আমরা ব্যবহার করি না। তুমি যদি ওখান থেকে একটা কম্বল ওই শিশুটার মাকে দিয়ে দাও, তাহলে ওরা ওটা ব্যবহার করতে পারবে। তাহলে ওদের শীতে কষ্ট কম হবে। মেয়ের কথা শুনে বাবা খুশি হন। তিনি বলেন, ‘তুমি যদি চাও তাহলে একটা কেন, দুটি কম্বল দেব। আগামীকাল যখন স্কুলে তোমাকে নিয়ে যাব, তখন কম্বল দুটি ওদেরকে দিয়ে দেব।’ ‘আগামীকাল কেন? যদি দিতে চাও তাহলে আজই দাও। চলো ওদের কম্বল দুটি দিয়ে আসি। কম্বল দুটি পেলে ওরা আজ রাতে আরাম করে ঘুমাতে পারবে। রাতে ওদের কষ্ট কম হবে।’
মেয়ের কথা শুনে শুধু বাবা নয়, তার মাও খুশি হয়। আদিবার মা আলমারি থেকে ০১টি নতুন আর ০১টি পুরাতন কম্বল বের করে আনে। কম্বল দুটি নিয়ে আদিবার বাবা তাকে নিয়ে ওই শিশুটার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা ওদের কাছে পৌঁছে যায়। তারা তখনো ওখানে বসা ছিল। ততক্ষণে বাচ্চাটি ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। সে মায়ের পাশে বসে খেলা করছিল।
আদিবাদের দেখে বাচ্চাটির মা ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় কিছু সাহায্যের জন্য। আদিবার বাবা ওই বাচ্চাটির মাকে বললেন, ‘তুমি কি কম্বল নিবে?’ ওই মহিলাটি কম্বলের কথা শুনে ভীষণ খুশি হয়। সে বলে, ‘কম্বল পেলে তো আমরা বেঁচে যাই, ভাই। আমার পোলাটা খুব কষ্ট করে। আদিবার বাবা বাচ্চাটির মায়ের হাতে কম্বল দুটি তুলে দেন। কম্বল দুটি পেয়ে বাচ্চাটির মা খুব খুশি হয়। তারপর আদিবা আর তার বাবা বাসাতে ফিরে যায়।
পরেরদিন আদিবা তার বাবার সঙ্গে স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয়। একটা রিকশা নিয়ে একই পথ ধরে তারা স্কুলে যেতে থাকে। গোরস্থানের নিকটে পৌঁছাতেই তাদের চোখে পড়ে সেই বাচ্চাটি তার মায়ের সঙ্গে ফুটপাতে শুয়ে আছে। তাদের দেওয়া একটা কম্বল ফুটপাতে বিছানো আর একটা কম্বল তাদের গায়ে জড়ানো। তাদের ঘুম ভাঙেনি। দু’জনা তখনো ঘুমাচ্ছিল। আদিবা খুশিতে বাবাকে বলে, “দেখ দেখ বাবা, আমাদের কম্বলটা ওরা গায়ে শুয়ে আছে। ওদের দেখে আদিবার মনটা খুশিতে নেচে ওঠে। তার চোখে মুখে আনন্দের ছাপ। আদিবার খুশি দেখে আদিবার বাবাও খুশি হন।
কেকে/ এমএস