ইসলামের মৌলিক নীতির প্রশ্ন ও রাজনৈতিক আস্থাহীনতার অভিযোগ এনে অবশেষে ১১ দলের আসন সমঝোতা থেকে বের হয়ে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে ধর্মভিত্তিক অন্যতম রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছেন ইসলামী আন্দোলন ২৬৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বাকি ৩২টি আসনেও সৎ-যোগ্য ব্যক্তিদের সমর্থন দেবে। এ সময় তিনি জানান ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে।
ইসলামী আন্দোলনের এ সিদ্ধান্তের পর দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। নেতাকর্মীরা অনেকেই তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের খুশির খবর জানান দেন। কোথাও কোথাও মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উদযাপন করার খবরও পাওয়া গেছে।
তবে এ ঘোষণার ফলে বিপাকে পড়েছে দেশের প্রধান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। অনেকটাই বদলে গেছে তাদের আসন জয়ের হিসাব-নিকাশ। দলটির সম্ভাব্য অধিকাংশ আসনগুলোতে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার কথা ছিল ইসলামী আন্দোলনের। এখন তারা সঙ্গে না থাকায় এই আসনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে জামায়াতের জন্য। অপরদিকে জামায়াত জোটে অন্য যে দলগুলো আছে তাদের নির্দিষ্ট কোনো ভোটব্যাংক না থাকায় বেড়ে গেছে হতাশা। যা রীতিমতো চিন্তায় ফেলছে দলটির নেতাকর্মীদের। এ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যেও এক ধরনের উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের সমীকরণ বলছে জামায়াতের সঙ্গে এখন যে দলগুলো সমঝোতায় আছে, মাঠপর্যায়ে এসব দলের তেমন ভোট বা সাংগঠনিক অবস্থান নেই। জোটের অন্যতম সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নানা ইস্যুতে কিছুটা আলোচনায় থাকলেও; বাকি দলগুলো নামকাওয়াস্তে চালাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। এমনকি ভোটের মাঠে অনেকেই তাদের চেনেনও না। ফলে চরমোনাই পীরের দল জোটে না থাকায় অনেক সম্ভাব্য আসন জেতা কঠিন হয়ে যাবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের।
একই আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরাও। জানতে চাইলে ইসলামবিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ খোলা কাগজকে বলেন, ‘জোট ভেঙে যাচ্ছে এটা এখনই বলা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে মনোয়নয়পত্র প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত কিছু একটা ঘটতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত যদি কোনো কারণে এ জোট ভেঙে যায়, তাহলে আগামী নির্বাচনের মাঠে জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। কারণ, আগামী নির্বাচনে দলটির অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এরমধ্যে অনেক আসনে জয়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এসব আসনে ইসলামী আন্দোলনের ভোট দলটিকে বিজয়ী করতে সহায়ক হবে। কিন্তু যদি দলগুলো বিভক্ত হয়ে যায়, সেই সম্ভাবনা থাকবে না।’
এদিকে জোট ভেঙে একক নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে জামায়াতকে নিয়ে কিছু অভিযোগ তুলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের আত্মসম্মানে লেগেছে। প্রথম দিন থেকেই জামায়াত আমির চরমোনাই পীরকে (মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম) ইনসাল্ট (অপমান) করেছেন। তিনি জরিপের (একটি জাতীয় পত্রিকার জরিপ) কথা বলে আমাদের আমিরকে ইনসাল্ট করেছেন। সেদিনই আমাদের আমির বলেছেন, তাদের হয়তো মতলব ভালো না। আমরা দেখলাম শেষ পর্যন্ত তারা এই জরিপের মধ্যেই ছিলেন। তারা বলেছেন, আপনাদের তো অনেক আসন দেওয়া হয়েছে, জরিপে তো এত পার্সেন্ট না।’
গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘প্রচলিত আইনে ৫৪ বছর রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, এই আইন ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সব সময় বলে এসেছি প্রচলিত আইনের পরিবর্তে আল্লাহর আইন, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করি। এখন যদি দেখি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি আল্লাহর আইন নয়, প্রচলিত আইন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করবে, তখন আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। জোটবদ্ধ ইসলামী সংগঠনগুলোর প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তবে তারাও যেন জামায়াতের এসব নীতির ব্যাপারে ক্লিয়ার হয়ে নেন।’
তিনি বলেন, ‘একটি কারণই নয়, রাজনৈতিক কারণের মধ্যে হচ্ছে আমরা যখন একইসঙ্গে নির্বাচন করব তখন উভয়ের পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকতে হবে। জামায়াত নেতারা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সরকার গঠন করবেন। আমাদের প্রশ্ন হলো তিনি একটি জোটে আছেন, এখানে জাতীয় সরকার হবে, নাকি দলীয় সরকার হবে- এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। তিনি (জামায়াত আমির) তো এ বিষয়টি আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। নির্বাচনের আগেই যদি সমন্বয় হয়ে যায় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে, তাইলে এ নির্বাচন পাতানো হবে কি-না, সমঝোতার হবে কি-না সেটিও সন্দেহ চলে আসে। ফলে আগামী দিনের সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি না এ আশঙ্কাটা আমাদের মধ্যে আছে। যখন আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধার জায়গা ভেঙে যায়, তখন জোট থাকে না।’
দলটির মুখপাত্র বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এতে আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। তারা ইসলামের আদর্শ থেকে ভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর লাখ লাখ কর্মী সমর্থক আল্লাহর আইন থেকে সরে গেলেন। প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র শাসনের কথা বলায় আদর্শ থেকে বিচ্যুতি হয়েছে। জামায়াত ক্ষমতাকেই বড় করে দেখছে। আমরা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা হতে চাই না।’
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের নেতা গাজী আতাউর রহমানের বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াত আদর্শচ্যুত হয়নি এবং কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, সম্মিলিতভাবেই এগিয়ে চলার একটি প্রক্রিয়া চলছিল। জোটভুক্ত ১০ দলের মধ্যে ইতোমধ্যে ২৫৩টি আসনের বণ্টন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪৭টি আসন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিষয়ে জোটের লিয়াজোঁ কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রসঙ্গত, ইসলামি ভোটের ‘এক বাক্স নীতি’র আলাপ তুলেছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। পরে জামায়াতে ইসলামীসহ মোট আট দল নিয়ে একটি জোট হয়। এ জোটের অন্যতম শরিক ছিল ইসলামী আন্দোলন। পরে এ জোটে এনসিপি, বিডিপি ও এবি পার্টিও যোগ দেয়। তবে এ জোটে জামায়াতের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে ইসলামী আন্দোলন। গত বুধবার জোটের আসন সমঝোতার ঘোষণা আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়ার কথা ছিল। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় তা ঘোষণা দিতে পারেনি জোটটি। গত বৃহস্পতিবার ইসলামী আন্দোলনকে রেখেই ২৫৩ আসনে জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এরপর গতকাল এককভাবে ২৬৮ আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিল ইসলামী আন্দোলন।
কেকে/ এমএস