মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত এক বছরে লোকালয় থেকে ৬৭টি বন্যপ্রাণী জীবিত উদ্ধার করে বন বিভাগে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ফাউন্ডেশন শ্রীমঙ্গল। বনাঞ্চলের পরিবেশ ধ্বংস, খাদ্য সংকট ও মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।
লোকালয়ে বেরিয়ে আসা বন্যপ্রাণী উদ্ধারে ভূমিকা পালন করছে শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদর ইউনিয়নের রূপসপুর গ্রামে অবস্থিত সীতেশ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানা নামে পরিচিত বন্যপ্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন।
ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, গত বছরের ১৮ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বিন বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ২৩টি অজগর সাপ, ৯টি লজ্জাবতী বানর, ৬টি গন্ধগোকুল, ৪টি বনবিড়াল, ৪টি শঙ্খচিল, ৩টি বেতাজরা সাপ, ২টি দারাশ সাপ ও ২টি সবুজ কালী মনসা সাপ। এছাড়াও একটি করে উদ্ধার করা হয়েছে সবুজ বোরাল (পিট ভাইপার), ভোঁদড়, জঙ্গলি পেঁচা, উল্টো লেজি সিংহ বানর, শিয়াল, বেজি, লক্ষ্মীপেঁচা, নীলকণ্ঠ পাখি, পদ্মগোখরা সাপ, জুনিয়া সাপ, সোনা গুঁইসাপ, ঘরগিন্নী পাখি, ভুবনচিল ও সুন্দি কচ্ছপ।
জানা যায়, দেশের সাতটি বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে জেলার কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান অন্যতম। জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের সমৃদ্ধ বনগুলোর একটি। এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। লাউয়াছড়া বনেই রয়েছে বিলুপ্তের দ্বারপ্রান্তে চলে আসা বন্যপ্রাণী উল্লুক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মনুষ্যসৃষ্ট ধ্বংসলীলায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ছেড়ে বন্যপ্রাণী এখন শ্রীমঙ্গল ও কমলঞ্জের বিভিন্ন লোকালয়ে চলে আসছে। লোকালয়ে আসা কিছু প্রাণী ধরা পড়ছে মানুষের হাতে।
বন বিভাগ জানায়, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় বিস্তৃত মৌলভীবাজার রেঞ্জের ২ হাজার ৭৪০ হেক্টর আয়তনের ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।
বনবিভাগের মতে, জাতীয় উদ্যানে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, চার প্রজাতির উভোচর প্রাণী, ছয় প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির অর্কিড, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ১৭ প্রজাতির পোকামাকড় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে বনে খাদ্যাভাব দেখা দেওয়ায় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। এ ছাড়া বনের ভিতর অধিক পরিমাণ মানুষ প্রবেশ করায় নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে প্রাণীদের আবাসস্থল।
স্বপন দেব সজল বলেন, ‘বনাঞ্চলে নির্বিচারে গাছপালা ও ঝোপঝাড় কেটে উজাড় করার ফলে বন্যপ্রাণীরা তীব্র খাদ্য সংকটে পড়ছে। বনভূমিতে মানুষের অবাধ প্রবেশ, জঙ্গল কেটে ফসল চাষ, বসতবাড়ি স্থাপন এবং অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট ও ভিলা নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।’
তিনি আরও জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মাধ্যমে লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির খবর পেলে দ্রুত সেখানে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়। আহত প্রাণীদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বনবিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পরবর্তী সেগুলো আবার বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়।
জানা গেছে- পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও চা-বাগানঘেরা শ্রীমঙ্গল উপজেলার সংলগ্ন রিজার্ভ ফরেস্ট লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ বিস্তীর্ণ বনভূমিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে গাছ কাটা, বসতি স্থাপন, আনারস, লেবু ও চা চাষ এবং রিসোর্ট ও ভিলা নির্মাণ করে আসছে। এতে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, দ্রুত বনভূমি রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জামিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন থেকে অক্ষত অবস্থায় যেসব বন্যপ্রাণী আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, সেসব জীবিত প্রাণীকে লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।’
কেকে/এমএ