আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট কার্যক্রম নতুন করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি আরব, বাহরাইন ও কুয়েতের কিছু এলাকায় একাধিক ব্যালট একত্রে পাওয়া যাওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালট কার্যক্রম কার্যত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ে বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে—মন অভিযোগ উঠেছে। তবে জামায়াতে ইসলামী এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, দেশের বাইরে তাদের কোনো শাখা নেই, একটি দল ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও ও ছবি এ অভিযোগকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে বাহরাইন, সৌদি আরব ও কুয়েতের কিছু এলাকায় একই বাসা বা একই স্থানে একাধিক পোস্টাল ব্যালট খাম একত্রে দেখা যাওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—এ ব্যালটগুলো কীভাবে, কার তত্ত্বাবধানে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া নতুন একটি ভিডিওতে সৌদি আরবেও পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কারসাজির চিত্র সামনে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, লিয়াকত নামে এক সৌদি প্রবাসীর ঠিকানায় ৪০০ থেকে ৫০০টির মতো পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে, যা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের ওই ঘটনার একটি ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে জানতে পারলাম বাহরাইন ও কুয়েতের মতো সৌদি আরবেও হাজার হাজার পোস্টাল ব্যালট রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে প্রবাসী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
‘ভাইরাল ভিডিও (সংযুক্ত) মারফতে জানা যায়, একজন প্রবাসী ভোটারের সম্মতি ছাড়াই জনৈক লিয়াকত তার পোস্টাল ব্যালটটি সংগ্রহ করেন, এ নিয়ে তাদের মাঝে বেশ বাকবিতণ্ডা হয়, যা আপনারা ভিডিওতে দেখবেন।’
জুলকারনাইন শায়ের জানান, তিনি ভিডিওতে পাওয়া নম্বরের সূত্রধরে লিয়াকত নামে ওই সৌদি প্রবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি লিখেন ‘জনাব লিয়াকত ওই কথোপকথনের সত্যতা নিশ্চিত করেন এবং তিনি আমাকে জানান তিনি নিজেই ৪০০-৫০০টির মতো পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ করেছেন।’
এদিকে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে সৌদি আরবে। দেশটিতে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় নিবন্ধিত ভোটার ৮৪ হাজার ২৯২ জন, কাতারে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন, ওমানে ৫৬ হাজার ২০৭ জন এবং বাহরাইনে ১৯ হাজার ৭১৯ জন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আরপিও অনুযায়ী কোনো দলেরই দেশের বাইরে সংগঠন থাকার কথা নয়। বাংলাদেশের বাইরে আমাদের দলের কোনো সংগঠন নেই। জামায়াতে ইসলামীর নামে দেশের বাইরে আমাদের কোনো শাখা নেই। যারা অভিযোগ করছেন তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এটা করছেন। প্রবাসীদের জন্য যে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে, কোনো অবস্থায় এটা এক জায়গায় করার কথা নয়। এটা উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রবাসীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করেন। আমাদের দাবি ছিল তাদের ভোটাধিকার দেওয়া, যাতে তারা ভোট দিতে পারেন। তাদের বিতর্কিত করার জন্য একটি পক্ষ একটি দল ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করছে। যারা এগুলো করছে তারা প্রবাসীদের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও দলের কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ইতঃপূর্বে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু দেশে যেমন—বাহরাইন, ওমান, কুয়েত ও সৌদি আরবে শত শত ব্যালট একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীদের কাছে রয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ সংঘবদ্ধ ভোট সম্পূর্ণ বেআইনি। কোথাও কোথাও একজনের নাম্বার দিয়ে আরেকজনের পোস্টাল ব্যালট পেপার সংগ্রহ করা হচ্ছে, যেটি অনাকাক্সিক্ষত। যেহেতু বাংলাদেশে প্রবাসীদের ভোটদান প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আমরা চাই প্রবাসীদের ভোটের ক্ষেত্রেও সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হোক।
বিএনপি চেয়ারম্যানের এ উপদেষ্টা বলেন, দুঃখজনকভাবে লক্ষ করছি, পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে ধানের শীষের অবস্থান নিচের দিকে, যা সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ভাঁজ করলে ধানের শীষ প্রতীক চোখে পড়ে না, কিংবা দাগের কারণে মুছে যেতে পারে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীককে কৌশলে সহজে দেখা যায় এমন জায়গাগুলোতে রাখা হয়েছে। চাইলেই খুব সহজে কলাম বা লাইনের সংখ্যা পনঃবিন্যাস করে প্রতীকের অবস্থানগত এ বৈষম্য দূর করে পোস্টাল ব্যালটকে স্বচ্ছ রাখা যেত।
পোস্টাল ব্যালটের বিতর্ক নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এ সমস্যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।’
গত ২০ বছর মানুষ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেনি দাবি করে তিনি বলেন, ‘মানুষ আর কোনো বিতর্কিত নির্বাচন দেখতে চায় না। তারা চায় গ্রহণযোগ্য ভোট হোক। তাই পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষের অবস্থান নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তার জবাব নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। এখনো সময় আছে এর প্রতিকার তাদের করতে হবে।’
পোস্টাল ব্যালট বিতর্কে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, বৈঠকে নির্বাচনসংক্রান্ত কিছু আইনগত বিষয় ও আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো বাসায় ২০০ থেকে ৩০০টি করে ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও ব্যালট জব্দ হয়েছে, আবার কোথাও ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া একজনের নামে পাঠানো ব্যালট অন্য কেউ গ্রহণ করছে এমন ঘটনাও সামনে এসেছে।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের কাছে ব্যালট কীভাবে পাঠানো হয়েছে, তারা কীভাবে ভোট দেবেন, কোথায় স্ক্যান করবেন এবং কোনো স্থানে বিপুলসংখ্যক ব্যালট পাওয়া গেলে দায় কার, এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা বিষয়গুলো বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে আজই ব্যাখ্যা দিতে পারে।
আচরণবিধি প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভোটার অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য ভোটার স্লিপে ভোটারের নম্বর, প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকা উচিত। বর্তমানে আচরণবিধিতে ভোটার স্লিপে কোনো দলের নাম বা প্রার্থীর ছবি না দেওয়ার বিধান রয়েছে, যা পুনর্বিবেচনার দাবি করেছেন। নির্বাচন কমিশন চাইলে এ বিধান পরিবর্তন করতে পারে।
কেকে/এজে