বেশ কিছু অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে হাত দিতে পারছে না প্রভাবশালীদের দোকান স্থাপনায়। প্রভাবশালীরা ঠিকই তাদের দখলদারত্ব বজায় রেখে মাসিক মাসোহারা নিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রকাশের পর ও বনখেকোদের কর্তৃক বন্যহাতি হত্যার পর টনক নড়েছে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের।
কক্সবাজারের উখিয়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সরকারি খাস জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা প্রায় ২৫০টি অবৈধ দোকানঘর উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন। পাশাপাশি প্রায় শতাধিক বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং ১৫টি বিদ্যুৎ মিটার জব্দ করেছে বলে জানিয়েছে বনবিভাগ। গত বছরের ২০ নভেম্বর উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ এ অভিযান পরিচালিত হয়।
জানা যায়, বালুখালী মরা গাছতলা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনে অবৈধভাবে দোকানঘর নির্মাণ করে দখলদাররা ব্যবসা পরিচালনা করছিল। এতে একদিকে বনাঞ্চল ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়ছিল, অন্যদিকে সরকারি খাস জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছিল।
অভিযানে উপস্থিত বন কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, সংরক্ষিত বন দখল ও সরকারি জায়গা দখলকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলবে। পরিবেশ রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান। উচ্ছেদ অভিযানে উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। চলমান এ অভিযানকে স্থানীয় সচেতন মহল স্বাগত জানিয়েছে।
এদিকে উখিয়ার বনবিভাগের বিভিন্ন জায়গা দখল করে আইএনজিও ও এনজিওদের কাছে থাকা বনের জায়গায় স্থাপনায় এখনো হাত দিতে পারেনি বনবিভাগ।
২০১৭ সালে বিশাল একটি অংশ মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা দেশের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন জায়গায় স্থান নিলে বনের প্রায় কয়েক হাজার একর জমি তাদের দখলে চলে যায়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এনজিও ও আইএনজিও বন কেটে পরিষ্কার করে তাদের অফিস বানিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
ঠিক তেমনি উখিয়ার ওয়ালাপালং এলাকার মুহুরীপাড়া এলাকায় বনের বিশাল এলাকা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে স্থাপনা করে অফিসের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে মাইশা এন্টারপ্রাইজ। গত বেশ কয়েক বছর আগে বনের জমিতে বিশালাকার ওয়্যার হাউস ও অফিস করে এই কোম্পানির ম্যানেজার রাশিক খান নিজের দাপট দেখিয়ে অফিস পরিচালনা করে আসছে বলে জানা গেছে। তার দাপটে স্থানীয়রাও সহজে তাদের অফিসে ঢুকতে পারে না। অফিসের সামনে সবসবময় কয়েকজন যুবক বসিয়ে রাখেন যেন বাইরের কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। প্রতিবেদক অফিসে গেলে ক্যামরাম্যানকে বাইরে চলে যেতে বলে এবং কোন প্রকার ভিড়িও না করার জন্য বারণ করে রাশিক নিজেই।
এদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নির্মিত স্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনা করার অপরাধে ছয় এনজিওকে নোটিস দিয়েছিল বনবিভাগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বনভূমিতে গড়ে ওঠা উখিয়ার আলোচিত মধুরছড়া জঙ্গি আস্তানা উচ্ছেদের পর এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মাসিক ৭ লাখ ৫০ টাকা চুক্তিতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ডাব্লিউএফপিকে বনভূমির জায়গাটি ভাড়া দেয় সাবেক উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী।
সম্প্রতি প্রতিবেদক উখিয়া উপজেলার বনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা যায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বনের জায়গা দখল করে এনজিও আইএনজিওগুলো তাদের অফিস ও ওয়্যার হাউসের নামের বনের জমি দখল করে আছে।
এ ব্যাপারে এনজিও ও আইএনজিও প্রতিনিধিদের সাথে কথা হলে তারা বলছেন, দখল এনজিও করেনি তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে স্ট্যাম্পমূলে মাসিক ভাড়া নিয়েছে।
উখিয়া উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বনভূমি দখল বেশ কয়েকটির নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে মাইশা এন্টারপ্রাইজ, জনসেবা কেন্দ্র, ব্র্যাক, ডাব্লিউএফপি, ইউএনএইচসিআর, আইওএম, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনসহ বেশ কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানকে বনবিভাগ থেকে নোটিস প্রদান করা হলে বনবিভাগের নোটিসের কোনো উত্তর দেননি বলে জানা গেছে।
এদিকে মাইশা এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার রাশিক খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘আমার জায়গাটা ভাড়ায় নিয়েছি হাজী শামশুল আলম থেকে। এর চাইতে বেশি তথ্য প্রয়োজন হলে আমার কোম্পানির সাথে কথা বলতে পারেন।’’ তবে তারা কোন কাগজ দেখাতে পারেনি প্রতিবেদককে।
অন্যদিকে বনের বিশাল জায়গা দখল করে ইউনাইটেড ন্যাশন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডাব্লিউএফপি) তাদের ওয়্যার হাউস করেছে ওয়ালাপালং এলাকার মধুরছড়া এলাকায়।
সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে গেটে দারোয়ান সাংবাদিক পরিচয় পেলে ভেতরে ঢুকতে বাধা প্রদান করে এবং ভিতর থেকে লিটন ভূইয়া নামের একজন কর্মকর্তা সিকিউরিটি গার্ডের কক্ষের সামনে এসে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, আপনার ভিজিটিং কার্ড হেড অফিসে পাঠানো হবে। সেখান থেকে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
এর পাশেই আরো একটি বিশাল বনভূমি দখল করে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) নামের আরেকটি আইএনজিও বাউন্ডারি দিয়ে ঘিরে তাদের কার্জক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বনবিভাগ এই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র অপারেশনস অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মো. নাহিদকে নোটিস প্রদান করা হলেও তার কোনো উত্তর দেননি এই প্রতিষ্ঠান। মো. নাহিদের সঙ্গে প্রতিবেদক দেখা করতে চাইলে সিকিউরিটি গার্ড জানান, তিনি সাংবাদিকেদের সঙ্গে দেখা করবেন না তিনি ব্যস্ত আছেন।
অন্যদিকে উখিয়ার ফলিয়াপাড়া এলাকায় বনের জমিতে ব্র্যাকের কার্যক্রম নজরে এসেছে। ভিতরে যেতেই সামনে বিশালাকার গরুর খামার নজরে আসে। সেখানে কাজ করছে আব্দুল্লাহ নামের একজন। একটু আগে গেলে বেশ কয়েকজন মহিলা কাজ করছে এমনটা দেখা গেছে। এর দায়িত্বে আছেন রিতা বড়ুয়া নামের একজন। তিনি জানান, এটি ব্র্যাকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে আমরা হোস্ট কমিউনিটির জন্য কাজ করছি।
ব্র্যাকের ডিপিএম কক্সবাজারের কর্মকর্তা শাহরিয়ার শাহা জানান, ‘‘আমাদের প্রজেক্টের জায়গা নির্ধারণের জন্য একটি টিম রয়েছে। মূলত তারাই এই জমি স্ট্যাম্প করে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। যদি বিস্তারিত জানতে চান যারা জায়গা নির্ধারণ করে চুক্তিনামা করেছে তাদের সাথে আপনার কথা বলতে হবে।’’
একটি সূত্র বলছে, এইসব এনজিও-আইএনজিও এলাকার বিভিন্ন মানুষদের হাতে নিয়ে জমি ভাড়ায় নিয়েছে বলে তাদের সঙ্গে স্ট্যাম্প করে মাসে কোটি টাকা নিজেদের পকেটে ভরছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের প্রভাব ও আন্তর্জাতিক প্রভাব খাটিয়ে বনের জায়গায় স্থাপনা করে বনের আইন অমান্য করছে বলে জানান সচেতন মহল।
উখিয়ার মুহুরীপাড়ার ইব্রাহিম নামের একজন অবৈধ দখলদার বনের জমি দখল করে এনজিও ফোরামকে ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইব্রাহিম জানান, ‘বনের জায়গা এটি আমি মেনে নিচ্ছি। তবে এখন এই জমি এখন আমদের দখলে। আমরা আবাদ করে প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়েছি।’
সমাজের সচেতন মহল বলছে, বনের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে মাসে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি দখলবাজ সিন্ডিকেট। যদি সরকারিভাবে এইসব এনজিওকে লিজ দেওয়া হতো তবে বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো যা এখন দখলবাজদের হাতে যাচ্ছে।
উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, ‘যেসব এনজিও ওআইএনজিও বনের জায়গায় স্থাপনা করেছে তাদের নোটিস প্রদান করা হয়েছে। তারা কোনো ধরনের জবাব দিতে পারেনি। তাদের বিরুদ্ধে মামলার মাধ্যমে আদালতের রায় নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
উল্লেখ্য, কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের উখিয়া রেঞ্জে ১৪ হাজার হেক্টরের অধিক বন থাকলেও রোহিঙ্গা, বিভিন্ন এনজিও, আইএনজিও ও স্থানীয়রা হাজার হাজার একর বন দখল করে ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) যারীন তাসনিম তাসিনের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে বুধবার বিকালে দু’বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে উখিয়ার বনে ৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১৫৫৩টি অবৈধ সংযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বন কর্মকর্তারা জানান, ক্রমান্বয়ে সব বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সহায়তায়। কারণ তারা এই সংযোগ প্রদান করেছে তারাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন।
কেকে/ এমএস