বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সমঝোতার পরে মাঠে ফিরছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)। ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা ও সমঝোতার পর শুক্রবার থেকে বিপিএল ২০২৬ পুনরায় শুরু হচ্ছে। এর মধ্যে দিয়ে বোর্ড পরিচালক এম নাজমুল ইসলামকে ঘিরে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তারও আপাতত সমাধান হয়েছে।
বিসিবি জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার স্থগিত হওয়া ম্যাচগুলো নতুন সূচি অনুযায়ী শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোর সূচিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের এক মন্তব্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকটে গত বৃহস্পতিবার বিপিএলের ম্যাচ মাঠে গড়ায়নি। ক্রিকেটাররা বয়কটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করায় দিনের দুটি ম্যাচই স্থগিত করা হয়।
এই সমঝোতার পরপরই বিপিএলের নতুন সূচি প্রকাশ করেছে বিসিবি। বোর্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্ধারিত ম্যাচগুলো এখন অনুষ্ঠিত হবে শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি। এ ছাড়া ১৬ ও ১৭ জানুয়ারির জন্য নির্ধারিত ম্যাচগুলো এক দিন করে পিছিয়ে যথাক্রমে ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা এলিমিনেটর ও কোয়ালিফায়ার-১ ম্যাচও এক দিন পিছিয়ে ২০ জানুয়ারি আয়োজন করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বিসিবির সঙ্গে আলোচনার পর কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন জানান, ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় তারা আবার মাঠে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মিঠুন বলেন, এম নাজমুল ইসলামের মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং কোয়াব সেটিকে সমর্থন করে না। তবে বোর্ডের সঙ্গে ‘হেলদি ডিসকাশন’-এর মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বোর্ড তাদের দাবিগুলো দ্রুত প্রক্রিয়াগতভাবে এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই গতকাল থেকে আবার খেলায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ক্রিকেটাররা।
ভারতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে না গেলে ক্রিকেটাররা ক্ষতিপূরণ পাবেন কি না, এ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন বিসিবির পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। ওই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তার পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তিনি তা করেননি। এরপর বিকালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাকে অর্থ কমিটির প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। কোয়াব এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। তবে কোয়াব জানায়, নাজমুল ইসলামকে তার মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। বিসিবি সেই দাবি মানতে রাজি হয়নি। এরপরও ক্রিকেটে ফেরার ঘোষণা দেন কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন।
মিঠুন বলেন, বিসিবির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি জায়গায় পৌঁছানো গেছে, যা কোয়াবের সদস্য ও উপস্থিত ক্রিকেটাররা গ্রহণ করেছেন।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি পরিচালক ইফতেখার রহমান জানান, চেষ্টা করেও আপাতত নাজমুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে তাকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দিতে হবে। এরপর তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়া চলবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের ডিরেক্টর যে মন্তব্য করেছেন আমরা মনে করি এটা অনাকাক্সিক্ষত, এমন মন্তব্য ওনার করা উচিত হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন বলেন, নাজমুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হলে ক্রিকেটারদের দাবিগুলো দ্রুত প্রক্রিয়াগতভাবে সমাধান করা হবে, এমন আশ্বাস দিয়েছে বিসিবি।
এর আগে কোয়াবের সংবাদ সম্মেলনে বয়কটের পেছনে আরও চারটি কারণের কথা জানান ক্রিকেটাররা। এর মধ্যে ঢাকার ক্রিকেটের চলমান সংকট, নারী ক্রিকেটে যৌন হয়রানির অভিযোগ, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং ফিক্সিংয়ের অভিযোগে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলোও উঠে আসে। এসব বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
কোয়াব বিবৃতিতে বলা হয়, সব ধরনের খেলা বন্ধ থাকলে নারী ও পুরুষ জাতীয় দল, অনূর্ধ্ব ১৯ দল এবং চলমান বিপিএলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থেই আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
এম নাজমুল ইসলামকে অর্থ কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কোয়াব। পরিচালক পদ নিয়ে গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বিসিবি যে সময় চেয়েছে, সেটুকু দিতে তারা প্রস্তুত বলেও জানানো হয়েছে।
হুমকি পাচ্ছেন মিঠুন :
‘দালালি’র অভিযোগ তুলে কোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুনকে বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মিঠুনের দাবি, অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন কল ও হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে তাকে গালাগাল ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব বার্তায় বলা হচ্ছে, ক্রিকেটাররা ‘দালালি’ করে দেশে একটি ‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতি’ তৈরি করেছেন। এমনকি, ‘আজকের পর কোনো ক্রিকেটার বাংলাদেশের মাটিতে নিরাপদে হাঁটতে পারবে না’ এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মিঠুন বলেন, ক্রিকেটাররা দেশের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেননি, বরং নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। তারপরও কেন এ ধরনের হুমকি আসছে, তা তার কাছে বোধগম্য নয়।
বিতর্কিত নাজমুল ছিলেন পাপনের বোর্ডেও :
কিছুদিন আগেও ক্রিকেটাঙ্গনে সেভাবে কেউ চিনত না তাকে। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তামিম ইকবালকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলেই মিডিয়ার সামনে চলে আসেন বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম। ক্রিকেটারদের প্রবল প্রতিবাদের মুখেও লাগাম টানেননি তিনি। বেফাঁস মন্তব্যে মাত্রা ছাড়িয়ে যান এই পরিচালক। মূলত তার কারণেই বিপিএল বয়কট করেছেন ক্রিকেটাররা। সেই সঙ্গে কৌতুহল তৈরি করে দিয়েছেন সবার মধ্যে– কে এই নাজমুল ইসলাম? বিসিবিতেই বা তার এত প্রভাব কেন?
জানা গেছে, বিসিবির এই পরিচালক দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্রিকেটের সঙ্গে আছেন। ঢাকা তৃতীয় বিভাগের দল ট্যালেন্ট হান্ট ক্রিকেট একাডেমির সভাপতি তিনি। এই ক্লাব থেকেই গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বিসিবির নির্বাচনে কাউন্সিলর হয়েছেন তিনি। রাতের নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে ৩৭ ভোট পেয়ে রাতারাতি পরিচালক হন নাজমুল। এরপর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ডের অর্থ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পান তিনি।
সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত নাজমুল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নাজমুল হাসান পাপনের বোর্ডেও ছিলেন তিনি। বিসিবি থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালের দিকে বিসিবি নারী বিভাগের সদস্য সচিব ছিলেন তিনি। সাবেক পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিকের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে বিসিবি পরিচালক হয়েছেন বলে অভিযোগ।
কেকে/ এমএস