বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলার উজিরপুর। অনেকে মনে করেন বাংলাভাষার উৎপত্তি, ক্রমবিকাশে বরিশালের উত্তরাঞ্চলের উজিরপুর, কোটালিপাড়া, বাবুগঞ্জ, আগৈলঝাড়া, গৌরনদী, কালকিনি প্রভৃতি এলাকার অনেক অবদান রয়েছে। বাঙালা শব্দের উৎপত্তিও ধরা হয় এ অঞ্চলে। উজিরপুরের মাটিতেই জন্ম নিয়েছেন বাংলাভাষার প্রথম কবি মীননাথ বা মৎসেন্দ্রনাথ। তার বাসস্থানের সঠিক নির্দেশনা না থাকলেও বর্তমান সন্ধ্যা নদীর তীরে যোগীরকান্দা নামের গ্রাম রয়েছে। মীননাথ ছিলেন যোগী। যোগসাধানা ও কাপড় বুনন করার কারণে তাদের যোগী সম্প্রদায় হিসেবে তৎকালে অভিহিত করা হতো। (সূত্র: বরিশালের ইতিহাস, সিরাজউদ্দিন আহমেদ)
প্রাচীন জনপদ এই উজিরপুরের পরতে পরতে রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার উপকরণ। এ জনপদের একটি গ্রামের নাম কাজিরা। পাশাপাশি দুটো গ্রাম হস্তিশুণ্ড ও কাজিরা। হস্তিশুণ্ড গ্রামের পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে কাজিরা মৌজার একটি বাড়ির নাম ‘ঘইড্যার বাড়ি’। এ বাড়িটির লোকজনের বংশের নাম ‘ফরাজি’। কেন মুখে মুখে ঘইড্যার বাড়ি হলো সে এক লোককথার কাহিনি।
আগে জানি ঘইড্যা শব্দের অর্থ কী? ‘ঘটি’ বা মাটির গোল হাঁড়িকে হস্তিশুণ্ড-কাজিরা এলাকায় ‘ঘডি’ বলা হয়। যেমন- ‘মোনু ঘইড্যাডা নিয়া আয়-খেজুর গাছে পাতমু।’ ঘইড্যা মানে মাটির গোল হাঁড়ি। আবার এক জাতের গোলাকার লাউ/কদু আছে। যে কদু/লাউকে বলা হয়- ‘ঘইড্যা কদু’ (ঘটির মতো গোল তাই)।
গোবর জ্বালানি
এ ছাড়া হস্তিশুণ্ড-কাজিরা এলাকায় ঘই, ঘইড্যা, লইড্যা, মুইড্যা নামেও একটা বস্তু রয়েছে। তা হলো গরুর গোবর বা মল শুকিয়ে মাটির চুলার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার উপযোগী করার পর বলা হয় ঘই, ঘইড্যা বা লইড্যা অথবা মুইড্যা। ‘ঘই’ হলো গরুর গোবর দলা দলা করে (সিঙাড়া সাইজ) রেখে রৌদ্রে শুকিয়ে মাটির চুলায় রান্নায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা। আর সেই গোবর (নরম অবস্থায়) একটি পাটকাঠি বা অন্য কোনো কাঠিতে মেখে রৌদ্রে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় তখন তাকে বলে ‘ঘইড্যা’ বা ‘লইড্যা’। গোবরকে শুকিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই ব্যবহারের প্রচলন এখনো আছে। তবে অনেক জায়গা বলে ‘গোবরের লাকড়ি’, নোয়াখালিতে ‘ঘয়ডা’ বা ঘইডা, মাদারীপুরে কালকিনি এলাকায় মুইড্যা।
তাই বলা যায়- গোবরের ঘুঁটে হলো গোবর ও খড় মিশিয়ে তৈরি করা এক ধরনের জ্বালানি যা গ্রাম বাংলায় রান্না ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ, যা মূলত গোলাকার বা লম্বাটে আকার দেওয়া হয় এবং রোদে শুকানো হয়, যা একসময় বিলুপ্তির পথে থাকলেও এখনো অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকে আছে ঘইড্যার ব্যবহার। ‘ঘুঁটে’ নামে পরিচিত অনেক এলাকায় এটির পরিচিতি আছে।
গোবর জ্বালানি
গৌরনদীর সাংবাদিক ফারুক মোল্লা জানান, তাদের এলাকায় এটাকে ‘মুইড্যা’ বলে থাকে। প্রচণ্ড রোদে এগুলো শুকানো হয়, গ্রীষ্মকাল এর জন্য উপযুক্ত সময়।
কাজিরা গ্রামের একবারে পশ্চিম-উত্তর সীমানায় ঘইড্যাদের বাড়ি। ঘইড্যা বেঁচে নেই তবে তাদের বংশধররা আছেন। টেনু ফরাজি (মৃত), ছালাম ফরাজি, কালাম ফরাজি নামে অনেকেই বেঁচে আছেন (২০২৬)। এই ফরাজি বাড়ির ঘইড্যাকে নিয়েই লোককথা রয়েছে। তার আসল নাম কি এখনো জানা যায়নি। জন্মের পর তার পেটটি মাটির ঘটির মতো বড় ও গোল ছিল তাই সবাই তাকে ঘইড্যা নামে ডাকতো। এই ঘইড্যাদের বাড়ির সাথে পশ্চিম-উত্তরে ও দক্ষিণে বিস্তীর্ণ মাঠ যেখানে ধান চাষ করা হয়। এখনো (২০২৬ সাল) চাষ হচ্ছে।
ঘইড্যার বাড়ির সঙ্গে আমাদের ‘ডাকুয়া’ বাড়ির সবার অনেক জমি রয়েছে। আমরা ওই জমির নাম দিয়েছি ‘ঘইড্যার ভুঁই’ (ঘইড্যার বাড়ির সাথে জমি)। ১৯৭১ সালের আগে বা পরে আমরা ওই জমিতে চাষাবাদের জন্য যেতাম। কামলার বিচকি (নাস্তা) ও হোক্কা-তামাক-তাওয়া নিয়ে যেতাম। কামলারা ‘একদোমক’ কাজ করার পর হুক্কা টানতো (বিশ্রাম নিতো)। সে সময় কামলার সাথে আমরাও হুক্কা টানতাম। আমাদের বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা কথায় কথায় বলতাম—
আমরা শুনেছি ঘইড্যার বাপ যখন মারা যায় তখন ঘইড্যা বাড়িতে ছিল না। সে খেতে চাষাবাদ করতে গিয়েছিল। আগের যুগে গ্রীষ্মকালে গ্রামে গ্রামে কলেরা দেখা দিতো। ওষুধ আবিষ্কার না হওয়ায় ওই সময় অনেক লোক মারা যেতো। হস্তিশুণ্ড কাজিরা এলাকায় কলেরাকে বা পাতলা পায়খানা হলে ঝোলা বলতো। এই কলেরার ভয়কেই নিয়েই ওই সময় বলা হতো ‘ঘইড্যার বাড়তে যামু না’। (ঘইড্যার বাড়ি-বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের হস্তিশুণ্ডসংলগ্ন কাজিরা গ্রামে)।